মাঠে নজর আ.লীগ-বিএনপি-জাপার

আলোকিত সকাল ডেস্ক

শান্ত রাজনৈতিক মাঠে এখন ঘর গোছাতে মাঠে নেমেছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। আগামীদিনের জাতীয় রাজনীতি এবং প্রতিপক্ষের চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও সংসদীয় বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নজর এখন নিজ ঘরের দিকে।

মূল দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার পাশাপাশি সহযোগী সংগঠনগুলোকে শক্ত ভিত দিতে তৎপর ৩ দলই। প্রতিটি দলের এখন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

আগামীদিনের রাজপথ এবং প্রতিপক্ষ দলকে মাথায় রেখে দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের হাতে আগামীদিনের হাল তুলে দিতে চায় প্রতিটি দলই।

তথ্য মতে, জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়, উপজেলা নির্বাচনে জয়ের পর জাতীয় কাউন্সিলকে ঘিরে এখন সরগরম আওয়ামী লীগের রাজনীতি। দলটির ২১তম জাতীয় কাউন্সিল আগামী অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলন করার ইচ্ছাপোষণ করে প্রস্তুতি নিতে সিনিয়র নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।

দলীয়প্রধানের নির্দেশনার পর কাউন্সিল নিয়ে তৎপরতা শুরু করেছেন নেতারা। যার আমেজ তৃণমূল পর্যায়েও পড়েছে। সম্প্রতি দলের প্রেসিডিয়াম সভায় জাতীয় কাউন্সিল সফল করতে ৮ বিভাগে ৮টি টিম গঠন করা হয়েছে।

সূত্র মতে, সারা দেশে আওয়ামী লীগের ৭৮টি সাংগঠনিক কমিটি রয়েছে। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের মধ্যেই বেশিরভাগ জেলার ত্রিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরই মধ্যে প্রায় প্রতিটি কমিটি অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধশত কমিটিতে রয়েছে অন্তর্কোন্দল। তারা যার যার মতো কাজ করছে।

এতে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। জাতীয় সম্মেলনের আগেই দলের তৃণমূল সম্মেলন করার জন্য নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্যোগ নেওয়া হবে মেয়াদ উত্তীর্ণ জেলা ও উপজেলা কমিটির সম্মেলনের।

বিশেষ করে যেসব জেলার কমিটির নেতৃত্ব নিয়ে মতবিরোধ আছে, সেসব জেলার সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে জাতীয় সম্মেলনের মূল কাজ। ইতোমধ্যে সারা দেশের ইউনিয়নপর্যায়ে তৃণমূল সম্মেলন শুরু হয়েছে। স্থানীয় সাংসদ, জেলা ও উপজেলাপর্যায়ের নেতারা এসব সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।

মূল দলের পাশাপাশি সহযোগী সংগঠনগুলোকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনার পর মাঠপর্যায়ে কাজও শুরু করেছে সংগঠনগুলো। ইতোমধ্যে ছাত্রলীগের অন্তত ৩০টি ইউনিটের নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী যুবলীগও মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটির উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে সিরাজগঞ্জ, শরীয়তপুরসহ কয়েকটি জেলা ও উপজেলা সম্মেলন হয়েছে। সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার চাঁপাইনবানগঞ্জ জেলা যুবলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

যুবলীগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর ফারুক চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন। ধারাবাহিকভাবে বাকি মেয়াদ উত্তীর্ণ জেলাগুলোর সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হবে বলে যুবলীগ সূত্র নিশ্চিত করেছে। স্বেচ্ছাসেবকলীগ, শ্রমিক লীগও তৃণমূল সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিকে, জাতীয় কাউন্সিলের ঘোষণা আসায় ধানমন্ডিস্থ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের অফিস-বাসা এখন নেতাকর্মীদের সকাল-বিকাল ঠিকানা হয়ে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে তৃণমূল— সর্বত্র এখন কাউন্সিল আমেজ। নিজ পছন্দীয় নেতাকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পেতে অধীর আগ্রহে তৃণমূল তাকিয়ে আছে কেন্দ্রের দিকে। উন্নত বাংলাদেশ গঠন ও বিশ্ব পরিমণ্ডলে নিজেদের জানান দিতে আগামী কাউন্সিলে ঢেলে সাজানো হবে আওয়ামী লীগ।

নতুন কমিটিকে ঢেলে সাজাতে বয়সের ভারে ন্যূব্জ ও বিতর্কিত, দুর্নীতি ও পদবাণিজ্যে জড়িত, অযোগ্য ও সুবিধাবাদীদের চিহ্নিত করে কাউন্সিলে বাদ দেয়া হবে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান দেয়া হবে দলের জন্য নিবেদিত, পরীক্ষিত ত্যাগী নেতাদের। একইসঙ্গে এগিয়ে আনা হতে পারে মেধাবী, সৎ, একঝাঁক তরুণ নেতাকে। সংযোজন-সংশোধন আনা হবে গঠনতন্ত্রেও।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এ দলের সম্মেলন এলে নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসব ছড়িয়ে পড়ে। এখনো মূল প্রস্তুতি শুরু হয়নি। তৃণমূণকে শক্তিশালী করতে সাংগঠনিক কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। তৃণমূলের সম্মেলনের পর জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, অক্টোবরের ২৩ তারিখে আমাদের সম্মেলন হয়েছিল, আমরা অক্টোবরেই সম্মেলন করার চিন্তা করছি। নেত্রী ইতোমধ্যে যথাসময়ে সম্মেলন করার ইচ্ছাপোষণ করেছেন, আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। সকল স্তরের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে সম্মেলন সফল করার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সাংগঠনিক মিশনে বিএনপি
গত এক দশক ধরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেমে কাঙ্ক্ষিত সফলতা পায়নি বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন, নির্বাচন বয়কট আন্দোলনের কর্মসূচি দিলেও মাঠে শক্ত অবস্থান গড়তে সক্ষম হয়নি দলটির বর্তমান নেতৃত্ব।

দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেই দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে মাঠে নামতে চায় দলটি। এমবতস্থায় আপাতত দলের সাংগঠনিক ভিত মজবুত করার মিশনে ঘরের মাঠে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বিএনপি। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামনে রেখে বিএনপিকে পুনর্গঠন করা হবে।

বিএনপিসহ সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্বকে ঢেলে সাজাতে চান নীতিনির্ধারকরা। আগামীদিনের সরকারবিরোধী আন্দোলন সফল করতে ত্যাগী, পরীক্ষিত ও মাঠে শক্তি প্রদর্শনে সক্ষম এমন নেতৃত্ব এগিয়ে আনার জন্য কেন্দ্রীয় নেতারা কাজ শুরু করেছেন।

সম্প্রতি সারা দেশের ইউনিটের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের সঙ্গে স্কাইপিতে দিক নির্দেশনা দিয়েছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি জেলা ও ইউনিটের যুবদলের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। গত ৩ জুন বিএনপি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ছাত্রদলের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে দেয়।

এরপর নতুন কমিটি গঠনে বয়সসীমার একটি শর্ত যুক্ত করে দেয়। তাতে বলা হয়— ২০০০ সালের আগে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ কেউ নেতা হতে পারবে না। যদিও ওই শর্ত শিথিলের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে ছাত্রদলের একটি অংশ। কেন্দ্রীয় নেতাদের অবরুদ্ধ, কার্যালয়ে তালা দেওয়াসহ প্রতিদিনই নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করছে।

বিএনপি সূত্র মতে, ছাত্রদলের আন্দোলন আমলে নিচ্ছে না বিএনপির হাইকমান্ড। যেকোনো আন্দোলন সফল করতে ছাত্রদল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যতই বিক্ষোভ হোক, শক্তিশালী ছাত্রদল প্রতিষ্ঠায় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বিক্ষোভের মধ্যেই সহযোগী সংগঠনটির নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে আনা হচ্ছে।

ছাত্রদল কাউন্সিল আয়োজনে গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে ৫৭৫ জন কাউন্সিলর বা ভোটারের খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছেন। প্রতিটি সাংগঠনিক জেলা থেকে ৫ জন করে কাউন্সিলর নেওয়া হয়েছে। সাংগঠনিক জেলা ও বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজগুলোর কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদককে ভোটার করা হয়েছে।

আগামী ১৫ জুলাই ছাত্রদলের কাউন্সিলে ভোটাভুটির মাধ্যমে ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হবে বলে বিএনপি জানিয়েছে।

এদিকে, ছাত্রদলের কাউন্সিলের তারিখ ঘোষণার পর দলটির নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় হতে শুরু করেছে। ক্রমশই চাঙ্গা হয়ে উঠছে নয়াপল্টন্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও গুলশানের চেয়ারপারসনের কার্যালয়।

কাঙ্ক্ষিত পদ পেতে নেতাকর্মীরা সিনিয়র নেতাদের কাছে ধর্না দিতে শুরু করেছেন। কমিটি ঘোষণার পর ছাত্রদল নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে রাজধানীর কয়েকটি স্থানে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে মিছিল করেছে ছাত্রদলসহ সহযোগী সংগঠন।

সত্যিকারের বিরোধী দল হতে চায় জাতীয় পার্টি সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও পিছিয়ে নেই মাঠের রাজনীতিতে। সরকার ও বিরোধী দলে একসঙ্গে কাজ করার বিতর্ক নিয়ে মাঠ গোছানোর কাজে নেমেছে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রতিষ্ঠিত দলটি।

সম্প্রতি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে সাংগঠনিক কর্মসূচি গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন এরশাদ। এদিকে, গত কয়েক মাস ধরে শারীরিকভাবে অসুস্থতার কারণে রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় রয়েছেন এরশাদ। তিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

জাপা সূত্র জানায়, বর্তমান নেতৃত্ব জাতীয় পার্টি সত্যিকারের বিরোধী দল বানাতে চায়। এরই অংশ হিসেবে সরকারে যোগ দেয়নি। পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ চান সরকারের লেজুড়বৃত্তি না করে দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করে সংসদে ও মাঠের রাজনীতিতেও বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করুক।

পার্টিপ্রধানের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে তৃণমূল শক্তিশালী করতে মাঠে নেমেছে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। জেলা সফরসহ তৃণমূল সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর এজিবি কলোনি কমিউনিটি সেন্টারে চারদিনব্যাপী বিভাগীয় সাংগঠনিক সভার ডাকা হয়েছে। গত মঙ্গলবার তৃতীয় দিনে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সাংগঠনিক সভায় জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের বলেন, জাতীয় পার্টিকে (জাপা) নিয়ে আর বেচাকেনা চলবে না। বিগত নির্বাচনে পার্টির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমার মনে হয় নির্বাচনকালীন সময় যারা ছিলেন পরিস্থিতির কারণে তাদের কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল না।

মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছিল। কথা দিচ্ছি, ভবিষ্যতে এই সুযোগ থাকবে না। আমরা সবাইকে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাব। সামনে বিভিন্ন দল থেকে লোকজন আসবে, তাদের জায়গা দিতে হবে। তবে ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যায়ন করা হবে না।

জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমি পারিবারিক পরিচয়ে দলের নেতৃত্ব দিতে চাই না। আপনারা না চাইলে আমি নেতৃত্ব দেব না। আমি চাই এই পার্টির মালিক হবেন আপনারা সকলে। আমি পার্টির সব কার্যক্রমে আপনাদের সম্পৃক্ত করতে চাই।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box