রিফাত হত্যাকান্ডে তোলপাড়

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনায় গত বুধবার দিনদুপুরে কলেজছাত্র রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সারাদেশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার দাবি উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রিফাতের খুনিদের যে কোনো মূল্যে গ্রেপ্তার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল বলেছেন, রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। রিফাতের খুনিরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছে। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাত ৮টা পর্যন্ত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে মামলার ৪নং আসামি চন্দনকে (২১) গতকাল সকালে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর দুপুরে গ্রেপ্তার করা হয় মামলার ৯নং আসামি হাসানকে।

এ ছাড়া নাজমুল হাসান নামে সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদিকে হত্যাকান্ডের প্রত্যক্ষদর্শী রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছেন ‘আমার সামনেই সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করে। আমি শত চেষ্টা করেও তাকে রক্ষা করতে পারিনি। আমার আশপাশে অনেক মানুষ ছিল। হামলার সময় আমি চিৎকার করেছি, সবাইকে বলেছি-ওরে বাঁচান। কিন্তু কেউ এসে আমারে একটু সাহায্যও করে নাই।’ বৃহস্পতিবার সকালে বরগুনা পুলিশ লাইনের কাছে বাবার বাড়িতে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ কথা বলেন। আয়েশা দাবি করেন, নয়ন, রিশান ফরাজী ও রিফাত ফরাজী এই হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, নয়ন বিভিন্ন সময় তাকে বিরক্ত করত, এসব ঘটনা পরিবারকে না জানাতে তাকে হুমকি দিত। বুধবার বরগুনার কলেজ সড়কের ক্যালিক্স কিন্ডার গার্টেনের সামনে দিনদুপুরে স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকার সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করা হয়। রাতে রিফাতের বাবা ১২ জনের নাম উলেস্নখ করে ও অজ্ঞাত পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করে বরগুনা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। গতকাল সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বরিশাল বিভাগের পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) শফিকুল ইসলাম। এ সময় তিনি বরগুনা কলেজের অধ্যক্ষর সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, হামলার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

এ সময় বরগুনা জেলা পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নিহত রিফাতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা মা মোসা. ডেইজি আক্তার। থেকে থেকে আহাজারি করছেন তিনি। রিফাতের প্রতিবেশী হালিম বলেন, ‘এলাকায় ভদ্র ছেলে হিসেবে পরিচিত ছিলেন রিফাত। তাকে যেভাবে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে তা দুঃখজনক। আমরা এর বিচার চাই।’ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বরগুনা জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম রনি বলেন, ‘আমি বাসা থেকে শহরে যাওয়ার পথে দেখি, বরগুনা সরকারি কলেজের গেট থেকে রিফাতকে টেনেহিঁচড়ে বের করে কোপানো হচ্ছে। আমিও হামলাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করি।’ প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রিফাত শরীফ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকাকে বরগুনা সরকারি কলেজে নিয়ে যান। কলেজ থেকে ফেরার পথে মূল ফটকে নয়ন, রিফাত ফরাজীসহ আরও দুই যুবক রিফাত শরীফের ওপর হামলা চালায়।

এ সময় তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা দুর্বৃত্তদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুতেই হামলাকারীদের থামানো যায়নি। তারা রিফাত শরীফকে উপর্যুপরি কুপিয়ে রক্তাক্ত করে চলে যান। পরে স্থানীয় লোকজন রিফাত শরীফকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে রিফাত শরীফের মৃতু্য হয়। ওই হামলার ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। আসামিদের ধরতে জেলাজুড়ে চেকপোস্ট এদিকে রিফাত শরীফ হত্যা মামলার আসামিদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে চেক পোস্ট বসানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই বরগুনার বিভিন্ন স্থানে চেক পোস্ট বসানো হয়। বরগুনা পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেন জানান, রিফাত হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য বরগুনার বিভিন্ন স্পটে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এছাড়া এ হত্যা মামলার তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে রিফাত হত্যা মামলার আসামিদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছে বরগুনা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীরা। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃতু্য হয় রিফাতের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই বরগুনার রিফাত শরীফের (২২) মৃতু্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার মরদেহের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জামিল হোসেন। ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার তিনি সাংবাদিকদের একথা বলেন। তিনি বলেন, রিফাত শরীফের গলা, মাথা, বুক ও হাতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, যা ধারাল অস্ত্রের আঘাত বলেই প্রাথমিকভাবে বোঝা গেছে। আঘাতগুলোর মধ্যে গলা, মাথা ও বুকে তিনটি গুরুতর জখম রয়েছে। বাকি ৩/৪টি আঘাতের চিহ্ন ততটা গুরুতর নয়। ‘বিশেষ করে গলার আঘাতের কারণে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ রগ কর্তন ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এতটাই রক্তক্ষরণ হয়েছে, যা সময়ের ব্যবধানে তাকে মৃতু্যর দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তবে বিস্তারিত বিষয় ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেই নিশ্চিত করে উলেস্নখ করা হবে।’ এর আগে সকাল ১১টার দিকে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আলোচিত এ হত্যাকান্ডে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য বোর্ড গঠন করে। বোর্ডে হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. জামিল হোসেনকে প্রধান করে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন- ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. মাইদুল হোসেন ও ডা. সোহেলী আক্তার তন্নী। এর আগে শেবাচিম হাসপাতালের লাশঘর থেকে সকাল ১০টার দিকে নিহত রিফাত শরীফের মরদেহ মর্গে আনা হয়। সেখানে বেলা ১১টা ১০ মিনিট থেকে পৌনে ১২টা পর্যন্ত চলে ময়নাতদন্তের কার্যক্রম। হাইকোর্টের নির্দেশ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় করা মামলার আসামিরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারেন, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছে হাইকোর্ট। রাষ্ট্রপক্ষকে এই বার্তা পুলিশপ্রধানকে (আইজিপি) জানিয়ে দিতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মৌখিকভাবে এ আদেশ দেয়। বরগুনায় স্ত্রীর সামনে স্বামীকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গণমাধ্যমে আসা খবর গতকাল সকালে আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস। এরপর এ ঘটনায় মামলা হয়েছে কি-না বা কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা আজ বেলা ২টায় আদালতকে জানাতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলা হয়েছে। মধ্যাহ্ন বিরতির পর আদালতের কার্যক্রম শুরু হলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম আবদুলস্নাহ আল মাহমুদ বাশার আদালতকে বলেন, আদালতের মৌখিক নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বরগুনার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে কথা হয়েছে। সদর থানায় একটি মামলা হয়েছে।

নিহত রিফাতের বাবা ১২ জনের নাম উলেস্নখ করে ও অজ্ঞাত পাঁচ থেকে ছয়জনকে আসামি করে বরগুনা সদর থানায় হত্যা মামলা করেছেন। চন্দন নামে এক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় আদালত বলে, ‘মূল অভিযুক্তকে কি গ্রেপ্তার করা হয়েছে? কলেজের সামনে দিনদুপুরে এ ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের কার্যক্রম তৎপর মনে হচ্ছে না।’ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আসামিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনটি টিম কাজ করছে। র?্যাবও সঙ্গে যুক্ত আছে। আসামিদের বাড়ি ও তাদের স্বজনদের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। যত দ্রম্নত সম্ভব আসামিদের গ্রেপ্তার করে সোপর্দ করা হবে।’ আদালত বলে, ‘বরগুনার পাশে পিরোজপুর জেলা আছে। এটি একটি উপকূলীয় এলাকা। এর আগে একটি মামলায় আসামি ধরার সময় উধাও হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে (রিফাত হত্যা) এমনটি হলে তা হবে দুঃখজনক। আসামিরা যেন দেশত্যাগ করতে না পারে, এ ব্যাপারে পুলিশপ্রধানকে জানিয়ে দিন।’ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে আদালত বলে, ‘আপনি আমাদের বিষয়টির অগ্রগতি জানাবেন। কোনো অনিয়ম দেখা দিলে আমরা তা নজরে রাখব।’ এ সময় আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস এ বিষয়ে আদালতকে আদেশ দেয়ার আরজি জানান। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, নিহত রিফাতের স্ত্রীসহ পরিবারকে সার্বিক নিরাপত্তা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box