বিতর্কিতরা বাদ আসছে নতুন মুখ!

আলোকিত সকাল ডেস্ক

দীর্ঘ সমলোচনার প্রায় এক বছরের মাথায় গত সোমবার ৩০১ সদস্যবিশিষ্ট ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে সংগঠনটির দুই শীর্ষ নেতা। সে সময় সদ্য ঘোষিত কমিটিতে বিতর্কিত নেতাদের স্থান দেয়ায় অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করে পদবঞ্চিতরা। তবে এবার ওই সকল বিতর্কিত নেতাদের কমিটি থেকে বাদ দেয়ায় প্রক্রিয়া শুরু করেছে সংগঠনের সভাপতি-সম্পাদক।

বিতর্কিতদের নেতাদের বাদ দিলেও সহসাই পূরণ হচ্ছে না শূন্য পদগুলো। ওই পদগুলো সঠিক বিচার বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত ও গ্রহযোগ্য নেতাকর্মীদের স্থান দেয়া হবে বলে ছাত্রলীগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছেন।

ছাত্রলীগের বঞ্চিতদের সূত্রে জানা যায়, নবগঠিত ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই পদবঞ্চিত ও পদাকাঙ্ক্ষিত নেতাদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা অভিযোগ করেন, বিতর্কিত নেতাদের কমিটিতে স্থান দেয়া হয়েছে। কী কারণে তারা ‘বিতর্কিত’ এর ব্যাখ্যাও দেন পদবঞ্চিত ও পদাকাঙ্ক্ষীরা।

তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় অভিযুক্ত, হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন মামলার আসামি, সংগঠনের গঠনতন্ত্র নির্ধারিত বয়সোত্তীর্ণ, মাদক ব্যবসায় অভিযুক্ত, অপকর্মের দায়ে সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত, সাজাপ্রাপ্তরা ও বিবাহিতরাও কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, কমিটিতে স্থান পাওয়া ওই সকল বিতর্কিতদের নামের তালিকা প্রকাশ করেন তারা।

এদিকে অভিযোগের ভিত্তিতে কমিটিতে স্থান পাওয়া ওই সকল নেতাদের কপাল পুড়তে পারে। যাদের কপাল পুড়তে পারে তারা হলেন- সহ-সভাপতি রেজাউল করিম সুমন, আবু সালমান প্রধান শাওন, ফুয়াদ রহমান খান, তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী, তৌহিদুর রহমান হিমেল, সৃজন ভূঁইয়া, তৌহিদুর রহমান পরশ, কামাল খান, আবু সাঈদ সাস্ট, খালিদ হাসান নয়ন, রুহুল আমিন, এস এম হাসান আতিক, জিয়ান আল রশিদ, সোহেল রানা, তরিকুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম, এম সাজ্জাদ হোসেন, আলিমুল হক, মাজহারুল ইসলাম মিরাজ, তৌহিদুল ইসলাম জহির। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ চৌধুরী, মো. শাকিল ভূঁইয়া, মোর্শেদুল হাসান রুপম। সাংগঠনিক সম্পাদক ফেরদৌস আলম, সোহানুর রহমান সোহান, ও নাজিম উদ্দিন, আন্তর্জাতিক সম্পাদক-রাকিনুল হক চৌধুরী, অর্থ সম্পাদক- মো. রাকিব হোসেন, পাঠাগার সম্পাদক- জাভেদ হোসেন, আইন সম্পাদক- ফুয়াদ রহমান শাকিল, উপ- প্রচার-আরিফ শেখ, নিলায়ন বাপ্পী, সিজাদ আরেফিন শাওন, উপ দপ্তর- মাহমুদ আব্দুল্লাহ বিন মুন্সি, মোমিন শাহরিয়ার, উপ-গ্রন্থনা ও প্রকাশনা- সৌরভ নাথ, উপ-আন্তর্জাতিক- ফুয়াদ হাসান, ধর্ম সম্পাদক- তাজ উদ্দিন, উপ গণশিক্ষা-মনিরুজ্জামান তরুন, উপ ত্রাণ ও দুর্যোগ সম্পাদক- ফেরদৌস শাহরিয়া নিলয়, সালেকুর রহমান শাকিল, সালেকুর রহমান শাকিল, উপ স্বাস্থ্য-ডা. শাহজালাল, শফিউল ইসলাম সজিব, উপ-গণযোগাযোগ- সুশোভন অর্ক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ক সম্পাদক- আসিফ ইকবাল অনিক, মো. তুষার, রাকিবুল ইসলাম সাকিব, উপ আপ্যয়ন- শাহরিয়ার মাহমুদ রাজু, উপ-মানবসম্পদ- হিরণ ভূঁইয়া, বেলাল মুন্না, কৃষি সম্পাদক- এস এম মাহমুদুর রহমান মিঠু, উপ কর্মসংস্থান- অভিমুন্য বিশ্বাস অভি, আল ইমরান, উপ প্রশিক্ষণ- মেসকাত হোসেন, উপ ক্রীড়া- বায়েজিদ কোতয়াল, উপ-গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন- নাজমুল হুদা সুমন, উপ নাট্য বিতর্ক- মাজহারুল কবির শয়ন, সহ-সম্পাদক- জাফর আহমেদ ইমন, তানভীর আব্দুল্লাহ, সামিহা সরকার, ফারজানা ইসলাম রাখি, তামান্না তাসনিম তমা, মো. মেহেদী হাসান রাজু, আঞ্জুমান আরা অনু, আসিফ রায়হান, শফিকুল ইসলাম কোতয়াল, শেখ আরজু, সোহেল রানা শান্ত, রনি চৌধুরী, ওমর ফারুক পাংকু ও রেজাউল করিম।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, ছাত্রলীগের ঘোষিত কমিটির অনেকের বিরুদ্ধে গঠনতন্ত্রবিরোধী অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই সকল নেতাদের অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যদি তারা অভিযোগ থেকে মুক্তি পান তাহলে তাদের পদ থাকবে। অন্যথায় তাদের পদগুলো শূন্য ঘোষণা করে যোগ্যদের সেখানে স্থান দেয়া হবে।

তথ্য মতে, দীর্ঘ এক বছরের মাথায় গত সোমবার ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। নব ঘোষিত কমিটিতে অছাত্র, ছাত্রদলের কর্মী, বিবাহিত, মাদক ব্যবসায়ী, রাজাকার ও বিএনপি পরিবারের সদস্য এবং হত্যাচেস্টা মামলার আসামিসহ বিতর্কিতদের স্থান দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে শুধু স্থান নয়, গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হয় তাদের। মূলত তারা সবাই বর্তমান সভাপতি-সম্পাদকের অনুসারী হওয়ার কারণে এই নব ঘোষিত কমিটিতে স্থান পেয়েছে বলে ছাত্রলীগের একটি অংশের দাবি।

এদিকে ওই সকল বিতর্কিত নেতারা ছাত্রলীগের কমিটিতে স্থান পাওয়ার কারণে দায়িত্বশীল ও যোগ্যতাভিত্তিক পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছে ছাত্রলীগের ত্যাগী নেতারা। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও বিশ্ববিদ্যালয় হল শাখার দায়িত্ব থাকা ছাত্রলীগের অনেক নেতারা কাঙ্ক্ষিত পদবঞ্চিত হন।

অপেক্ষাকৃত জুনিয়র ও অচেনা মুখ আনা হয়েছে কেন্দ্রী কমিটিতে। এসব অভিযোগে কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই বিক্ষোভ করেন কাঙ্ক্ষিত পদবঞ্চিত নেতাকর্মীর। যা নিয়ে বিক্ষুব্ধ হন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে তিনি নিদের্শনাও দিয়েছেন। নেত্রীর নিদের্শনা পাওয়ার পর বিতর্কিত নেতাদের কমিটি থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে গত বুধবার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে গণভবনে ডেকে কমিটি থেকে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে ত্যাগীদের নিয়ে পুনর্গঠনের নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। ওই দিন শেষে রাতেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। কমিটি থেকে কাউকে বাদ দেয়ার বেলায় সংগঠনের গঠনতন্ত্র ও আর্দশকে গুরুত্ব দেয়া হবে এ সময় সিদ্ধান্ত হয়।

সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় চার নেতাকেও প্রধানমন্ত্রী একই নির্দেশ দেন বলে ক্ষমতাসীন দলের উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেন। পদপ্রাপ্ত কয়েকজনের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি পদপ্রাপ্ত সবার বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খোঁজ নিতে গোয়েন্দা সংস্থাকেও নির্দেশ দেন বলে জানায় গণভবনের একটি সূত্র জানায়।

এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত ও কাঙ্ক্ষিতপদ প্রত্যাশী নেতারা বিক্ষোভকারীদের মধ্যে শৃঙ্খলা পরিপন্থি কাজ যারা করেছে তাদের ছাড় দিতে নারাজ ছাত্রলীগের হাইকমান্ড। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেছেন, ছাত্রলীগের কমিটি হওয়ার পর একটি মহল বিভিন্ন মাধ্যমে যে আক্রমণত্মক ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তা সংগঠনের শৃঙ্খলাপরিপন্থি। ক্ষোভ প্রকাশের জন্য দলীয় ফোরাম রয়েছে। যারা শৃঙ্খলাপরিপন্থি কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদেরকেও খুঁজে বের করে বহিষ্কার করা হবে।

প্রায় দীর্ঘ এক বছর আগে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দুই সদস্য কমিটি গঠন করে দেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর কমিটি গঠনের একের পর এক ব্যর্থ হন তারা। তবে বহু আলোচনা-সমলোচনার পর গত সোমবার ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করেন সভাপতি-সম্পাদক। তারা কমিটি গঠনে দীর্ঘদিন সময় নিলেও তারা বিতর্ক এড়াতে পারেননি। তাই কমিটি ঘোষণার সাতদিন যেতে না যেতেই ফের অপূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

এদিকে নতুন করে কমিটিতে পদ পেতে আবারো দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন পদবঞ্চিতরা। বিশেষ করে ছাত্রলীগের সাবেক কমিটি নেতাদের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দায়িত্ব প্রাপ্ত নেতাদের পিছু ছুটছেন তারা।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম আমার সংবাদকে বলেন, কোনো ধরনের বিতর্কিত নেতাকে ছাত্রলীগের স্থান দেয়া হবে না। ঘোষিত কমিটির অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে পদগুলো সঠিক বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত ও গ্রহযোগ্য নেতাকর্মীদের স্থান দেয়া হবে। এ জন্য ছাত্রলীগের বর্তমান নেতাদের দিকনিদের্শনা দেয়া হয়েছে।

ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত চারনেতার একজন ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদ পাওয়া বিতর্কিত নেতারা বাদ পড়বেন।

কয়েকজনের বিষয়ে কিছু অভিযোগ আসছে। যাদের ব্যাপারে অভিযোগ আসছে, তাদের নামে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণ হলে অভিযুক্তদের কমিটি থেকে বাদ দেয়া হবে। একই সঙ্গে কমিটিতে শূন্যস্থান পূরণ করতে নতুনদের স্থান দেয়া হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box