মাগুরা থেকে বিশ্বসেরা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

মাশরুর রেজার ফুটবলের খুব শখ ছিল ছোটবেলায়। তৃতীয় বিভাগে কিছুদিন খেলেছিলেনও। কিন্তু জীবিকার তাগিদে জীবন নদীর গতিপথটা পাল্টে হয়ে গেলেন পুরোদস্তুর ব্যাংক কর্মকর্তা। প্রথম সন্তান ফয়সালের যখন জন্ম হলো, ঠিক করেছিলেন ছেলেকে ফুটবলার বানাবেন, নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো পূরণ হবে ফয়সালের চোখে। কিন্তু ফয়সালের বেড়ে ওঠার সময়টা যে ক্রিকেটের। কেনিয়াকে হারিয়ে আইসিসি ট্রফি জয়, মালয়েশিয়ায় আকরাম-নান্নু-মিনহাজদের পাগলাটে দৌড় ফয়সাল দেখেছিলেন কিনা কে জানে! তারপর তো ১৯৯৯ বিশ্বকাপে নর্দাম্পটনে রূপকথার পাকিস্তানবধ! ফুটবল ছেড়ে বছর বারো’র ছেলেটা প্রেমে পড়লে ক্রিকেটের। অজপাড়া গাঁয়ের ফয়সালের বিশ্বসেরা সাকিব হয়ে ওঠার গল্পটা এভাবেই সূচিত হলো।

টেপ টেনিস বলে তার বাঁ-হাতি পেসে হরহামেশাই নাকাল হতেন প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানরা, মাঝেমধ্যে রান আটকানোর নেশায় স্পিনটাও করতেন। আশপাশের গ্রামগুলোয় কোনো টুর্নামেন্ট হলেই সবার চাহিদার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতেন সেদিনের ফয়সাল, বলকে উড়িয়ে সীমানা ছাড়া করতেও ভালো জানতেন বেশ। নিজের এলাকায় ইসলামপুর রোড ক্রীড়াচক্রের হয়ে মাগুরা ক্রিকেট লীগে খেলতে নেমে প্রথম বলেই নিলেন উইকেট, প্রতিযোগিতামূলক খেলায় ক্রিকেট বলে তার করা প্রথম ডেলিভারী ছিল সেটি!

সাভারের বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংক্ষেপে বিকেএসপি; বাংলাদেশের খেলাধুলা শিক্ষার আঁতুড়ঘর। এখানেই শুরু মাগুরার এক অখ্যাত কিশোরের বিশ্বসেরা হয়ে ওঠার মিশনের। বিকেএসপির খাতায় ‘সাকিব আল হাসান’ নামটা লেখা হলো কলমের কালিতে, সেই নামকে কি দারুণ কৃতিত্বে সাকিব লিখেছেন প্রতিটা বাংলাদেশির হৃদয়ে।

মাত্র পনেরো বছর বয়স তখন, ডাক পেলেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। ২০০৫-এ তিন জাতি সিরিজের ফাইনালে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুসের শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ঝড়ো সেঞ্চুরির পাশাপাশি নিলেন তিন উইকেট, হলেন ম্যাচসেরা। বয়সভিত্তিক দলে পারফরম্যান্স নজরকাড়া, ছিলেন জাতীয় দলের রাডারেই। মোহাম্মদ রফিককে সঙ্গ দেওয়ার মতো বাঁহাতি স্পিনারের খোঁজে তখন হন্যে হয়ে ঘুরছেন নির্বাচকেরা। প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ একটা জুয়া খেললেন ২০০৬-এ; মুশফিক-ফরহাদ রেজার সঙ্গে সাকিব; তিন নবাগতকে পাঠিয়ে দিলেন জিম্বাবুয়ে সফরে।

ক্যারিবিয়ান সাগরপাড়ে ২০০৭ বিশ্বকাপের মঞ্চ, অচেনা মাঠে চেনা প্রতিপক্ষ। তারপরের গল্পটা সবার জানা। মাশরাফি তোপের পর তামিমের ব্যাটে চড়ে সাদা বলের গ্যালারির দিকে ভেসে যাওয়া, সাকিব মুশফিকের দৃঢ়তায় ভারতকে মাড়িয়ে ছুটেছিল টাইগারদের জয়রথ। এই ম্যাচ দিয়েই হয়তো প্রতীকীভাবে বাশার-রফিকদের হাত থেকে মাশরাফি-সাকিব-তামিম নামের এই তরুণ তুর্কীদের হাতে উঠে গেল বাংলাদেশের ক্রিকেট।

বাঁ-হাতি এই ক্রিকেটারের যেন জন্মই হয়েছে রেকর্ড ভাঙাগড়ার খেলায় মেতে ওঠার জন্য। সাদা পোশাকে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তার, ওয়েলিংটনে ২০১৭’র জানুয়ারিতে করা ২১৭ রানের ইনিংসটি টেস্টে যেকোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ ছিল, কিছুদিন পর অবশ্য মুশফিক ভেঙেছেন সেই রেকর্ড। বোলিংয়ে বাংলাদেশের হয়ে তিন ফরম্যাটের ক্রিকেট মিলিয়ে সর্বাধিক উইকেটের মালিক পঁচাত্তর নম্বর জার্সিধারীর। শুধু ওয়ানডেতেই উইকেটের অঙ্কে মাশরাফির চেয়ে সামান্য ব্যবধানে পিছিয়ে আছেন তিনি।

ক্রিকেট ইতিহাসেই সবগুলো ফরম্যাট মিলিয়ে কমপক্ষে নয় হাজার রান এবং চারশো উইকেটের মালিক হওয়া ষষ্ঠ খেলোয়াড় সাকিব। টেস্টে বাঁহাতি স্পিনারদের মধ্যে সর্বকালের পঞ্চম সর্বোচ্চ উইকেটের মালিকও তিনি। খুলনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একই টেস্টে সেঞ্চুরির পাশাপাশি ১০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন, নাম লিখিয়েছেন ইয়ান বোথাম আর ইমরান খানের পাশে। টেস্ট খেলুড়ে সবগুলো দেশের বিরুদ্ধে ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব আছে তার। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের খেতাবটাকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে রেখেছেন সেই কবে থেকে, মাঝেসাঝে তাতে হানা দিয়েছেন ওয়াটসন, কখনো বা ম্যাথুস-অশ্বিন-ম্যাক্সওয়েল-হাফিজরা; তবে রাজার মতোই আবার সেটা দখল করেছেন তিনি।

২০০৯-এ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কিংসটাউনে বাইশ গজে হোঁচট খেলেন মাশরাফি, হাঁটুর ইনজুরিতে ছিটকে পড়লেন দল থেকে। ডেপুটি সাকিবের মাথায় আচমকা অধিনায়কত্বের চাপ! সেই চাপকে অবলীলায় জয় করে খর্বশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজকে উড়িয়ে দিল বাংলাদেশ, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সিরিজসেরা হলেন বাংলাদেশি অলরাউন্ডার। অধিনায়ক সাকিব আসলে কতটা কার্যকর? ঊনপঞ্চাশটি ওয়ানডে ম্যাচে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দল জয়ের হাসি হেসেছে তেইশবার। শতকরার হিসেবে সাকিবের চেয়ে সফল শুধু মাশরাফি, সংখ্যার বিচারে এর চেয়ে বেশি জয় পেয়েছেন মাশরাফি আর হাবিবুল বাশার।

সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারের ছোট্ট তালিকাটাতেও হয়তো ক্যারিয়ার শেষে তার নামটা জ্বলজ্বল করবে, কিন্তু সর্বকালের সেরা বললেই যে দুটো নাম সবার আগে আসে, সেই জ্যাক ক্যালিস বা স্যার গারফিল্ড সোবার্সকে ছাপিয়ে যাওয়া কি সাকিবের পক্ষে সম্ভব? প্রায় পঁচিশ হাজার রান আর ছয়শোর কাছাকাছি উইকেটের মালিক জ্যাক ক্যালিস। মাগুরায় বসন্তের বাতাস গায়ে মেখে পৃথিবীর আলোয় এসেছিলেন ফয়সাল নামের ছেলেটা; আজ যিনি আমাদের সাকিব আল হাসান আরও বছর সাত-আটেক বড় কোন ইনজুরি ছাড়া খেলে যেতে পারবেন। তাহলে সর্বকালের সেরা হওয়া অসম্ভব হবে কেন?

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box