মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দেখার যেন কেউ নেই

আলোকিত সকাল ডেস্ক

হাসপাতাল-ক্লিনিকসহ অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্রের সব ধরনের বর্জ্য অপসারণের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা থাকার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আইন থাকলেও প্রায় কেউই তা মানছে না। খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও এ বিষয়টি নিয়ে ততটা গুরুত্ব দিচ্ছে না। এমনকি দেশে সরকারি-বেসরকারি কতগুলো চিকিৎসা কেন্দ্রে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থা আছে সে তথ্যও নেই তাদের কাছে।

এদিকে এ ব্যাপারে ছাড়পত্র দেয়ার ক্ষমতা শুধুমাত্র পরিবেশ অধিদপ্তরের থাকলেও তাদের কাছে গোটা বিষয়টিই যেন গুরুত্বহীন। তারাও এ ব্যাপারে কোনো ধরনের খোঁজ-খবর রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। ফলে চিকিৎসাকেন্দ্রের অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে গোটা দেশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

সরেজমিন একাধিক চিকিৎসা কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সহস্রাধিক মেডিকেলের বর্জ্য অপসারণে বায়োলজিক্যাল ওয়েস্ট ম্যানেজম্যন্ট পস্নান ও সঠিক তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। বড় হাসপাতালগুলোতে ইফুলেন্ট ট্রিটমেন্ট পস্নান্ট (ইটিপি) থাকার নিয়ম থাকলেও মানা হচ্ছে না। অথচ আইন অনুসারে প্রতিটা হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনেস্টিক সেন্টারের নিজস্ব উদ্যোগে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি থাকা বাধ্যতামূলক। যেটি বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দায়িত্ব সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ অধিদপ্তরের। তবে ঢাকার বাইরে গড়ে ওঠা চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিকল্পিত বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থাপনা দেখভালে দুই প্রতিষ্ঠান (স্বাস্থ্য ও পরিবেশ অধিদপ্তর) অনেকটা ঠুটো জগন্নাথের ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ করছেন পরিবেশবাদী সংগঠন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, দেশে উপজেলা পর্যায়ে সরকারিভাবে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা হেলথ কমপেস্নক্স ২৯৭টি, ৩১ শয্যার হাসপাতাল ১১২টি, ১০ বেডের ১১টি ও ওপিডি চালুকৃত ৪টিসহ ৪২৪টি হাসপাতাল রয়েছে। এছাড়া জেলা ও বিভাগ পর্যায়ে সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত টারশিয়ারি ও সেকেন্ডারি লেভেলর ১৩০টি হাসপাতালে ২৯ হাজার ৯৭৩ শয্যা রয়েছে। সেখানে প্রতিবছর গড়ে ৪ কোটি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর বাইরে গুটিকয়েক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো অভিযোগ করছেন, মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যা থেকে সহজেই মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ও সংক্রামক রোগ-ব্যাধি ছাড়িয়ে পড়ে। এ কারণে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-২০১০ অনুযায়ী হাসপাতালের কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবেশ ছাড়পত্র নেয়ার নিয়ম করা হয়। যেখানে রোগীদের ব্যবহৃত সুচ, বেস্নড, কাঁচির মতো ধারালো চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো ধ্বংস করতে শ্রেডিং মেশিন ও সংক্রামক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে অটোক্লেভ মেশিন রাখার কথা উলেস্নখ্য আছে। তবে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কতটি হাসপাতাল-ক্লিনিক রয়েছে এবং পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েছে কতটি স্বয়ং পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে তার সঠিক তালিকা নেই। যেসব প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্রের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না কর্তৃপক্ষ।

অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিবেশগত ছাড়পত্র) সৈয়দ নাজমুল আহসানের কাছে জানতে চাইলে বিষয়টি স্বীকার করে যায়যায়দিনকে বলেন, ঢাকার বাইরে গড়ে ওঠা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ ছাড়পত্র নেয়ার সঠিক তথ্য তার জানা নেই। ফলে সেখানকার (জেলা-উপজেলা) চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে কিনা তা বলতে পারছেন না। কারণ হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোর কাছে এ ব্যাপারে তথ্য চাইলে তারা সহযোগিতা করেন না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের আরেক সহকারী পরিচালক সাবরিন সুলতানা যায়যায়দিনকে বলেন, অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট শাখার তত্ত্বাবধানে বিভাগীয় ও জেলা অফিস সার্ভে করে। এটি ওই শাখা দেখভাল করায় তারা ভালো বলতে পারবে। পরে মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট শাখার যোগাযোগ করে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামের ক্ষতির মাত্রাভেদে সেগুলোকে ৬ ভাগে ভাগ করে ছয় রঙয়ের পাত্রে রাখার নিয়ম। যেসব সরঞ্জাম পুনরায় ব্যবহার করা যায় সেগুলোকে অটোক্লেভ যন্ত্রের মাধ্যমে সঠিকভাবে জীবাণুমুক্ত করা বাধ্যতামূলক। প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক হাসপাতাল-ক্লিনিকে তা মানা হচ্ছে না। এমন ব্যবহার পরবর্তীতে একই স্থানে ফেলা হচ্ছে রোগীর ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও সাধারণ বর্জ্য। এতে করে চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, অন্যান্য রোগী এমনকি সঙ্গে থাকা স্বজনরাও নানা রোগব্যাধি আক্রান্তের ঝুঁকিতে রয়েছে।

জেলা পর্যায়ের একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা কত জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালের এক চিকিৎসক যায়যায়দিনকে বলেন, গত ১৯ জুন (বুধাবার) হাসপাতালটির বহির্বিভাগে ১ হাজার ২০ ও জরুরি বিভাগে ৪৫০ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এছাড়াও ওইদিন আন্তঃবিভাগে আড়াই’শ শয্যার বিপরীতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৬৭ যাদের মধ্যে মারা যায় ৩ জন।

প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা এত সংখ্যক রোগীর মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আরেকজন সহকারী অধ্যাপক বলেন, তাদের মেডিকেলে উৎপাদিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি এনজিও প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও দিনশেষে পৌরসভার খোলা জায়গায় সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে একত্রে ফেলছে। কারণ উপজেলা বা জেলা শহরের কোথাও মেডিকেল ওয়েস্ট ম্যানেজম্যান্ট বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফর স্টেশন (এসটিএস) ও ইনসেনারেটর ব্যবস্থা নাই।

পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ‘বাপা’র সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল মতিন যায়যায়দিনকে বলেন, বর্তমানে দেশে ৩০টি সরকারি এবং ৬৯টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আছে। এর বাইরে প্রতিটা জেলা ও উপজেলা শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক, প্যাথলজি সেন্টার গড়ে উঠেছে। যেখানে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্যাথলজিক্যাল তরল বর্জ্য ছাড়াও অপচনশীল পস্নাস্টিক সরঞ্জাম ব্যবহার পরবর্তীতে ফেলে দেয়া হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রম্নক্ষেপই নেই। দায়ী চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয় না। এমন অব্যবস্থাপনার ফলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের সংস্পর্শে আসা সাধারণ জনগণকে। মূলত বেসরকারি হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের ব্যবসায়িক মনোভাব, দেখভালের দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্তৃপক্ষের অবহেলায় দিনের পর দিন এই অব্যবস্থাপনা চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সবশেষে একটি হাসপাতালের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থপানা কেমন হওয়া উচিত বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. শহীদুলস্না সিকদার যায়যায়দিনকে বলেন, চিকিৎসাকেন্দ্রের পরিকল্পিত মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থপনা বলতে অস্ত্রোপচার কক্ষের তরল বর্জ্য থেকে শুরু করে ডায়ালাইসিস মেশিন, ল্যাবরেটরি রুম, সেন্ট্রাল সেরাইন স্টোর ডিপার্টমেন্ট (সিএসএসডি) এবং ওটি লন্ড্রির তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে বোঝায়। এছাড়া অ্যানাটমিক্যাল বর্জ্য যেমন; মানব দেহের কেটে ফেলা অঙ্গপ্রতঙ্গ, টিসু্য, টিউমার ও নারীদের গর্ভ সংক্রান্ত বর্জ্য। তেজস্ক্রিয় বর্জ্য যেমন, রেডিওঅ্যাকটিভ আইসোটোপ, তেজস্ক্রিয় বস্তু দ্বারা সংক্রমিত বর্জ্য ও অব্যবহৃত এক্সরে মেশিন সরঞ্জামসহ (ফিল্ম) বিভিন্ন জিনিস রয়েছে। যা পরিবেশ সম্মতভাবে ইনসিনারেটরে পুড়িয়ে ফেলার নিয়ম।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box