মূল আসামি এখনও অধরা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনায় দিন-দুপুরে স্ত্রীর সামনে স্বামী রিফাত শরীফকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সকালে ঘটনার পরপরই গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হত্যার ভিডিও ও ছবি ভাইরাল হয়। ফেসবুক, ইউটিউব ও টুইটারে অনেকেই স্ট্যাটাস দিয়ে, লাইভে এসে এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। খুনিদের দ্রুত গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নৃশংস এ ঘটনা হাইকোর্টের নজরে এলে আসামিরা যেন দেশত্যাগ করতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন আদালত। এদিকে সব আসামিকে অচিরেই গ্রেফতার করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

ভয়াবহ এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় পুলিশ তিন জনকে গ্রেফতার করেছে। এরা হল- মামলার ৪ নম্বর আসামি চন্দন ও ৯ নম্বর আসামি হাসান। এছাড়া ভিডিও ফুটেজ দেখে নাজমুল হাসান নামের আরও ১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তবে মূল হোতা নয়ন বন্ড, রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজীসহ অন্যরা এখনও পলাতক।

ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নিহত রিফাতের শরীরে ৬টি আঘাতের (ধারালো অস্ত্রের) চিহ্ন শনাক্ত করা হয়েছে। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জামিল হোসেন বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন- রিফাতের গলা, মাথা, বুক, পিঠ ও হাতে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে যা ধারালো অস্ত্রের আঘাত বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। এর মধ্যে গলা, মাথা ও বুকের তিনটি আঘাত গুরুতর। গলায় আঘাতের কারণে বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রগ কেটে গেছে। এর ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলার চার নম্বর আসামি চন্দন নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বরগুনার পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে চন্দনকে কখন, কোথা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে তদন্তের স্বার্থে সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে রাজি হয়নি পুলিশ। বাকি আসামিদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে বলেও জানায় পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডে নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

এ বিষয়ে বরিশালের ডিআইজি শফিকুল ইসলাম বলেন, এমন একটি ঘটনা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। ঘটনাটি যেখানে ঘটেছে সেখানে পুলিশের সিসি ক্যামেরা রয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে খুনিদের শনাক্ত করা গেছে। অভিযান চলছে। শিগগিরই অপরাধীদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হবে পুলিশ।

একমাত্র ছেলের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ নিহত রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ। মাত্র ২ মাস আগে ছেলেকে বিয়ে করিয়েছিলেন তিনি। দুলাল শরীফ সাংবাদিকদের বলেন, এটা একটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমার একমাত্র ছেলেকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সারা দেশের মানুষ এ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দেখেছে। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশের বোঝা যে কতটা কষ্টের তা কাউকে বোঝাতে পারব না। আমি এ হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। এ বিচার দেখে আর কেউ যেন কাউকে হত্যা করার সাহস না পায়।

এর আগে বেলা ১১টার দিকে শেবাচিম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রিফাতের লাশের ময়নাতদন্তের জন্য ডা. জামিল হোসেনকে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি করে। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন- ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. মাইদুল হোসেন ও ডা. সোহেলী আক্তার তন্নী।

ময়নাতদন্ত শেষে রিফাতের লাশ নিয়ে দুপুর ১টার দিকে স্বজনরা সড়কপথে বরগুনার উদ্দেশে যাত্রা করেন। বেলা ৩টার দিকে সদর উপজেলার ৬ নম্বর বুড়িরচর ইউনিয়নের উত্তর বড়লবণগোলা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায় রিফাতের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স। এ সময় শেষবারের মতো এক নজর দেখতে তার বাড়িতে ভিড় করেন হাজারও মানুষ। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে জানাজা শেষে তার লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। বুধবার সকালে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সন্ত্রাসীরা স্ত্রীর সামনেই কুপিয়ে হত্যা করে রিফাত শরীফকে।

তোপের মুখে রিফাতের শ্বশুর : শেবাচিম হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের মর্গে রিফাত শরীফের মরদেহ ময়নাতদন্তের সময় সেখানে উপস্থিত হয়ে তোপের মুখে পড়েন নিহত রিফাতের শ্বশুর মোজাম্মেল হোসেন। এ সময় তাকে হাসপাতাল মর্গ থেকে বের করে দেন রিফাতের বন্ধুরা। এর আগে স্থানীয় সাংবাদিকদের রিফাতের শ্বশুর মোজাম্মেল বলেন, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে খুনিদের কোনো পরিচয় ছিল না। খুনিরা আমার মেয়েকে উত্ত্যক্ত করত বলে জামাই এ ঘটনার প্রতিবাদ করে। তাই তাকে খুন করা হয়েছে।’ মোজাম্মেল হোসেনের এমন বক্তব্য শোনার পরপরই তার ওপর চড়াও হন রিফাতের বন্ধুরা। তারা এ সময় মোজাম্মেল হোসেনকে মিথ্যাবাদী উল্লেখ করেন। নিহত রিফাতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মঞ্জুরুল আলম জন ও নাজমুলের দাবি, রিফাতের শ্বশুর সাংবাদিকদের মিথ্যা বলছেন। তার মেয়ের সঙ্গে খুনিদের পরিচয় ছিল। খুনি নয়নের সঙ্গে রিফাতের স্ত্রীর প্রেম ছিল, তা আমরা সবাই জানি। আর এ প্রেমের কারণেই বিয়ের পর ক্ষিপ্ত হয়ে নয়ন তার লোকজন নিয়ে রিফাতকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করে।

প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় বেপরোয়া দুই খুনি : বরগুনা জেলা শহরে বহু আগে থেকেই দুই আতঙ্কের নাম নয়ন ও রিফাত। যাদের দু’জনের মাথার উপরেই ছিল ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের ছায়া। এক সময় ছাত্রদল করলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রলীগে ভিড়ে যায় বরগুনা পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মৃত সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে সাব্বির হোসেন নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড। ২৫ বছর বয়সী নয়নের একমাত্র বড় ভাই মিরাজ দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাপুর প্রবাসী। ২০১৭ সালের ৫ মার্চ রাতে নয়নের বাসায় অভিযান চালায় বরগুনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় বিপুল পরিমাণ মাদক এবং দেশি অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয় সে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় দীর্ঘদিন জেলে ছিল নয়ন। অতি সম্প্রতি জেল থেকে বের হয় সে। জেল থেকে বের হয়েই মূলত এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

বরগুনা সদর থানা পুলিশের ওসি আবীর হোসেন মাহমুদ বলেন, নয়ন বণ্ডের মাদক বাণিজ্যের কথা আমরা জানি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে হামলা, মারধর, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ মাদক বাণিজ্যের ৮-১০টি মামলা রয়েছে। সে এবং তার সহযোগীরা বেশ কয়েকবার জেলও খেটেছে।

নয়নের মতোই কুখ্যাত সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত রিফাত ফরাজী। ছেলের অপকর্মের জন্যে তার বাবা দুলাল ফরাজীকে পর্যন্ত আটক করেছিল পুলিশ। রিফাত এবং তার ভাই রিশান ফরাজী দু’জনেই বরগুনায় আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে তরিকুল ইসলাম (২১) নামে এক প্রতিবেশীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে রিফাত ফরাজী। একই বছর ডিকেপি রোডের একটি মেসে ঢুকে সেখানে থাকা ছাত্রদের মারধর করে নগদ টাকাসহ ১৪টি মোবাইল ছিনতাই করে নিয়ে যায় সে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হলে পুলিশ রিফাতের বাবা দুলাল ফরাজিকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে মোবাইল ফেরত দেয়ার বিনিময়ে ছাড়া পায় রিফাত।

বরগুনার বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বরগুনা জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান সাবেক এমপি আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন খুনি রিফাত ও তার ভাই রিশানের আপন মামা। মূলত এ মামার জোরেই কুখ্যাত সন্ত্রাসী হয়েও বিভিন্ন সময়ে পার পেয়ে গেছে তারা। প্রভাবশালী মামার ভাগ্নে হওয়ায় কখনও তেমন কোনো বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি তাদের। ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে পরিচিত রিফাত সম্পর্কে জানতে তার মামা দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ভাগ্নের সঙ্গে কোনো রকম সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সে আমার কাছ থেকে কোনো রকম সহযোগিতা পেয়েছে প্রমাণ দিতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেব। তার নানা অপকর্মের কারণে আমি নিজেই আজ থেকে প্রায় দেড় বছর আগে ওই পরিবারের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।’

রিফাত শরীফের আরেক খুনি নয়ন বন্ডকে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক সুনাম দেবনাথ ছাত্রলীগ কর্মী বলে স্বীকার করলেও তা অস্বীকার করেছেন জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি জুবায়ের আদনান অনিক।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box