৯০ ক্যাডারে তটস্থ বরগুনা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনা শহরজুড়ে এখনও আতঙ্ক। চারদিকে থমথমে পরিবেশ। প্রধান আসামিরা না ধরা পড়ায় এ আতঙ্ক বেশি বিরাজ করছে। মোড়ে মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ। জটলা বেঁধে এখনও চলছে স্ত্রীর সামনে রিফাত শরীফকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার সরগরম আলোচনা। নৃশংস এ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ চলছে অব্যাহত। এর মধ্যেই বর্তমানে এলাকায় ব্যাপক হারে আলোচিত হচ্ছে ‘জেমস বন্ড’ ও ‘০০৭’ নামে নব্য সন্ত্রাসী গ্রুপ নিয়ে। যে সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রধান সাব্বির আহমেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড। যে কি না প্রকাশ্যে সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে রাম দা দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তারই স্কুলজীবনের বন্ধু ছাত্রলীগ কর্মী রিফাত শরীফকে। নয়ন বন্ডের এ জেমস বন্ড বা ০০৭ গ্রুপে বর্তমানে ৯০ থেকে ১০০ জনের একটি ক্যাডার বাহিনী রয়েছে। যারা কি না সারা বরগুনায় নানা মাদক তথা ইয়াবা ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছিল। কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে।

পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দাসহ একাধিক পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলে এমনই সব তথ্য জানা গেছে। তারা বলছেন, নয়ন বন্ডের মতো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর নেতৃত্বে ওই ক্যাডাররা বরগুনার ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে কয়েক বছর ধরে। স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী রাজনীতিক ও প্রশাসনের মদদে নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছিল। রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের পর কোপানোর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর এ গ্রুপে ক্যাডাররা গা ঢাকা দিয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে এই সন্ত্রাসী গ্রæপের আতঙ্ক এখনও বিরাজ করছে। কেননা এ সন্ত্রাসী নয়ন বন্ড ও প্রভাবশালী রাজনীতিকের আত্মীয় সন্ত্রাসী রিফাত ফরাজীসহ এ গ্রুপের ক্যাডাররা ইতঃপূর্বেও অনেক দুর্ধর্ষ অপরাধ ঘটালেও কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে গেছে।

গতকাল বরগুনা সদরের বড়লবনগোলা গ্রামে নিহত রিফাত শরীফের বাড়িতে গেলে সেখানে কথা হয় নিহতের বন্ধু প্রতিবেশী অ্যাডভোকেট জন, হিমেল খান নোমান, মৃদুল দেবনাথ, সানজিদ ও চাচাতো ভাই সোহেলের সঙ্গে। তারা সময়ের আলোকে জানান, নয়ন বন্ডের সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। রাজনৈতিক বা প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকত সে। এ কারণে বিভিন্ন সময়ে বড় বড় অপরাধ ঘটিয়েও পার পেয়ে গেছে। ফলে একের পর এক অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ায় প্রকাশ্যে লোকজনের সামনেই রিফাত শরীফকেও নয়ন বন্ড তার সহযোগী ক্যাডাররা কুপিয়ে হত্যা করে।

বরগুনা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, নয়ন বন্ডসহ এমন কিছু সন্ত্রাসী স্থানীয়ভাবে নানা প্রভাবশালী মহলের মদদপুষ্ট ছিল। ফলে স্থানীয় পুলিশও চাইলে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারত না। তারপরও অনেকবার পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। কিন্তু প্রভাবশালীরায় তাকে জামিনে মুক্ত করে আনতেন। ওই কর্মকর্তারা বলেন, নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজীসহ এ জেমস বন্ড বা ০০৭ গ্রুপে ৯০ থেকে ১০০ জনের মতো ক্যাডার বা সহযোগী থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই পুলিশের সাইবার বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। এ বিষয়ে সরেজমিন তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দারা।

বরগুনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ুন কবির সময়ের আলোকে বলেন, সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যদের শনাক্ত করার লক্ষ্যে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। এ সন্ত্রাসী গ্রুপে কারা কীভাবে জড়িত সেটিও খুঁজে বের করা হবে। এখন পর্যন্ত বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো নিয়েও কাজ চলছে।
বরগুনা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেন সময়ের আলোকে বলেছেন, রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের পরই জেমস বন্ড নামানুসারে সন্ত্রাসী গ্রুপের কথাটি জানাজানি হয়। এ বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে। তবে এ মুহূর্তে সবার আগে শনাক্ত হওয়া রিফাত শরীফের খুনিদের গ্রেফতারেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ।

সরেজমিনে শনিবার দুপুরে দেখা গেছে বড়লবনগোলা গ্রামের বাড়ির সামনে রাস্তা সংলগ্ন স্থানে রিফাত শরীফকে দাফন করা হয়েছে। কবরের ওপরে পলিথিন দিয়ে তার ওপরে আম গাছের পাতাযুক্ত ডাল বিছানো ছিল। যাতে কবর শীতল থাকে। কবরের সামনে এ সময় দাঁড়িয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিলেন নিহতের বাবা আবদুুল হালিম দুলাল। কান্নারত দুলাল সময়ের আলোকে বলেন, যাকে হারিয়েছি, তাকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু এ সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। কেউ যেন পার পেয়ে না যায়। এখন পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। যেহেতু ভিডিওফুটেজ আছে সে ক্ষেত্রে পুলিশ অবশ্যই জড়িতদের গ্রেফতার করতে পারবে।

গতকাল বরগুনার সেই সরকারি কলেজের সামনে গিয়ে কথা হয় কয়েকজনের সঙ্গে। সেখানে কলেজের গেটে কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় স্থানীয় দুজন রিকশাচালক সময়ের আলোকে বলেন, নয়ন বন্ড কয়েক বছর ধরেই বরগুনার পরিচিত সন্ত্রাসী নাম। অথচ, অনেক সময় দেখা গেছে সে থানার একাধিক দারোগার মোটরসাইকেলের পেছনে বসে ঘুরছে। নয়ন ইয়াবা কারবার করত, এটা সবাই জানে। তারপরও বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে তাকে মদদ দেওয়া হতো। এ কারণে সাধারণ মানুষ ভয়ে নয়ন বন্ড বা তার সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরুদ্ধে কথাও বলত না।

জানা গেছে, গত বুধবার সকালে স্ত্রী মিন্নির সামনে প্রকাশ্যে দিবালোকে রিফাত শরীফকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার এমন দৃশ্য আগে কখনই দেখেনি বরগুনার সাধারণ মানুষ। ধারালো লম্বা রামদা দিয়ে দাবড়িয়ে কুপিয়ে হত্যার নির্মমতা কেউ ভুলতে পারছে না। শনিবার ওই আতঙ্কে কোমলমতি অনেক শিশু শিক্ষার্থী স্কুলেও যায়নি বলে একাধিক অভিভাবক জানিয়েছেন। এর মাঝেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে কীভাবে এ সাব্বির আহমেদ নয়ন নাম পাল্টে নয়ন বন্ড হয়ে গেল। কার মদদে রিফাত ফরাজী-নয়ন বন্ডরা এত ভয়ঙ্কর-দুঃসাহিকতা দেখাতে পারল? হলিউডের বিখ্যাত জেমস বন্ড সিরিজের নামানুসারে পুলিশ ও গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে এমন একটি দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। নাকি প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের মদদেই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল এমনই সব প্রশ্ন ঘোরপাক খাচ্ছে জনমনে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box