সাগরে মাছ ধরা বন্ধের প্রভাব যাচ্ছে অনেকদূর

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বঙ্গোপসাগরে দুই মাস পাঁচদিন মাছ শিকারে চলছে নিষেধাজ্ঞা। তাই উপকূল থেকে সাগরে যাচ্ছে না মাছ ধরা ট্রলার। ফলে ট্রলার কেন্দ্রীক যে ব্যবসা রয়েছে তা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে পিরোজপুরের ইন্দুরকানীর ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে উপকূলীয় অন্যান্য এলাকার মত্স্য ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরাও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন।

চলমান অবরোধের ফলে মত্স্যজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষও অনেকটা বেকার হয়ে পড়েছে। ভোগান্তি শুধু জেলেদেরই নয়। বরং এই পেশার ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরাও কম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। বিশেষ করে বরফ মিল, মুদি মনোহরী, জ্বালানি তেল, ওয়ার্কশপ ব্যবসায়ীরা পড়েছেন মারাত্মক সমস্যায়। উপজেলার পাড়েরহাট বন্দরের শতাধিক দিন মজুরও অনেকটা বেকার। আবার বাজারে পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় ক্রেতা সাধারণের সমস্যা হচ্ছে।

পাড়েরহাট বন্দর ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশিদ হাওলাদার জানান, পাড়েরহাট বন্দরে ছোট বড় পাঁচ শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যা পুরোটা বাদুড়া মত্স্য আড়তের উপর নির্ভর করে চলে। এই বন্দর কেন্দ্রীক প্রায় তিন শতাধিক মাছ ধরা ট্রলার সাগরে যাতায়াত করে। অন্য সব সময় এই মৌসুমে পাড়েরহাট জুড়ে থাকে রমরমা অবস্থা। দিন রাত সমানে কাজে ব্যস্ত থাকে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। এই সময় প্রচুর মাছ ধরা ট্রলার সাগরে আশা যাওয়া করে। তাই অনেক রাত অবধি মুদির দোকান খুলে বসে থাকেন দোকানি। জ্বালানি তেলের দোকানেরও একই অবস্থা। আর বরফ মিলগুলোর শ্রমিকদের ফিরে তাকাবার সময় থাকে না। ওয়ার্কশপগুলোতে টুংটাং শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। কিন্তু সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে পাড়েরহাটের কর্মমুখর ব্যবসার পরিবেশ। ব্যবসায়ীদের মুখ এখন মলিন।

পাড়েরহাটে চারটি বরফ মিল রয়েছে। যার সবগুলোই এখন প্রায় বন্ধ। অবরোধের কারণে মিলের সবাই বেকার। দুই একটা মিলে সামান্য কিছু বরফ উত্পাদন করে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করা হচ্ছে নামে মাত্র।

মল্লিক আইসপ্লান্টের মালিক ও বাদুড়া মত্স্যজীবী সমিতির সভাপতি নাসির উদ্দিন মল্লিক জানান, বর্তমানে তার মিলটি বন্ধ রয়েছে। মিলের ২২ জন শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। অবরোধের কারণে পাড়েরহাট বাজারের ব্যবসায়ীদের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার অন্যসব মিলেরও একই অবস্থা।

পাড়েরহাট বন্দর সংলগ্ন বাদুরা মত্স্য অবতরণ কেন্দ্রের দুবলা ফিসের পরিচালক আব্দুল হাই কাজী বলেন, আমার আড়ত্ থেকে ২৫ থেকে ৩০টি সাগরগামী মাছ ধরা ট্রলারে প্রায় দেড় কোটি টাকার মতো দাদন দেওয়া আছে। কিন্তু অবরোধের কারণে একটি টাকার মুখও দেখতে পারছি না। সারাদিন ঘরে বসে সময় কাটাই। আর জেলেরাও সব বেকার। অনেকে দাদন নিয়ে স্বপরিবারে ঢাকা চট্টগ্রাম চলে গেছে। আবার যখন অবরোধ শেষ হবে তখন এইসব মাছ ধরা শ্রমিকদের পাওয়া যাবে না। অনেকেই আবার পেশা বদল করে ফেলছে।’

ইন্দুরকানী উপজেলায় প্রায় চার হাজার মত্স্যজীবী রয়েছে। যার মধ্যে সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৭০১ জন। এর মধ্যে ৯২০ জন জেলে প্রণোদনা হিসেবে জনপ্রতি ৪০ কেজি চাল পায়।

উপজেলা জাতীয় মত্স্যজীবী সমিতির সভাপতি হামেদ জোমাদ্দার জানান, সরকার থেকে চাল দেওয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। সাগরগামী জেলেরা মাছ ধরা ছাড়া অন্য তেমন কোনো কাজ জানেন না। আবার নদীতে যে মাছ ধরবে সে উপায়ও নেই। এ বছর বর্ষা কম হওয়ার কারণে নদীতে এখন পর্যন্ত তেমন মাছ দেখা যাচ্ছে না। তাই বেশিরভাগ জেলেই বেকার সময় পার করছে।

ট্রলারের মালিক দুলাল ফকির জানান, ‘যদি সরকার অগ্রহায়ণ, পৌষ ও মাঘ এই তিন মাসের যে কোনো দুই মাস সাগরে মাছ ধরা বন্ধ রাখে তবে আমাদের জন্য ভালো হয়। আর ইলিশের প্রজনন মৌসুমে (অক্টোবরে) তো আমরা এখন আর নিজেদের সার্থেই মাছ ধরা বন্ধ রাখছি। আর ভারত বাংলাদেশ যৌথভাবে অবরোধ দিতে পারলে সাগরে মাছ রক্ষা পাবে। নতুবা মাছ রক্ষা সম্ভব নয়। কারণ যখন আমাদের এখানে অবরোধ থাকে তখন ভারতের সীমানা অতিক্রম করে জেলেরা বাংলাদেশের সাগরের মাছ শিকার করছে অনবরত। আমি ১০ লাখ টাকা লোন নিয়ে আমার দুটি ট্রলারের শ্রমিকদের দিয়েছি। এক টাকাও ঘরে আসেনি। অবরোধ শেষে সাগরে ট্রলার পাঠাতে বেগ পেতে হবে।’

ইন্দুরকানীর ভারপ্রাপ্ত উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা আব্দুল গাফ্ফার জানান, প্রকৃত অর্থে অবরোধের কারণে উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ সমস্যাগ্রস্ত হচ্ছে। জেলেরাও বেকার এটাও ঠিক। কিন্তু সরকার তো জেলেদের ভালোর জন্যই এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। আমরা সব সময় তদারকি করছি যাতে সাগরে কোনো ট্রলার না যেতে পারে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box