বাজেট পাস কাল

আলোকিত সকাল ডেস্ক

জাতীয় সংসদে কাল পাস হচ্ছে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কিছু পরিবর্তন আসছে। এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে- আগাম কর, সঞ্চয়পত্রে বর্ধিত উৎসে কর ও মূলধনী যন্ত্রে অগ্রিম কর প্রত্যাহার। পুঁজিবাজারের রিটেইন আর্নিংস ও রিজার্ভের ওপর করও বাদ যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংযোগে টিআইএন নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকছে না। আমদানির ওপর ৫ শতাংশ গণহারে কর প্রত্যাহার হতে পারে। ই-কমার্সের ভ্যাট প্রত্যাহার হতে পারে। এ ছাড়াও তেল, চিনি, গুঁড়ো দুধসহ ভোক্তাদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে বিবেচিত সব দ্রব্যে ভ্যাট কমানো বা প্রত্যাহার হতে পারে। সাধারণ মানুষ বিশেষত মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী ও শেয়ারবাজারের কথা চিন্তা করে এসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বাজেট পাসের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে জাতীয় সংসদে বিস্তারিত বলতে পারেন। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রত্যাহার হচ্ছে আগাম কর : মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইনের আওতায় আগাম কর (আগাম ভ্যাট) আদায়ে ছাড় দেয়া হচ্ছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিসহ বেশ কিছু খাতে আমদানি পর্যায়ে আগাম কর দিতে হবে না। আজ শনিবার বাজেটের অর্থবিল পাসের সময় এটি সংশোধন হতে পারে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অর্থবিল অনুমোদনের জন্য আজ উপস্থাপন করবেন। নতুন ভ্যাট আইনে এবার অগ্রিম ব্যবসায় ভ্যাটের (এটিভি) পরিবর্তে ৫ শতাংশ আগাম কর (এটি) বসানো হয়েছে। অর্থাৎ মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঢালাওভাবে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর দিতে হবে। এতে দেখা গেছে, প্রায় সাড়ে ছয় হাজার পণ্যে এ আগাম কর বসেছে। ভ্যাট রিটার্ন দিয়ে এই আগাম করের টাকা ফেরত নিতে হবে। এই টাকা ফেরত পাওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে ব্যাংকের সুদ গুনতে হবে ওই ব্যবসায়ীকে। ফলে আমদানিপর্যায়ে এসব যন্ত্রপাতি ও পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপর। বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে বাজেট পাসের সময় তা পরিবর্তন করা হচ্ছে।

বাজেট ঘোষণার পর থেকেই বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ীরা আগাম কর নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। তারা জানিয়েছেন, এতে পণ্যে বা সেবার মূল্য বাড়বে।

সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বন্ড প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের পণ্যে আমদানির ক্ষেত্রে ৩০ জুন পর্যন্ত আমদানি পর্যায়ে মূসক বা ভ্যাট আইনের আওতায় আগাম কর কাটা স্থগিত করা হয়েছে। এটির মেয়াদও বাড়িয়ে দেয়া হতে পারে।

সঞ্চয়পত্রে বর্ধিত উৎসে কর প্রত্যাহার হচ্ছে : এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে সমালোচিত বিষয় হলো, মধ্যবিত্তের ভরসাস্থল সঞ্চয়পত্রে বর্ধিত উৎসে কর ধার্য। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্ধিত এই কর আরোপের প্রস্তাব পাস হলে সমাজের মধ্যবিত্ত, অবসরভোগী ও ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের আয়ের ওপর সরাসরি আঘাত আসবে। এটি নিয়ে সংসদেও সমালোচনা হয়েছে। তাই সরকার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর বর্ধিত উৎসে কর প্রত্যাহার করতে যাচ্ছে। তবে এ নিয়ে এখনো দু’টি চিন্তা রয়েছে। এর একটি হলো, বাজারে প্রচলিত সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের ওপর থেকে বর্ধিত কর প্রত্যাহার করা হবে। অন্যটি হলো, শুধু পরিবারভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ও পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ওপর তা প্রত্যাহার করা হবে। এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গড়াতে পারে। অবশ্য সব বিষয়েই চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পুঁজিবাজারের রিটেইন আর্নিংস ও রিজার্ভের ওপর কর প্রত্যাহার হচ্ছে : প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজার বিকাশে একগুচ্ছ প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের চেয়ে রিটেইন আর্নিংস ও রিজার্ভ ৫০ শতাংশের বেশি হলে ১৫ শতাংশ কর ধার্য করার বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন, এই কর বহাল হলে কোম্পানির পুঁজি গঠনের পথ রুদ্ধ হবে। রিজার্ভ মূলত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহার করে কোম্পানি। এই কর থাকলে ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে নিরুৎসাহী হবে। তাই এটি পরিবর্তন করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে স্টক ডিভিডেন্ডের পরিবর্তে ক্যাশ বা নগদ ডিভিডেন্ড প্রদানকে উৎসাহিত করতে কোনো কোম্পানি স্টক ডিভিডেন্ড প্রদান করলে এ লভ্যাংশের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ সংযোগে টিআইএন : বিদ্যুতের নতুন সংযোগ নিতে এবং পুরনো গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল দিতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে ২০১৯-২০ সালের বাজেটে। এর আগে বিদ্যুতের সংযোগ পেতে আবেদনের সঙ্গে আবেদনকারীর দুই কপি ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের ফটোকপি, জমির দলিল বা লিজের ফটোকপি, ১০ তলার বেশি হলে অগ্নিনির্বাপণ সনদ, সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার মধ্যে হলে ভবন নির্মাণের বৈধ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ফটোকপি এবং গ্রাহকের দুই কিলোওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ লোড হলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সনদ জমা দিতে হতো। প্রস্তাবিত বাজেটে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন স্বয়ং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। গত সোমবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে পাঠানো এক চিঠিতে (ডিও লেটার) তিনি এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার কথা বলেছেন।

ই-কমার্সের ভ্যাট প্রত্যাহার হতে পারে : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যবসা) ও ভার্চুয়াল বিজনেস বা অনলাইনে পণ্য বেচাকেনাসহ বেশ কিছু খাতে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এ ভ্যাট হার কমানো হতে পারে।

সিমেন্ট ও রডে অগ্রিম আয়কর তুলে দেয়া হচ্ছে : প্রস্তাবিত বাজেটে সিমেন্টের কাঁচামাল আমদানিপর্যায়ে ভ্যাট ১৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। পাশাপাশি অগ্রিম আয়কর (এটি) ধরা হয়েছে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ। এর ফলে এখন এ খাতে মোট ২০ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। ভ্যাট ও অগ্রিম কর আরোপ করার কারণে সিমেন্টের এক টন কাঁচামাল আমদানিতে খরচ বাড়বে ৮৫০ টাকা। এক টনে ২০ ব্যাগ সিমেন্ট হয়। সে হিসাবে প্রতি ব্যাগ সিমেন্টে দাম ৪২ টাকা বেড়ে যাবে। বাজেটে রড শিল্পের ওপর ৬৫০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। কাঁচামালে আগাম কর আরোপ এবং অগ্রিম আয়করের প্রভাবে টনপ্রতি রডের দাম বাড়বে প্রায় ১১ হাজার টাকা। সিমেন্ট ও রডের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে সরকারের উন্নয়নমূলক মেগা প্রকল্পে ও আবাসন খাতে। মধ্যবিত্তদেরও গৃহনির্মাণ খরচ বাড়বে। এ দু’টির নেতিবাচক প্রভাব এবং ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর বা এটি তুলে দেয়া হচ্ছে।
এ দিকে তেল, চিনি, গুঁড়ো দুধসহ ভোক্তাদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে বিবেচিত সব দ্রব্য ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ক্যাব। ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ভ্যাট আইন কার্যকর হলে ভোক্তারা যাতে একই পণ্যে একাধিকবার ট্যাক্স দিতে বাধ্য না হন, সেদিকেও লক্ষ রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাজেটে ভোক্তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরেন ক্যাবের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান। তিনি বলেন, এবারের বাজেটে ২০১২ সালের ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একক ১৫ শতাংশ করহার ছাড়াও ৫, ৭ দশমিক ৫ এবং ১০ শতাংশ হারে করারোপের বিধান করা হয়েছে। এতে ক্রেতা-ভোক্তা বাড়তি কর পরিশোধ করতে বাধ্য হতে পারে। তা ছাড়া ভ্যাটের পরিধি বাড়ানোর কারণে বেশ কিছু পণ্য, যেমন নিত্যব্যবহার্য ভোজ্যতেলের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এতে করে পণ্যমূল্য বাড়বে।

সূত্র মতে, পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে যেসব বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে, সেগুলোতে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। আগের কয়েকটি অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় এবারো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাজেট পাসের আগে আলোচিত, সমালোচিত বিষয়ে পরিবর্তন আনবেন। অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর কর্মকর্তারা আশা করছেন, এসব পরিবর্তনে মধ্যবিত্ত ও ব্যবসায়ীরা খুশি হবেন। গত ১৩ জুন ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ও অর্থবিল-২০১৯ জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এরপর প্রস্তাবিত বাজেটের বেশ কিছু বিষয় নিয়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, এই বাজেট বিভিন্ন কারণে জনমুখী ও ব্যবসা-সহায়ক। শিল্প খাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, রফতানি শিল্পের বহুমুখী প্রসার, প্রণোদনা ও শিল্পকে অধিক প্রতিযোগিতা সক্ষম করা হয়েছে। এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, আরএন্ডডি, উদ্ভাবন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষা খাতে যে লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে, তা জাতিকে গতিশীল করবে। তবুও বাজেট ও অর্থবিল পর্যালোচনা করে এবং এফবিসিসিআই অধিভুক্ত চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সুপারিশের ভিত্তিতে কিছু সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে। চূড়ান্ত বাজেটে সেগুলো বিবেচনায় থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন শেখ ফজলে ফাহিম।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box