লাশ দাফনেও ভোগান্তি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু ঢাকায় মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির লাশ নিয়েও ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরবাসীকে।

ঢাকায় যে হারে মানুষ বেড়েছে, সে হারে বাড়েনি কবরস্থান, শ্মশানঘাট কিংবা লাশ সত্কারের জায়গা। দুই কোটি মানুষের জন্য ঢাকায় বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে মাত্র দশটি গোরস্থান আছে। প্রতিদিন অন্তত ৮০ থেকে ৯০ জনকে দাফন করা হয় এসব গোরস্থানে। আর তা সবই করা হয় অস্থায়ীভাবে। ফলে একটি কবরের ওপর দেওয়া হয় আরেকটি কবর। কবর দিয়ে আসার পর হারিয়ে যায় প্রিয়জনের স্মৃতি।

গোরস্থানগুলোতে অস্থায়ী কবর দিতে গিয়েও নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন নগরবাসী। লাশ দাফনের জন্য কবর খোঁড়া, দাফন-কাফনের আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র, কবরের বেড়া দেওয়া, পরবর্তীতে কবরের দেখভাল নিয়ে নানা অব্যবস্থাপনার শিকার হতে হয় নগরবাসীকে। কবর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গুণতে হয় বাড়তি টাকা।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, মৃত্যুর পরও এখানে শান্তি নেই। সাড়ে তিন হাত কবরের জায়গার নিশ্চয়তা নেই। কেউ মারা গেলে শোকের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় স্বজনদের। গোরস্থানে পদে পদে গুণতে হয় টাকা। যাদের টাকা আছে তারা টাকা দিয়ে কবর সংরক্ষণ করতে পারেন। যাদের টাকা নেই, তাদের সঙ্গে সঙ্গেই সব স্মৃতিচিহ্নই শেষ।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকে ঢাকা দক্ষিণের জুরাইন ও আজিমপুর এবং ২০১২ সাল থেকে ঢাকা উত্তরের ছয়টি কবরস্থানে স্থায়ীভাবে আর কবরের জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। তবে দুই সিটিতেই কবর সংরক্ষণ করতে হলে পাঁচ বছরের জন্য এক লাখ ৫০ হাজার টাকা, ১০ বছরের জন্য তিন লাখ টাকা, ১৫ বছরের জন্য ছয় লাখ টাকা, ২০ বছরের জন্য ৯ লাখ টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য ১২ লাখ টাকা ফি দিতে হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রতি কবরের সাধারণ রেজিস্ট্রি বাবদ ২০০ টাকা ফি থাকলেও বর্তমানে দাফন বাবদ কোনো টাকা দিতে হয় না। মেয়র সাঈদ খোকন তাঁর নাগরিকদের জন্য সব ধরনের ফি মওকুফ করে দিয়েছেন।

তবে নগরবাসী বলছেন, গোরস্থানে নানা অব্যবস্থাপনায় পদে পদে অর্থ গুণতে হয়। একটি লাশ দাফন দিতে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। আবার কবর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মৃত ব্যক্তির পরিবারকে মাসে অন্তত আরো পাঁচশ টাকা গুণতে হয়। সবমিলিয়ে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের বিড়ম্বনার শেষ নেই।

পরিবারের সদস্যদের বিড়ম্বনা কমাতে কবরস্থান সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সেবা দিতে অনলাইন ডাটাবেজ সফটওয়্যার চালু করতে যাচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। ডাটাবেজে মৃত ব্যক্তির বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সন্নিবেশিত করা হয়েছে। মৃত ব্যক্তির মারা যাওয়ার তারিখ, দাফনের সময়, মৃত্যুর কারণ এবং ওয়ারিশদের তথ্য থাকবে ঐ ডাটাবেজে। আজিমপুর কবরস্থান দিয়ে শুরু করা হয়েছে প্রকল্পটি। সম্প্রতি কবরস্থানটির আয়তনও বাড়ানো হয়েছে। কবরস্থানে পুরাতন মসজিদ ভেঙে নতুন মসজিদ করায় জায়গা বেড়েছে।

এ সংস্কার কাজের উদ্বোধনের সময় মৃত ব্যক্তির ডাটাবেজ সফটওয়ারের উদ্বোধন করা হবে বলে জানা গেছে। বিদেশে থাকায় অনেকে সরাসরি কবরস্থানে যেতে পারেন না। মূলত তাদের কথা মাথায় রেখে এ সেবা চালু করতে যাচ্ছে ডিএসসিসি। যেখানে গুগল ম্যাপের মাধ্যমে কবরের নামফলকসহ স্বজনের সর্বশেষ অবস্থান ও ছবি দেখা যাবে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ডেথ সার্টিফিকেটের নির্ধারিত ফি পরিশোধ করা যাবে। এমনকি স্বজনরা কবরস্থান কেন্দ্রিক নির্দিষ্ট বিভিন্ন চার্জ অনলাইনের মাধ্যমে প্রদান করতে পারবেন। এছাড়া মৃত ব্যক্তির ডেথ সার্টিফিকেট প্রস্তুত করে তা লাশ দাফনের সময় উপস্থিত রেজিস্ট্রেশনকারীর প্রোফাইলে পাঠানো হবে।

সংস্থাটির আইসিটি সেলের সিস্টেম এনালিস্ট আবু তৈয়ব রোকন ইত্তেফাককে বলেন, গত এক বছর ধরে মৃত ব্যক্তিদের ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে আজিমপুর থেকে শুরু করা হয়েছে। পরবর্তীতে অন্যগুলো একই সুবিধার আওতায় আনা হবে। অনলাইন পদ্ধতি চালু হলে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের ভোগান্তিও অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি জানান।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box