মোহনপুরে শিক্ষার নামে কোচিং বাণিজ্য!

সুমন মাহমুদ শান্ত, মোহনপুর প্রতিনিধি, রাজশাহী

সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে মোহনপুরে আনাচে-কানাচে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টার। প্রাইভেট পড়ানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়,মাদ্রাসা,হাইস্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা তাদের আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছেন এ কোচিং বাণিজ্যকে। তারা এ প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্য ব্যবসা করে বছরে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।সরকারী ভাবে প্রাইভেট পড়ানো নিষিদ্ধ করা হলেও এ পর্যান্ত মোহনপুর উপজেলায় তার বাস্তবায়ন নেই।

তাই অভিভাবক মহল তাদের সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। প্লে-গ্রুপ থেকে জেএসসি,এসএসসি,এইচএসসি, কোচিং এর নামে চলছে রমরমা ব্যবসা। অনেক কোচিং সেন্টার ৮০% থেকে ১০০% নম্বর বা এ+ পাওয়ার গ্যারান্টি দিয়ে দেদারসে এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এছাড়া বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে অতিরিক্ত ক্লাসের নামে কোচিং বাণিজ্য শুরু হয়েছে। এমনকি ক্লাস শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষায় ফেল করার আশঙ্কা রয়েছে।

মোহনপুর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠা থাকলেও ঐতিহ্যবাহী মোহনপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় উল্লেখ্যযোগ্য। মোহনপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় শিক্ষকেরা দায়সারা ভাবে বিদ্যালয়ে শ্রেণী কক্ষে পাঠচুকে বাড়ী ফিরে এসে প্রাইভেট বাণিজ্য মেতে উঠেছে। প্রাইভেট বাণিজ্য চলে ভোর ৬টা থেকে শুরু হয়ে সকাল ১০টা পর্যন্ত চলছে। ফলে ওই শিক্ষার্থীরা এ্যাসেম্লীতে উপস্থিত হতে দেরী হয়।

ওই শিক্ষকদের নিজস্ব ও ভাড়া বাড়ী গিয়ে দেখা গেছে বাড়ীর ভিতর বাইরে ছোট বড় প্রাইভেট বাণিজ্যর বিদ্যালয়। মিনি বিদ্যালয় বললেও ভুল হবে না। শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষক সমাজের সম্মানিত ব্যক্তি। প্রত্যেক শিক্ষককে সেটা অনুধাবন করতে হবে। একজন ডাকাত ডাকাতি করে লোক চক্ষুর আড়ালে আর শিক্ষকরা জাতির গড়ার কারিগর হিসাবে দিনে দুপুরে ডাকাতি করছে নির্লজের মতো।

একটি জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শিক্ষার (সাক্ষরতা) হার উন্নত হতে হয় তা অনেক আগেই প্রমাণিত হয়েছে। এ প্রয়োজনীয়তা থেকে প্রত্যেকটি দেশ শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে এটিই স্বাভাবিক।

আমাদের দেশেও এই ধারাটি প্রচলিত। ধারাটি প্রচলিত হলেও এর ফল কতটুকু তা নিয়ে আমাদের সন্দেহ থাকলেও একেবারেই যে উন্নতি হচ্ছে না তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কতটুকু? দুর্নীতির মহোৎসব শিক্ষা খাতকে এমনভাবে আকড়ে ধরেছে যে দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে শিক্ষা খাতের অবস্থান বিগত বছরগুলোতে প্রথম হলেও বর্তমানে তৃতীয়।

বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ১২ দিনে মাস শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় এক বিষষের ওপর প্রতিমাসে জন প্রতি ৫শ থেকে ১ হাজার টাকা গুনতে হয়। মোহনপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়েরসহ বেশ কিছু বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ বাসা ভাড়া নিয়ে প্রাইভেট সেন্টার তৈরী করে রমরমা প্রাইভেট বাণিজ্যের আড়ালে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করছেন শিক্ষকরা। আর বাড়তি চাপ আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছেন এবং এ ব্যয় নির্বাহে হিমশিম খাচ্ছে অভিভাবকগণ।

তাই শিক্ষার্থীরা বিষয় ভিত্তিক প্রতি মাসে ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা দিয়ে কোচিংয়ে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা জানায়,শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে গুরুত্ব না দিয়ে প্রাইভেটে কিংবা কোচিং সেন্টারে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।এদিকে,শতভাগ পাশের নিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীরাও আকৃষ্ট হচ্ছেন। তারা পরীক্ষায় কৃতকার্য ভালো ফলাফলের আশায় এসব কোচিং সেন্টারে বেশি টাকা দিয়ে হলেও ভর্তি হওয়ার অসম প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন।

সরোজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা গেছে, মোহনপুর উপজেলার পৌরসভা ও ইউনিয়নের অলি-গলির মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে শত শত কোচিং এবং প্রাইভেট সেন্টার।কোচিং বানিজ্যের শিক্ষকরা বাসাবাড়ি,ফ্ল্যাট কিংবা রাস্তার পাশের একটি ছোট কক্ষ ভাড়া নিয়ে উপরে বড় বড় সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে চালু করা হয়েছে কোচিং সেন্টার। সেখানে ছোট কক্ষে কয়েকটি বেঞ্চ বসিয়ে ২৫-৩০ জন ছাত্র-ছাত্রীকে পাঠদান করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী জানান, অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়তে হয়। কারণ স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়ার ফলে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়। যারা স্যারদের কাছে প্রাইভেট পড়ে না তারা এ বিশেষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। একাধিক অভিভাবক জানান, সন্তানদের প্রাইভেট পড়ানোর ইচ্ছে না থাকলেও অনেকটা বাধ্য হয়েই প্রাইভেট বা কোচিং সেন্টারে পাঠাতে হয়। কারণ প্রাইভেট সেন্টারে পাঠালে সন্তানরা একটু বাড়তি যত্ন পায়। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণি কক্ষেই যদি শিক্ষকরা দায়িত্বসহকারে শিক্ষাদান করতেন তা হলে সন্তানদের প্রাইভেট বা কোচিং সেন্টারে পাঠানোর দরকার হতো না।

এদিকে,অনেক শিক্ষক সঠিক সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না এসে নিজস্ব কোচিং সেন্টারে ক্লাস করিয়ে থাকেন। বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক স্কুল কলেজের শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানো নিষিদ্ধ করা হলেও এ পর্যান্ত মোহনপুর উপজেলায় তার বাস্তবায়ন নেই।এবিষয়ে সচেতন ও অভিভাবক মহল অচিরে অবৈধ প্রাইভেট ও কোচিং সেন্টার বন্ধের জন্য শিক্ষা অধিদপ্তরের আশু কামনা করেছেন।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box