বিলুপ্তির পথে যাত্রাশিল্প

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ যাত্রাপালা। সারা রাত জেগে যাত্রা দেখে ঢুলু ঢুলু চোখে ভোরে বাড়ি ফেরা বাঙালীর ঐতিহ্যের একটি অংশ। গ্রামবাংলার পথেঘাটে মাইকে যাত্রাপালার প্রচার এখন নস্টালজিয়া। এই যাত্রা থেকেই এসেছে নাটক, থিয়েটার ও সিনেমা। বাঙালীর এই আদি সংস্কৃতি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন যাত্রামঞ্চে সেই বজ্রকণ্ঠের সিরাজউদ্দৌলার ডায়ালগ শোনা যায় না। দেখা যায় না কুশীলবের প্রাণখোলা অভিনয়। শোনা যায় না বিবেকের হৃদয়স্পর্শী গান কিংবা শানাইয়ের ঐতিহ্যবাহী করুণ সুর। সময়োপযোগী করে নতুনভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরার তেমন কোন উদ্যোগই চোখে পড়ে না। গল্পনির্ভর পালার পরিবর্তে অশ্লীল গীত-নৃত্য দিয়ে দর্শক টানার ব্যর্থ চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত যাত্রাপ্রেমী আর প্যান্ডেলে যেতে পারছে না। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দর্শক হারিয়ে অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে বিলুপ্ত হতে চলেছে ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্প।

যাত্রার মৌসুম শুরু হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা থেকে এবং শেষ হয় ৩০ চৈত্র। এক সময় স্থানীয় স্কুল, কলেজ ও ক্লাবের উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সময়ের উৎসব ও মেলায় যাত্রা গানের অনুমোদন দেয়া হতো, এখন আর হয় না। গত বছর বিক্ষিপ্তভাবে সারাদেশে ৭ থেকে ৮টি যাত্রার প্যান্ডেল হয়েছে। যার ফলে যাত্রাদলের মালিক থেকে শুরু করে শিল্পী, যন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই বেকার হয়ে পড়েছেন। অনেকে এই পেশা ছেড়ে দিয়ে জীবিকার জন্য অন্য কাজ শুরু করেছেন। যাত্রাশিল্প উন্নয়নে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও অসাধু আয়োজকদের কারণে যাত্রাদল মালিকরা অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। যার কারণে যাত্রার প্রতি মানুষের ভালবাসা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ইতোপূর্বে যাত্রাশিল্প ধ্বংস করার জন্য প্যান্ডেলে বোমা মারার চক্রান্তেও লিপ্ত হয়েছে এক শ্রেণীর অসাধু লোক। কোন অদৃশ্য শক্তি সংস্কৃতির এই শেকড় বিনষ্ট করার চক্রান্তে লিপ্ত তা এখনও লোকচক্ষুর অন্তরালে। যাত্রাশিল্প ধীরে ধীরে কেন বিলুপ্তির পথে এ প্রশ্ন ঘুরে ফিরে সবার মুখে। কেউ দুষছেন স্থানীয় প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতাকে, কেউ দুষছেন যাত্রাদলের মালিকদের, কেউ বলছেন পৃষ্ঠপোষকতার অভাব আবার কেউ বলছেন আয়োজক কমিটি সংস্কৃতিমনস্ক না হওয়ার কারণে এই দৈন্যদশা। যাত্রা মালিক ও শিল্পীরা বলছেন, এই অশ্লীলতা তারাও পছন্দ করেন না। তাদের এই পেশা টিকিয়ে রাখতে এবং বাঁচার তাগিদে একটি চক্রের কাছে জিম্মি হয়েই তারা অশ্লীলতায় বাধ্য হচ্ছেন।

কয়েক বছর ধরে লোকসানের ঘানি টানতে টানতে ক্লান্ত যাত্রাদল মালিকরা। পর্যাপ্ত যাত্রাগানের আয়োজন না থাকার কারণে অধিকাংশ দলকেই বসে থাকতে হচ্ছে। কালেভদ্রে দুয়েকটা বায়না পেলে তাতে শিল্পী আর কুশীলবের বেতন ও অন্যান্য খরচ শেষে হাতে আর কিছুই থাকে না। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, অনেকে পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নারী যাত্রাদলের মালিকরা। গোপালগঞ্জের নারী যাত্রাদলের মালিক মনীষা অধিকারী সাতপাড় বাজারে পার্লার খুলে বসেছেন। যাত্রার কথা আর ভাবতেই পারছেন না। অথচ একসময় দলে নাচতেন ও অভিনয় করতেন। নেশাকে পেশা হিসেবে নিয়ে কয়েক বছর যাত্রার দল গঠন করে ঘুরেছেন দেশের আনাচেকানাচে। নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জের আয়েশা আক্তার টানা ১৮ বছর যাত্রার দল নিয়ে মাঠে মাঠে ঘুরে এখন নিঃস্ব। সিদ্ধিরগঞ্জের বাসার পাশে একটা মুদিদোকান নিয়ে বসেছেন। চা-পানও বিক্রি করছেন। খুলনার মোংলায় একসময় দাপুটে নাচের শিল্পী পারুল দল গঠন করে অনেক শিল্পীর রোজগারের ব্যবস্থা করেন। লোকসানের ঘানি টেনে তিনিও যাত্রা ছেড়েছেন। কিশোরগঞ্জে যাত্রাদলের নায়িকা হিসেবে রতœার যথেষ্ট সুনাম ছিল। কয়েক বছর নিজে দলও করেছেন। লাভের আশায় লোকসান দিয়েছেন প্রচুর। এখন শৌখিন দলে ডাক পড়লে যা আসে, তা-ই দিয়ে চলছে সংসার। মানিকগঞ্জের কৃষ্ণা স্বামীর সহায়তায় দল গঠন করে ঠকেছেন বারবার। নিজে অভিনেত্রী, স্বামী অভিনেতা; তবু লাভের মুখ দেখতে পাননি তিনি। এখন যাত্রার পোশাক ভাড়া দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। ডেমরার আদমজীতে বসবাস সিনেমার নাচিয়ে মেয়ে মৌসুমী পারভিন তারার। সিনেমায় নাচে যথেষ্ট খ্যাতি ছিল তার। প্রথমে লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে, পরে নিজের নামে লাইসেন্স করে দল গঠন করেন। কিন্তু তিনিও টিকতে পারেননি। নাজুক অবস্থায় আছেন নরসিংদীর সুফিয়া খাতুন, গাজীপুরের হালিমা খাতুন, নেত্রকোনার বিউটি, সিদ্ধিরগঞ্জের মনোয়ারা, বরিশালের রূপালী, খুলনার দেবী ঘোষ, যশোরের গঙ্গারানী প্রমুখ। যাত্রাদলের এসব নারী মালিক না বুঝে কেউই পেশায় নামেননি। সবাই নৃত্য, গীত, অভিনয়ে পারদর্শী। একসময় প্রত্যেকের দলেই অনেক শিল্পী-কুশীলব ছিলেন। আর আজ সেসব মালিকই সংসার চালাচ্ছেন নানা কাজের মাধ্যমে। মাঝেমধ্যে যাত্রার কথা উঠলেই হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। বোবা কান্না আটকে থাকে বুকের মধ্যে।

বাগেরহাটের মোংলা থানার সুন্দরবন অপেরার মালিক, অভিনয়শিল্পী পারুল চৌধুরী বলেন, যাত্রা করার মতো পরিবেশ নাই বলেই আপাতত আমার দলটি বন্ধ আছে। এখন অতিরিক্ত ন্যাকেড নাচ-গান হয়। আমি ছোটবেলা থেকে নাচ-গানের সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকাটা আমি মন থেকে মানতে পারছি না।

যাত্রাশিল্প কেন ধ্বংসের পথে এর কয়েকটি কারণ দেখালেন যাত্রা পালাকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এমএ মজিদ। তিনি বললেন, যাত্রার আনুষ্ঠানিকতা অর্থাৎ আমরা যাকে বলি ঘট পাতানো ও মহড়া শুরু হয় শ্রী কৃষ্ণের রথযাত্রার দিন থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে এর আনুষ্ঠানিকতা এক প্রকার নেই বললেই চলে। যাত্রাদলের মালিকরা নতুন কোন পালা নির্বাচন করেন না। পুরনো পালার নাম পরিবর্তন করে নতুন বলে মঞ্চায়ন করেন। যাত্রামোদী দর্শক নতুন পালার নাম শুনে দেখতে আসেন কিন্তু পুরনো পালা দেখে যাত্রার প্রতি আগ্রহ হারান। সঙ্গত কারণে নাচের প্রতি আকৃষ্ট হন। আগে স্কুল, কলেজ ও ক্লাবের উন্নয়নে যাত্রা করার অনুমোদন দেয়া হতো, কিন্তু বর্তমানে আয়োজক সংস্কৃতিমনস্ক না হওয়ায় যাত্রাপালার গুরুত্ব না দিয়ে নৃত্যকে প্রাধান্য দেন। যাত্রাশিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ’। তাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল যাত্রাশিল্প উন্নয়নে একটি নীতিমালা পাস করা। সেই অনুসারে ২০১২ সালে সরকারীভাবে যাত্রাশিল্পের একটি নীতিমালা পাস হয়। এই নীতিমালার আলোকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ পর্যন্ত শিল্পকলা একাডেমি ১১১টি যাত্রাদলকে নিবন্ধন দিয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে এসে আবার নিবন্ধন হয়েছে ১৫টি দলের। এই নিবন্ধনের প্রথম শর্ত হলো এই নিবন্ধন হস্তান্তরযোগ্য নয়। কিন্তু অনেক যাত্রা মালিক নিবন্ধন করে নিজে দল না করে আরেক জনের কাছে দলটি ভাড়া দেয়। যিনি ভাড়া নিয়ে দল করছেন তিনি কিন্তু ওই বছরের জন্য তার ইচ্ছামতো দল পরিচালনা করছে। বর্তমানের কিছু উচ্ছৃঙ্খল দর্শক ও আয়োজকের চাহিদা অনুযায়ী পালাকে প্রাধান্য না দিয়ে নৃত্যকে প্রাধান্য দিয়ে রাত পার করছেন। সেই অনৈতিক কর্মকা-টুকু ওই মালিকরা করছেন। এর ফলে প্রকৃত নিবন্ধনকারী মালিক দলের বায়না পাচ্ছে না।

বলা যায় নিবন্ধন ভাড়া নিয়ে যারা দল করছেন তারা অশ্লীলতাকে আরও প্রশ্রয় দিচ্ছেস। নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী অনেকে ব্যাংক সলভেন্সি ছাড়াই ব্যাংকের প্রত্যয়নপত্র দেন জমা তিনি দল করতে পারবেন কি পারবেন না, এটা যাচাই করা হয় না। এর পরের শর্ত হলো এই দল করতে হলে তার নিজস্ব শিল্পী থাকতে হবে। কতকগুলো নাম দিয়ে ফরম পূরণ করেন। নিবন্ধন নেয়াটাই কিন্তু দল মালিকদের একটা প্রতারণা হয়ে যাচ্ছে। মাঠে বা প্যান্ডেলে যখন যাত্রা করতে যাচ্ছেন তখন আধুনিক ইনস্ট্রুমেন্ট এমনভাবে বাজানো হচ্ছে এগুলো যাত্রার সঙ্গে যায় না। আগে যাত্রাদলের মেয়েরা যখন মঞ্চে নাচতে উঠতেন তখন তিনি স্বকণ্ঠে একটা গান পরিবেশন করতেন এবং তিনি তার সঙ্গে তালে তালে নাচতেন। এখন স্বকণ্ঠে আর গান গাওয়া হয় না। এখন মোবাইলে যে গান রেকর্ড করা আছে সেটা বাদ্যযন্ত্রের ওপর রাখা হয়, মোবাইলে বেজে যায় ও তার তালে তালে নেচে যান। এখন সংস্কৃতিমনস্ক কোন ব্যক্তি যাত্রার আয়োজন না করায় এবং যারা আয়োজন করছেন তারা কিভাবে পয়সা আয় করা যায় এটাই মাথায় রাখেন। পয়সা আয় করতে গিয়ে নাচের প্রবণতা বাড়ানো হচ্ছে। এক শ্রেণীর দর্শক সেটাকে লুফে নিচ্ছেন। কোন কোন যাত্রাদলে দেখা যায় সারারাত কোন পালা মঞ্চায়ন না হয়ে সারারাত নাচ চলে। পালার কাহিনীকে খ-িত করে কোন কোন দল মঞ্চায়ন করে। পালা সংক্ষিপ্ত করতে গিয়ে গল্পের মর্যাদা হারায়। নানাবিধ কারণে যাত্রা হারিয়ে যাচ্ছে। নতুন তেমন কোন পালা নেই। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে যে পালা রচিত হয়েছে তার নাম পরিবর্তন করে মঞ্চায়ন হয়। তবে দুই একটা মূল ধারার দল যারা শিল্পকলা একাডেমি থেকে নিবন্ধন করেছে, যাত্রা তাদের পেশা। তারা বছরে দুই একটা নতুন পালা মঞ্চে আনে। এই যে নতুন পালা না রাখার কারণে আমাদের দেশে পালাকারও কমে যাচ্ছে। গত যে মৌসুম চলে গেছে ঐ মৌসুমে সর্বোচ্চ ১৫টি দল যাত্রা করেছে। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি দল মূল ধারার দল, বাকিগুলো লাইসেন্স ভাড়া করে নিয়ে দল চালিয়েছে। শিল্পকলা একাডেমি বারবার চেষ্টা করেছে কিভাবে যাত্রার উন্নয়ন ও যাত্রাদলকে আরও বেগবান করা যায়। স্থানীয় অসাধু আয়োজকদের কারণে সেটা করা সম্ভব হচ্ছে না। সর্বশেষ শিল্পকলা একাডেমি গত মৌসুমে ৬৪ জেলায় একাডেমির কালচারাল অফিসারের দায়িত্বে ৬৪টি দেশীয় পালা মঞ্চায়ন করেছে। সেখানে অনেক পালাকারের পালা মঞ্চায়ন হয়েছে। প্রথম চেষ্টা সেটা কিন্তু অনেকটা সুফল বয়ে এনেছে। এতে স্থানীয় দর্শকদের কিছুটা জ্ঞান ফিরে এসেছে। যে আমাদের আদি সংস্কৃতি যাত্রা, এটা সংস্কৃতির একটা মাধ্যম। এটাকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে, তাহলে হয়তো যাত্রার কল্যাণ হবে।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর কাছে যাত্রা বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাত্রা বিষয়ে সার্বিক দায়িত্ব রয়েছে সেট ডিজাইনার পূর্ণলাক্ষ চাকমার ওপর। আমরা যাত্রা নিয়ে যেসব কাজ করেছি সেসব বলে দিতে পারবে। পূর্ণলাক্ষ চাকমা বলেন, আমরা সর্বশেষ ৬৪ জেলায় যাত্রা কার্যক্রম এবং পাঁচটি দেশীয় যাত্রাপালা নিয়ে উৎসব করলাম শিল্পকলায়। আমরা যতটুকু জেনেছি যে, অনুমোদনের ব্যাপারে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাত্রাপালা পরিবেশনে অনুমোদন দিতে ঝামেলা করছে। আমরা নীতিমালা করেছি, যার ফলে যাত্রায় এখন অশ্লীল নৃত্য করার উপায় নেই। আমাদের নীতিমালায় উল্লেখ আছে মালিকদের নিবন্ধন হস্তান্তরযোগ্য নয়। আমরা যদি কোথাও এমন রিপোর্ট পেয়ে থাকি যে একজনের নামে নিবন্ধন কিন্তু অন্য জনে দল করছে, তাহলে জেলা কালচারাল অফিসারের মাধ্যমে তার শাস্তির ব্যবস্থা করি। এর কারণে ইতোমধ্যে কয়েকটি দলের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি দেশ অপেরার মালিক যাত্রানট ও পালাকার মিলন কান্তি দে বলেন, চলমান যাত্রাদল এখন কমার্শিয়ালে চলছে। প্রতি সিজনে ত্রিশ-চল্লিশটি দল পালা করে বেড়ায়, তার মধ্যে পাঁচ ছয়টি দল ভাল। যাত্রাকে কেন্দ্র করে জুয়া ও হাউজি খেলা কিছুটা কমে এসেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন এগুলো করে। এরা ডিসির অজান্তে এসব করে। স্থানীয় থানা পুলিশকে হাত করে এসব করে। রাতারাতি এগুলো সমাধান সম্ভব নয়। এগুলোকে বলে দুষ্টক্ষত। এসব অশ্লীলতার কারণে কয়েকটি দল আমরা ব্যান্ড করে দিয়েছি। আমরা সান্ধ্যকালীন যাত্রাপালা করার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে আমাদের কয়েকটি দল সান্ধ্যকালীন যাত্রা করছে। আমরা যাত্রার নামে যে আগাছা এগুলোকে দূর করে একটি সৃজনশীল যাত্রাপথ রচনা করতে চাই। এক সময় ছিল নাচ, গান, জুয়া হাউজিংয়ে জমজমাট কান্ড। সেদিন এখন আর নেই। মানুষ সচেতন হয়ে গেছে, সরকারও বুঝতে পারছে, শৃঙ্খলাও ফিরে আসছে। এখন শুধু নির্মল জিনিষ, যা কিছু হবে নির্মল।

বাংলাদেশ যাত্রাদল মালিক সমিতির সভাপতি যশোরের মনিরামপুরের আনন্দ অপেরার মালিক মোশারফ হোসেন নয়ন বলেন, বর্তমানে যাত্রায় অশ্লীলতা কমে এসেছে। যারা এগুলো করে তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কিন্তু যাত্রাগান পরিবেশনে অনুমতির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতায় আমরা শেষ। যদিও এটা আয়োজক পার্টি করে। তাতে যে ব্যায় হয় এর জন্য আয়োজকরা পিছিয়ে যাচ্ছেন। যার ফলে গ্রাম-গঞ্জে যারা আয়োজন করতেন তারা এত টাকা খরচ করতে চান না। এখন পারমিশন চলে গেছে জুয়াড়ুদের কাছে। ওরা জুয়া, লটারি, হাউজি চালায়। আমরা জুয়াড়িদের কাছে জিম্মি হয়ে গেছি। অভিনয় সমৃদ্ধ দল করে অনেকে টিকে থাকতে পারে না। যখন এই অবস্থা হয় তখন অভিনয়শিল্পী বাদ দিয়ে সারারাত নাচ-গান দিয়ে চালায়।

বাংলাদেশ যাত্রাদল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাতক্ষীরার দিগি¦জয়ী অপেরার মালিক শফিকুল ইসলাম বলেন, যাত্রার সার্বিক অবস্থা এখন খুবই খারাপ। বাংলাদেশে যাত্রার পারমিশন নেই। স্থানীয় প্রশাসন ঘুষ পেলে যাত্রা করার অনুমোদন দেয়, না পেলে দেয় না। যাত্রা শিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারের সার্বিক সহযোগিতা আমরা সব সময় আশা করি। নাটক, সিনেমা বা অন্যান্য দিকে সরকার সাবসিডি দেয় কিন্তু যাত্রায় কিছুই দেয় না। এই শিল্পের ওপর দেশের অনেকের জীবন জীবিকা নির্ভর করে। তাদের নিদারুন কষ্ট। এই শিল্পটাকে বাঁচানোর জন্যে সবার এগিয়ে আসা উচিত। আমরা ভালর পক্ষে। আমরা যাত্রায় অশ্লীলতা চাই না।

লোকনাট্যগোষ্ঠীর স্বত্বাধিকারী যাত্রানট তাপস সরকার বলেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নানা উদ্যোগে যাত্রায় অশ্লীলতা কমে গেছে। যাত্রা মালিকদের দায়িত্ব তারা যেখানে পালা করবে, তারা যেন এগ্রিমেন্টের কপি রাখে। প্রয়োজনবোধে শিল্পকলায় জমা দেবে। আমার মনে হচ্ছে আমাদের যাত্রা অনেকটা এগিয়ে যাচ্ছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box