বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে

আলোকিত সকাল ডেস্ক

চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়েছে ৩৯.২১ শতাংশ। গত অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ২০৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাংলাদেশে এসেছিল। এই অর্থবছরের (২০১৮-১৯) একই সময়ে এসেছে ২৮৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ হিসাবে এই নয় মাসে এফডিআই বেড়েছে ৩৯ দশমিক ২১ শতাংশ।

এই সময়ে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বাবদ দেশে এসেছে ৪৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েক মাস আগে যেভাবে আমদানি বাড়ছিল সেটা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় ঘটত। বছরের শেষ ভাগে এসে আমদানি কমায় সে ঝুঁকি কেটে গেছে। আমদানি কমায় ব্যালান্স অব পেমেন্টে ঘাটতিও কমে আসছে। কমছে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি।

এর আগের বছরেও দেশে ৩৫০ কোটি ডলারের বেশি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে। যা ২০১৭ সালের তুলনায় প্রায় ৬৮ শতাংশ বেশি। এক বছরের হিসাবে এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ এবং ৩০০ কোটি ডলারের ঘর ছোঁয়ার নতুন মাইলফলক। এর আগে ২০১৫ সালে প্রথমবার বিদেশি বিনিয়োগ ২০০ কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সার্ভে প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

নিজ দেশের বাইরে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশিরা অনেক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে থাকে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ডুইং বিজনেস সূচক, ব্যবসার ছাড়পত্র এবং জমি ও শ্রমের সহজলভ্যতা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২১ সালে মধ্যম ও ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশে রূপান্তরের লক্ষ্য পূরণে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। বিশেষ করে বছরে বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে এক হাজার কোটি ডলার।

ডুইং বিজনেস সূচকের মাধ্যমে একটি দেশে ব্যবসা করার নিয়মকানুন ও প্রক্রিয়া কতটা সহজ বা কঠিন, তার তুলনামূলক চিত্র উঠে আসে। বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজীকরণসংক্রান্ত ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট ২০১৮ অনুযায়ী, ১৯০টি দেশের মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৯তম। ২০১৭ সালে এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৬তম। অর্থাৎ গত বছর অবনতি হয়েছে। তবে ২০২১ সালের মধ্যে ডুয়িং বিজনেস সূচকে ১০০-র নিচে আসতে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। এরই মধ্যে বিডায় পাইলট আকারে ওয়ান স্টপ সার্ভিস কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যেখানে মিলছে প্রায় ১৫টি সেবা।

এদিকে একই সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। আর আমদানি খরচ বেড়েছে ৫ দশমিক ১৩ শতাংশ। তারপরও পণ্য বাণিজ্যে বাংলাদেশের সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯২ কোটি ৮০ লাখ (১১.৯৩ বিলিয়ন) ডলার। এই ঘাটতি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে কিছুটা কম হলেও অর্থনীতির জন্য ‘স্বস্তিদায়ক’ নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ঘাটতি বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের লেনদেন ভারসাম্যের হালনাগাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে ৪ হাজার ২৩৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৪৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

এ হিসেবে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯২ কোটি ৮০ লাখ (১১.৯৩ বিলিয়ন) ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩১৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ১ হাজার ৮২৫ কোটি ৮০ লাখ ডলারের বাণিজ্যঘাটতি নিয়ে অর্থবছর শেষ হয়েছিল।

গত অর্থবছরে আমদানি ব্যয় ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ বৃদ্ধির বিপরীতে রপ্তানি আয় ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়েছিল। আমদানির গতি কম থাকায় এবং রপ্তানি বাড়ায় সবাই আশা করেছিল এবার বাণিজ্যঘাটতি বেশ খানিকটা কমবে। কিন্তু নয় মাসের (জুলাই-মার্চ) তথ্যে তেমনটা দেখা যাচ্ছে না।

নয় মাসের হিসেবে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি গত অর্থবছরের চেয়ে কম থাকলেও সেবা বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে সেবাবাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৬৮ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ২৫৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার ছিল। তবে সরকারের আর্থিক হিসাবে (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। জুলাই-মার্চ সময়ে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্ত ছিল ৫৪৯ কোটি ১০ লাখ ডলার।

বিডার একজন কর্মকর্তা জানান, ডুয়িং বিজনেসে পিছিয়ে থাকলেও সামাজিক ও অন্যান্য সূচকে অনেক উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। এজন্য বিদেশিরা বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে। ফলে ইকুইটি বা নতুন বিনিয়োগ বাড়ছে। আবার যারা আগে থেকে এখানে আছে তারাও উলেস্নখযোগ্য পুনর্বিনিয়োগ করছে। মোট কথা, যারা বাংলাদেশে একবার বিনিয়োগ করে, তারা আর ফেরত যেতে চায় না। এখানে রিটার্নও পাওয়া যায় বেশি।

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রণোদনা ও বিভিন্ন উৎসাহমূলক সুবিধা দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে অন্তত ১৭টি খাতে কর অবকাশ সুবিধা পাচ্ছে বিদেশিরা। বিদেশিদের মুনাফা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও বিধিবিধান শিথিল করা আছে। মুনাফাসহ শতভাগ মূলধন ফেরত নেয়ার পাশাপাশি নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠায় যন্ত্রপাতির অবচয় সুবিধা, শুল্কমুক্ত যন্ত্রাংশ আমদানি এবং রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল থেকে কম সুদে ঋণ নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে বিদেশিরা। এ ছাড়া বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি কার্যকর পদক্ষেপ হচ্ছে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) স্থাপন, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড) প্রতিষ্ঠার অনুমতি দান। এসব সুবিধা দেয়ার উদ্দেশ্যই হলো বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে দেশে মোট নিট এফডিআই এসেছে ৩৬১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার; যা ২০১৭ সালের তুলনায় ১৪৬ কোটি ডলার বা ৬৭.৯০ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে দেশে সরাসরি নিট বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছিল ২১৫ কোটি ১৫ লাখ ডলার।

গত বছর দেশে যে পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, তার মধ্যে ইকুইটি মূলধন বা নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১১২ কোটি ৪১ লাখ ডলার। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ৫৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। আলোচ্য সময়ে বহুজাতিক কোম্পানির পুনর্বিনিয়োগ হিসেবে এসেছে ১৩০ কোটি ৯১ লাখ ডলার। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ১২৭ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। এ ছাড়া গত বছর আন্তঃকোম্পানির ঋণ হিসেবে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১১৮ ডলার।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box