বদনামের স্তুপ মাথায় নিয়ে ফেনী ছাড়লেন জাহাঙ্গীর সরকার

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঘুষ-দূর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা, পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন সহ নানা বদনাম মাথায় নিয়ে আকস্মিক ফেনী ছাড়লেন পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম সরকার। সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকান্ডে কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগে তাকে রবিবার সন্ধ্যায় প্রত্যাহার করে নেয় পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। রবিবার রাতেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মনিরুজ্জামানকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে সোমবার রাতে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে ফেনী ছাড়েন।

বর্বরোচিত রাফি হত্যাকান্ডকে সাবেক ওসি মো: মোয়াজ্জেম হোসেন ও এসপি জাহাঙ্গীর সরকার আত্মহত্যা বলে চালাতে চেয়েছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৪ মার্চ ফেনীর পুলিশ সুপার পদে যোগদান করেন ২২তম বিসিএস এ উত্তীর্ণ এ কর্মকর্তা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া জাহাঙ্গীর সরকারের গ্রামের বাড়ি পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার সোনাহারা গ্রামে। চুয়াডাঙ্গা জেলার সহকারি পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু তার। পরে তিনি ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের ডিসি ছিলেন। প্রথম পুলিশ সুপার হয়ে ফেনীতে যোগদানের পর নানা আচার-অনুষ্ঠানে গান গেয়ে আলোচিত হন বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত এ কন্ঠশিল্পী ও গীতিকার। এছাড়া দান-অনুদান সহ বিভিন্ন সামাজিক কাজেও তার সরব অংশগ্রহন ছিলো।

২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে মামলা করেন তার মা শিরীন আক্তার। ওই ঘটনায় স্থানীয়রা অধ্যক্ষকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন। বারবার হুমকি-ধমকি দেয়া স্বত্ত্বেও মামলা তুলতে রাজি না হওয়ায় ৬ এপ্রিল রাফিকে পরীক্ষার হল থেকে মাদরাসার ছাদে ডেকে নিয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ঘটনাটি সারাদেশে আলোড়ন তুললেও এসপি জাহাঙ্গীর সরকার ছিলেন নিরব ভূমিকায়।

১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাফির মৃত্যু হয়। পরদিন তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো প্রতিবেদনে ওসি মো: মোয়াজ্জেমকে বাঁচাতে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে পুলিশ সদর দপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন হয়। ওই প্রতিবেদনে এসপি জাহাঙ্গীর সরকার, ওসি মো: মোয়াজ্জেম হোসেন সহ ৪ পুলিশ কর্মকর্তা সহ ৫ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়। সুপারিশের অংশ হিসেবে ওসি মো: মোয়াজ্জেমকে প্রত্যাহার করে রংপুরে সংযুক্ত করা হয়। অপর দুই এসআইকে শাস্তিমূলক পার্বত্য চট্টগ্রামে ও খুলনায় বদলী করা হয়। সবশেষ প্রত্যাহার করে সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয় পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর সরকারকে। বর্বরোচিত রাফি হত্যাকান্ডকে নিয়ে তার ভূমিকায় ফেনী সহ সারাদেশে জনমনে সমালোচনার ঝড় উঠে। ফেনীতে তার আরো নানা ঘুষ-দূর্নীতি-অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠে আসছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ- তার ঘনিষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাদের দিয়ে নিরীহ লোকজনকে অফিসে ধরে এনে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করা হয়। এছাড়া প্রতিটি থানা থেকেই ওসিদের পাশাপাশি এসআইদেরকেও মাসোহারা গুনতে হয়। মাদক বানিজ্য, পরিবহন সহ বিভিন্ন খাত থেকে লাখ লাখ টাকা মাসে চাঁদা দিতে হয় তাকে। তার চাঁদাবাজীর হাত থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রেহাই পায়নি বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী জেলা প্রশাসনের মাদক বিরোধী অভিযানেও তার ভূমিকা ছিলো প্রশ্নবিদ্ধ। এনিয়ে তৎকালীন জেলা প্রশাসক বিভাগীয় কমিশনার এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। যেকোন বেআইনী ঘটনায় কথায় কথায় ফেনী সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীর নাম ভাঙাতেন তিনি। এনিয়ে এমপি নিজাম হাজারীও একপর্যায়ে তার প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন।
এ তথ্য দিয়ে জাহাঙ্গীর সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছেন, বিভিন্ন বিষয়ে বিরক্ত হয়ে এমপি নিজাম হাজারী এসপিকে এড়িয়ে চলতেন। বারবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করতেন না।

আলোচিত রাফি হত্যাকান্ডে ব্যাপক সমালোচার পর তিনি রুষ্ট হয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের এড়িয়ে চলতেন। একপর্যায়ে নিজের ফেসবুক আইডিও বন্ধ করে দেন।

‌আস/এসআইসু

Facebook Comments Box