বাজেট বাড়ে মশা কমে না

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বিগত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ঢাকা মহানগরীতে মশক নিধনের বাজেট ছিল ২১ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা অর্ধশত কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মশা নিধনের বাজেট বছর বছর এভাবে লাফিয়ে বাড়লেও নগরীতে মশা মোটেই কমেনি। বরং মশাবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

বরাবরের মতোই নগর কর্তৃপক্ষের দাবি, কেবল মানুষ সচেতন হলেই মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। মশাবাহিত রোগের জন্য নগরবাসীর অসচেতনতাকেই দায়ী করছেন তারা। তবে নগর বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ভঙ্গুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ ও জলাশয়গুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না থাকাকে মশার বংশ বিস্তারের অন্যতম কারণ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মশা নিধনে বরাদ্দ ছিল ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ১১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হলেও ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে এ খাতে বরাদ্দ হয় ২৫ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে মশক নিধন খাতে ২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করে সংস্থাটি। অপরদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মশক নিধন খাতে বরাদ্দ করে ১১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে ২০ কোটি। ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ২১ কোটি টাকা।

কিন্তু বছর বছর বাজেট বাড়লেও গত তিন বছরে মশাবাহিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা কমেনি। বেড়েছে কয়েকগুন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণকক্ষের হিসাব মতে, ২০১৫ সালে দেশে ৩ হাজার ১৬২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৪৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক বছর ধরে বছরের শুরু থেকেই কমবেশি ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তরা হাসপাতালে আসেন। তবে এবার রোগীর সংখ্যা বেশি। গেল বছরের মে মাসে ৫২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এবার মে মাসে এই সংখ্যা তিন গুণ (১৫৫ জন)। এ বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত ৮৩৯ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। গত বছর জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের এ সংখ্যা ছিল ৪২৮ জন। এ বছর আক্রান্তদের মধ্যে দু’জন এপ্রিলে মারা গেছেন। প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এ পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছেন ৭৩৪ জন এবং বর্তমানে ১০৩ জন ভর্তি আছেন বলে জানা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মশাবাহিত রোগ বাড়ার দুটি কারণ চিহ্নিত করছে। প্রথম ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিত নির্মাণযজ্ঞ। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, চলছে রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার কাজ। রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় ও মাটি কেটে গর্ত করে রাখা হয়েছে। এসব জায়গায় ও চারপাশে সহজে পানি জমে থাকে। এছাড়া সার্বিকভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে মশা বেড়ে গেছে। থেমে থেমে বৃষ্টি ও তাপমাত্রার পরিবর্তন এডিস মশা জন্মানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক জরিপে ডিএনসিসি এলাকর তেজগাঁও, তুরাগ, পলস্নবী, মগবাজারে, উত্তরা, গুলশান, বনানী, কাফরুল, খিলগাঁও, রামপুরা, মিরপুর, পীরেরবাগ, মোহাম্মদপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, বনানী, গুলশান, বারিধারায় সবচেয়ে বেশি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দয়াগঞ্জ, নারিন্দা, স্বামীবাগ, গেন্ডারিয়াসহ আশপাশের এলাকা, দক্ষিণ মুগদাপাড়া, বাসাবো, মানিকনগর বিশ্বরোড, শেরেবাংলা রোড, হাজারীবাগ, মগবাজার ও রমনা, সেগুনবাগিচা, শাহবাগ, হাজারীবাগ, ফরাশগঞ্জ, শ্যামপুর, উত্তর যাত্রাবাড়ীতে ডেঙ্গুর জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এদিকে রাজধানীর মশা নিয়ন্ত্রনে রাখতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তরের ৯ শতাধিক কর্মী প্রতিদিন কাজ করছেন। এতে প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত ৮ জন করে শ্রমিক কাজ করার কথা। এসব শ্রমিক সকালে নালা-নর্দমায় মশার লার্ভ ধ্বংস করার জন্য ওষুধ ছিটাবেন এবং বিকেলে স্প্রের মাধ্যেমে মশা প্রবণ এলাকাসহ প্রায় সব এলাকায় ঘুরে ঘুরে উড়ন্ত মশা নিধন করবেন। কিন্তু শ্রমিকরা সঠিকভাবে কাজ করছেন না বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। সপ্তাহে এক বা দু’দিন নামকাওয়াস্তে ওষুধ ছিটাচ্ছেন তারা। বেশিরভাগ এলাকাতেই তাদের উপস্থিতি দেখতে পান না নগরবাসী। আর বরাদ্দকৃত ওষুধ সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বিক্রি করে দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রতি বছর বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

নাগরিকদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের মশক নিধনের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের দেখা পান না। এসব এলাকায় করপোরেশনের মশা মারার জন্য ওষুধ ছিটানো বা ফগিংও দেখেননি। কোনো বড় প্রোগ্রাম না থাকলে মশক নিধনের কার্যক্রম সচরাচর চোখে পড়ে না। তবে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের কর্মীরা নিয়মিত সকাল-বিকাল মাশার ওষুধ ছিটাচ্ছেন।

মশার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু করেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত প্রতিটি ওয়ার্ডে জনসচেতনতার পাশাপশি চলবে বিশেষ মশক নিধন কর্মসূচি। এ লক্ষ্যে বেশকিছুদিন ধরে নগরীর বিভিন্ন সভা- সেমিনার ও গণসংযোগ করছেন ঢাকার দুই মেয়র সাঈদ খোকন ও আতিকুল ইসলাম। এসব কর্মসূচিতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া থেকে সতর্ক থাকতে নগরবাসীকে নানা পরামর্শও দিচ্ছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, সবাই সচেতন হলে ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া দূর করা যাবে। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা সচ্ছ পানিতে এসব রোগের বাহক এডিস মশা বংশ বিস্তার করে। তাই প্রতিটি নাগরিককে এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশক নিধনে নতুন ওষুধ আনা হয়েছে। যা আগের তুলনায় বেশি কার্যকর এবং এতে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হবে না বলে জানান তিনি।

দক্ষিণ ঢাকার মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, জনগণের সচেতনতাই ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া মোকাবেলার মূল হাতিয়ার। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া হলে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হতে হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box