মূলধন সংকটে দশ ব্যাংক

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বড় উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছেন; কিন্তু তাদের বেশিরভাগই তা আর পরিশোধ করছেন না। ফলে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে যাচ্ছে। এতে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকিং খাত। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকের আয় কমে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি বাড়ছে মূলধন ঘাটতিও। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ থেকে উত্তরণের পথ হচ্ছে, সরকারের খবরদারি কমিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো শক্তিশালী করা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, খেলাপি ঋণের প্রভাবে মূলধন ঘাটতি মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে ১০টি ব্যাংক। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এসব ব্যাংকের ১৮ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ও বিশেষায়িত খাতের ৬টি, বেসরকারি খাতের তিনটি ব্যাংক ও বিদেশি একটি ব্যাংক রয়েছে। তবে সার্বিকভাবে ব্যাংকগুলোতে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা কমেছে। গত বছর মূলধন ঘাটতি ছিল ২৩ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা।

বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সামনে ব্যাংকিং খাতসহ গোটা অর্থনীতিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, অনিয়ম, দুর্নীতি আর নানা অব্যবস্থাপনায় ব্যাংক খাতে চলছে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা। যাচাই-বাছাই না করে ভুয়া প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেয়া হয়েছে। যা পরবর্তিতে খেলাপি হয়ে পড়ছে। এসব ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। বাড়তি অর্থ জোগাতে হাত দিতে হচ্ছে মূলধনে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে সংকট।

দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বড় ঋণখেলাপিদের কারণেই ব্যাংক সম্পদের গুণগতমান কমে যাচ্ছে। বাড়ছে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ। এতে ব্যাংকগুলো প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে পারছে না। ফলে বাড়ছে ঝুঁকি। দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই বড় ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঋণ আদায় এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, সরকারি প্রত্যেকটি ব্যাংকের অবস্থাই খুব খারাপ। কারণ সরকারি ব্যাংকের মাধ্যমেই বেশি টাকা লোপাট হয়েছে, হচ্ছে। আর এ কারণে ওদের খেলাপি ঋণও বেশি। সেসব খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়ায় মূলধন ঘাটতিও কমে না। সরকারের বাজেট থেকে বছরে বছরে ভর্তুকি দেয়ার পরও তাদের মূলধন ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যথাযথ তদারকির অভাবেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের অবস্থাও বেশ খারাপ। তারা ঋণ ব্যবস্থাপনায় সাফল্য দেখাতে পারেনি। এ থেকে উত্তরণের পথ হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্তিশালী করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপরে সরকারের খবরদারি কমানো। আর সরকারি ব্যাংকগুলোর বিষয়ে সরকারকেই বেশি ভূমিকা নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, একটি ব্যাংকে যখন সুশাসন না থাকে, তখন জাল-জালিয়াতির প্রবণতা বেড়ে যায়। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ে। ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে যেভাবে খেলাপি ঋণ বেড়েছে তার প্রধান কারণ জালিয়াতি। এর প্রভাবে মূলধন ঘাটতি বাড়ে। ফলে ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞরা কোনো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দেখলেই বুঝতে পারেন- ব্যাংকটির কী অবস্থা। তিনি বলেন, প্রতি বছরই সরকারি ব্যাংকগুলোর ঘাটতি মেটাতে জনগণের করের টাকা থেকে ব্যাংকগুলোকে মূলধনের জোগান দেয়া হয়। কিন্তু এর আগে তাদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা উচিত। জবাবহিদিতা থাকলে জালিয়াতি হবে না। তখন ঋণও খেলাপি হবে না। স্বাভাবিকভাবে কমে যাবে মূলধন ঘাটতি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ছিল ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মূলধন ঘাটতি বাড়ে। দশটি ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের মূলধন ঘাটতি থাকলেও কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মূলধন রাখতে সক্ষম হয়েছে। সব মিলিয়ে পুরো খাতে ১১ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ৮ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঘাটতি ছিল ৮ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা। এর আগের বছর ঘাটতি দাঁড়ায় ৭ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপ জালিয়াতির তীর্থভূমি জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। এর আগে ডিসেম্বর শেষে ঘাটতি ছিল ৫ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। হলমার্কসহ বিভিন্ন কেলেঙ্কারির জেরে গত ডিসেম্বরে সোনালী ব্যাংকের ৫ হাজার ৩২০ কোটি টাকা ঘাটতি থাকলেও তিন মাসের ব্যবধানে তাদের উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া ঋণের নামে অর্থ লুটে নেয়া বেসিক ব্যাংকের ঘাটতিও কিছুটা কমেছে। ব্যাংকটির বর্তমান ঘাটতি ২৩৬ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে ব্যাংকটির ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। তবে গত ডিসেম্বর শেষে রূপালী ব্যাংকের ২০ কোটি টাকা মূলধন উদ্বৃত্ত থাকলেও এ বছর মার্চে এসে ঘাটতি রয়েছে ১৫৪ কোটি টাকা। রাষ্টায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকে ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা ঘাটতি বেড়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঘাটতি ছিল ৮৮৩ কোটি টাকা। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি হয়েছে ৭৩৪ কোটি।

বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ১ হাজার ৫৬৯ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৪৩৪ কোটি, এবি ব্যাংকের ৩৭৬ কোটি ও বিদেশি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঘাটতি হয়েছে ৫৪ কোটি টাকা।

ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডার বা মালিকদের জোগান দেয়া অর্থই মূলধন হিসেবে বিবেচিত। আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আলোকে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি সেই পরিমাণ মূলধন রাখতে হচ্ছে। কোনো ব্যাংক এ পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে মূলধন ঘাটতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box