পাতানো খেলায় মেতেছিল পাকিস্তান-আফগানিস্তান!

আলোকিত সকাল ডেস্ক

আসরের শেষ পর্যায়ে দারুণভাবে জমে উঠেছে ক্রিকেট বিশ্বকাপের মহারণ। তবে শুরুতে দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানের মতো সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা হারতে হারতে কোণঠাসা, দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থা আরও নাজুক। উপর তলার দলগুলোকে তাহলে টেক্কা দেয় কে? আর সম্ভাবনাময় আফগানিস্তান কোনো চমক দেখাবে বলে যে প্রত্যাশা ছিল তাতেও জল। একদিকে লাগাতার বৃষ্টিতে ম্যাচের পর ম্যাচ পণ্ড হওয়া, সেই সঙ্গে নিস্তেজ মাঠের লড়াই। এক কথায় বলা চলে একঘেয়ে একটা বিশ্বকাপ চলছিল, যার মাঝে কদাচিৎ প্রাণের সাড়া পাওয়া যেতো।

তবে হঠাৎ করেই সবকিছু যেন পাল্টে গেল। বাংলাদেশের তিন ম্যাচ জয়ের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানের খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোতে জমে উঠলো পয়েন্ট টেবিল। আর তাতে শুধু সেরা চার নয়, বাকি দলগুলোরও কম বেশি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় সেমিতে পা রাখার। এই যখন পরিস্থিতি তখন গুরুত্বপূর্ণ এক ম্যাচ হিসাবে সামনে আসে পাকিস্তান ও বিদায়ী আফগানিস্তানের ম্যাচটি। যেখানে টাইগার ভক্তদের প্রত্যাশা ছিল, আফগানদের জয়। যাতে বাংলাদেশের সাথে নিজেদের পয়েন্ট ব্যবধান কমিয়ে আনতে না পারে পাকিস্তান।
ইনিংসের ৪৭ ও ৪৯ তম ওভারের প্রথম বলটি ফুলটস ডেলিভারি দেন গুলবাদিন নাইব

কিন্তু টাইগার ভক্তদের সেই প্রত্যাশা পূরণের আশা জাগিয়েও শেষ অবধি পাকিস্তানের সামনে মাথা নত করেই মাঠ ছাড়ে আফগানিস্তান। স্বল্প পুঁজির ম্যাচে পাকিস্তানিদের ঘাম ঝরাতে হয়েছে শেষ ওভারে জয় তুলে নিতে। যদিও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী দল হিসেবে পাকিস্তানের বিরদ্ধে আফগানদের পরাজয়টাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এই স্বাভাবিক বিষয়টি সত্য হলেও তার মাঝে বেশকিছু অস্বাভাবিক ঘটনা অস্বস্তির উদ্রেগ ঘটিয়েছে। আর এই অস্বাভাবিক অস্বস্তিগুলো বেশ জোরালোভাবেই একটা প্রশ্ন তুলতে লাগলো- পাকিস্তান-আফগানিস্তানের এই ম্যাচটি পাতানো ম্যাচ নয় তো?

অনেকে হয়তো পাক-বিদ্বেষী মন্তব্য বা গুজব ছড়ানোর অপচেষ্টা বলে ঝেড়ে ফেলতে পারেন এই দাবি। সেক্ষেত্রে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটিকে যুক্তিখণ্ডনের মাধ্যমে ভুল প্রমাণ করতে হবে যে কাউকে। তার আগে চলুন বিশ্বকাপ বাউন্ডারিতে দাঁড়ানো দৈনিক জাগরণের চোখে দেখা নেয়া যাক এমন কিছু অনুসন্ধানী তথ্য, যা যৌক্তিকভাবেই পাকিস্তান-আফগানিস্তান ম্যাচটিকে পাতানো ম্যাচ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে। তবে প্রত্যাশা থাকবে, এই দাবি যেন অনিবার্য মিথ্যা বলেই প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ একটি ক্রিকেটপ্রেমী জাতি হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা, ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসর এই বিশ্বকাপের মঞ্চ যেন এমন কিছুতেই কলুষিত না হয়।

অভিযোগটি কি

গত শনিবার (২৯ জুন) লিডসে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের খেলাটি পাতানো ম্যাচ হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে ধারণা করা হচ্ছে ম্যাচ পাতানোর মদদদাতা হিসেবে নিজেদের আড়ালে রেখেছে পাকিস্তান আর তাতে তুরুপের তাস হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল আফগানিস্তান দলের অধিনায়ক গুলবাদিন নাইবকে।
গুলবাদিন নাইবের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী হয়ে উঠা ইমাদ ওয়াসিম অন্য বোলারদের বিরুদ্ধে ছিলেন কোনঠাসা

ম্যাচ পাতানোর জন্য পাকিস্তানকে দায়ী ভাবা কী যৌক্তিক

ক্রিকেট ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো একটি অনৈতিক অপকর্মে অসংখ্যবার নিজেদের সম্পৃক্ত করেছে পাকিস্তান ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় থেকে শুরু করে বোর্ড কর্মকর্তাদের অনেকেই। এবারের বিশ্বকাপে খেলতে আসা দলটিতেও এমন খেলোয়াড় রয়েছেন, যার গায়ে এখনও এই ম্যাচ পাতানোর কালিমা সতেজ। ক্রিকেট দুনিয়ার জুয়াড়িদের সঙ্গে পাক খেলোয়াড়দের হৃদ্যতার সুদীর্ঘ ইতিহাস কোনো কল্পকাহিনী নয়। দেশটির হয়ে একাধিক কিংবদন্তি তারকা বিশ্ব ক্রিকেট মঞ্চে যে সম্মান অর্জন করেছেন, তাও অনেকাংশে ম্লান হয়েছে তাদের কতিপয় খেলোয়াড়ের অপেশাদারিত্ব আর অনৈতিকভাবে ম্যাচ পাতানোর কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ায়।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল তাদের জন্য বাঁচা মরার লড়াই। তাদের চোখে চিরশত্রু হিসেবে বিবেচিত, বাংলাদেশকে পেছনে ফেলার জন্য যেকোনো কাজ করতে পারে তারা। সেক্ষেত্রে অন্ধ আক্রোশে ন্যায্য-অন্যায্য বিবেচনা করার মতো বোধও কাজ করে না তাদের, যা ইতিহাসের পাতায় প্রমাণিত। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে হেরে গেলে তাদের চেয়ে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশকে পেছনে ফেলার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যেতো পাকিস্তানের । আর তা মেনে নেয়া কতটা কষ্টকর, তা জানে শুধু পাকিস্তান। সেক্ষেত্রে ম্যাচ পাতানোর বিষয়টি সত্য প্রমাণিত হলে এর সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা থাকলে মোটেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

আফগানিস্তানের নির্দিষ্ট কোনো খেলোয়াড় জড়িত

যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তানের মানুষের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে ক্রিকেট। দল হিসেবে এখনও খুব শক্তিশালী হয়ে না উঠলেও একাধিক আফগান ক্রিকেটার এরইমধ্যে নিজেদের বিশ্বমানের তারকা হিসেবে প্রমাণ করেছেন। তাদের অনেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গণে নিজেদের উপস্থাপনের জন্য জাতীয় দলের প্ল্যাটফর্মটিকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করেন। দলের একাধিক খেলোয়াড় নামিদামি ফ্র্যাঞ্চাইজি লীগে বড় বড় দলের হয়ে মাঠ কাঁপাচ্ছেন। রশিদ-নবীদের মতো তারকারা এই প্ল্যাটফর্মের মর্যাদা বোঝেন। সেক্ষেত্রে দল হিসেবে ম্যাচ গড়াপেটায় যুক্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা তাদের নেই। কারণ তারা চাইবেন না নিজেদের এই প্ল্যাটফর্মটিকে বিতর্কিত করতে।

মুদ্রার ঠিক উল্টো পিঠে দেখা যায় যে, একই দলটিতে এমন অনেক খেলোয়াড় আছেন যারা অন্যদের মতো পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। সচরাচর মূলদলে ঠাঁই করে নিতেই যাদের দফারফা হয়ে যায়, তাদের জন্য দলের অন্য খেলোয়াড়দের মতো নামিদামি লীগগুলোতে খেলার চিন্তা করা দুঃস্বপ্ন মাত্র। দলের এমন সদস্যদের কেউ যদি সেক্ষেত্রে অন্যদের সাথে টেক্কা দিতে শর্টকাট পথ ধরে আগানোর কথা মাথায় নেন, তার জন্য ম্যাচ ফিক্সিংয়ের মতো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক কিছু না। এক্ষেত্রে শনিবারের ম্যাচটি পাতানো হিসেবে বিবেচনা করলে সুনিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন দলটিতে হঠাৎ ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ অধিনায়ক গুলবাদিন নাইব। তার মতো এমন আকালের হরিদেরই ফিক্সিংয়ের জকি হিসেবে লক্ষ্যে পরিণত করে ক্রিকেট দুনিয়ার মাফিয়ারা।

পাতানো ম্যাচে কারোর সম্পৃক্ততা প্রাথমিকভাবে যেভাবে ধারণা করা যায়

অতীতের বিভিন্ন ম্যাচ কেলেঙ্কারির ঘটনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, চলমান একটি ম্যাচের স্বাভাবিক অবস্থার বিপরীতে কোনো খেলোয়াড়ের অপ্রাসঙ্গিক এবং অসংলগ্ন কোনো কর্মকাণ্ড, যা একেবারে অপ্রত্যাশিত হিসেবে বিবেচিত হয়; তাই ম্যাচ পাতানোর আলামত হিসেবে প্রাথমিকভাবে যাচাই করা হয়। যেমন: বোলিংয়ের ক্ষেত্রে হঠাৎ একটি অস্বাভাবিক রকমের ওয়াইড বা বিশাল নো বলের ডেলিভারি অথবা জেনে শুনে দলের জন্য নেতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ যা অস্বাভাবিক ভুল হিসেবে দৃষ্টকটূ লাগে বা ম্যাচের ফলাফলের উপর প্রভাব সৃষ্টি করে; একজন খেলোয়াড়ের এ ধরনের আচরণগুলোই ম্যাচ পাতানোতে তার সম্পৃক্ততা প্রাথমিকভাবে প্রমাণ করে।

আফগান অধিনায়কের কোনো আচরণ কি ম্যাচ পাতানোর আলামত প্রকাশ করে?

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের এই লড়াকু পরাজয়ের দিন সবাই যখন দলের জয়ের জন্য নিজেদের সেরাটুকু নিংড়ে দেয়ায় ব্যস্ত, ঠিক সে সময় আফগান অধিনায়কের একের পর এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড খুব প্রকটভাবে নজরে পড়ে। এ ম্যাচে একজন খেলোয়াড় এবং একজন অধিনায়ক, উভয় রূপেই নিজের আচরণে ফিক্সিং ডি-ফ্যাক্টো প্রদর্শন করেছেন। এক্ষেত্রে টানটান উত্তেজনায় ভরা এ ম্যাচটির গুরুত্বপূর্ণ শেষ ৫ ওভারের নানা বিষয়ের প্রেক্ষিতে দেখা যায়, আফগান অধিনায়কের এমন কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় যা প্রাপ্য বিজয় থেকে আফগানিস্তানকে বঞ্চিত করেছে এবং কোণঠাসা পাকিস্তানকে হাতে ধরে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিয়েছে।

ম্যাচের পূর্বে টস জিতে আগে ব্যাটিং করতে নেমে পাক বোলারদের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই করতে হয় আফগান ব্যাটসম্যানদের। শেষ পর্যন্ত ২২৮ রানের লক্ষ্য দেয় তারা পাকিস্তানকে। রানের প্লাবনে ভাসা এবারের বিশ্বকাপে মাত্র ২২৭ রানের মামুলি পুঁজি নিয়েই পাক ব্যাটসম্যানদের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত লড়াই জমিয়ে তোলেন রশিদ, নবী, মুজিব, শিনওয়ারিরা। এরই ধারাবাহিকতায় ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে মুখ্য হয়ে ওঠে শেষ ৫ ওভার। এমতাবস্থায় পাকিস্তানকে হারাতে কী করণীয় ছিল, তা পাড়ার গলিতে ক্রিকেট খেলা একটা বাচ্চা ছেলেও বুঝে নিতে পারবে। কিন্তু অস্বাভাবিকভাবেই তা যেন বুঝতে চাইলেন না আফগান অধিনায়ক গুলবাদিন নাইব! খেলার এই শেষ অংশের অস্বাভাবিকতা যাচাই করলে বোধ করি পাতানো ম্যাচের অভিযোগটি আসলে কতটা যৌক্তিক, তা বুঝে নিতে কারোর কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

ওভার প্রতি যা যা ঘটলো

খেলার শেষ ৫ ওভারে জয়ের জন্য পাকিস্তানের প্রয়োজন ছিল ৪৬ রান, হাতে ছিলো ৪ উইকেট। সচরাচর দেখা যায়, কোনো ম্যাচ এমন টাইট কন্ডিশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেখলে অধিনায়কেরা দলের মূল বোলিং অস্ত্রগুলো শেষ মুহূর্তে প্রয়োগের জন্য তুলে রাখেন। এজন্য স্বাভাবিকভাবেই বিবেচনায় আনা হয় সেই ম্যাচে প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের বিরুদ্ধে দলের বোলারদের সাফল্যের পরিসংখ্যান। এ বিষয়টি বুঝে নেয়া নিশ্চয় খুব কঠিন কাজ নয়? সে হিসেবে দেখে নেয়া যাক কি করেছিলেন গুলবাদিন নাইব

* বোলিং কোটায় তখনও সে ম্যাচে আফগানদের সেরা অস্ত্র হিসেবে প্রমাণিত রশিদ খান ও সামিউল্লাহ শিনওয়ারির বাকি ছিল ২টি করে ওভার এবং ম্যাচের অন্যতম সফল বোলার মুজিবুর রহমানের বাকি ছিল ১ ওভার। আর এ ম্যাচের সবচেয়ে খরুচে বোলার ছিলেন খোদ আফগান অধিনায়ক নাইব। যিনি বল হাতে ৯.৪ ওভারে বিনা উইকেট লাভে সর্বোচ্চ ৭.৫৫ ইকোনমি রেটে রান দিয়েছেন ৭৩টি।

* পাকিস্তানের ইনিংসের শেষ ৫ ওভারে ক্রিজে ছিলেন শাদাব খান ও ইমাদ ওয়াসিম। ওভার প্রতি সাদাব এবং ইমাদের রান সংগ্রহের দিকে তাকালে দেখা যায়, রশিদ খানের বিরুদ্ধে কিছুটা ব্যাট চালালেও হাত খুলে সেভাবে মারতে পারেননি তাদের কেউ। অথচ ওই পরিস্থিতিতে বড় শট খেলা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না তাদের। অন্যদিকে, শিনওয়ারি এবং মুজিবুরের বিরুদ্ধে এতটাই কোনঠাসা ছিলেন দুই ব্যাটসম্যান যে রানের চেয়ে সেখানে ডট বলের পরিমাণই ছিল বেশি। অর্থাৎ যে আফগান বোলারদের বিরুদ্ধে হাঁটু কাঁপছিল পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের, তাদের ৫টি ওভারই ম্যাচের শেষ ৫ ওভারের হিসাব সহজ করে দেয়। এমনিতেই আফগানদের পক্ষেই জয়ের পাল্লা ভারি ছিল।

* ৪৫তম ওভারে ব্যক্তিগত অষ্টম ওভার সম্পন্ন করেন শিনওয়ারি। সেই ওভারে পাকিস্তানের স্কোরকার্ডে যোগ হয় মাত্র ২ রান। ঠিক তখনই সব হিসেবকে কাঁচাকলা দেখিয়ে এক বিব্রতকর সিদ্ধান্ত নেন আফগান অধিনায়ক। বল হাতে ৪৬তম ওভারটি করতে আসেন দিনের সবচেয়ে অমিতব্যায়ী এই বোলার। যেখানে জয়ের জন্য প্রাণপণ লড়ছে সতীর্থরা, সেখানে তিনি ওই এক ওভারে রান দেন ১৮টি! আর তাতেই আফগানদের হাত থেকে ফসকে যায় ম্যাচের লাগাম। তার অফ স্ট্যাম্পের বাইরে ফেলা একের পর এক শর্টপিচ স্লো-মিডিয়াম ডেলিভারি সানন্দে সীমানা ছাড়া করেন ইমাদ ওয়াসিম।

* যখন নাইবের বিরুদ্ধে হাত খুলে মারার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে পাক ব্যাটসম্যানরা, ঠিক তার পরেই ৪৭তম ওভারে আক্রমণে আনা হয় স্পিনার রশিদ খানকে। নিজের ওভারে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের শানিয়ে নিয়ে একজন স্পিনারকে মুখের সামনে তুলে দেয়ার মানে কি, সামান্যতম ক্রিকেট জ্ঞান যাদের আছে তাদের আশা করি বুঝে নিতে কষ্ট হবে না। কিন্তু তারপরেও যথেষ্ট টাইট বোলিং করেন রশিদ, শাদাব খান হন রান আউট। শেষ দুই ওভারে তখনও পাকিস্তানকে চেপে ধরার মতো অস্ত্রের মজুদ ছিল আফগানদের কাছে।

* সবাইকে অবাক করে দিয়ে ৪৮তম ওভারে তিনি নিয়ে আসেন মুজিবুরকে তার শেষ ওভার বল করার জন্য! ম্যাচে ১ মেডেনসহ ২ উইকেট শিকার করা যে বোলার ১০ ওভারে দিয়েছিলেন মাত্র ৩৪ রান, তাকে শেষ ওভারের তুরুপের তাস হিসেবে সঞ্চয় না করে বরং শেষ ওভারে পাকিস্তান যাতে প্রয়োজনীয় রান তুলে নিতে পারে অনেকটা যেন সেই পথ সুগম করেন নাইব। অথচ অযথা বসিয়ে না রেখে ম্যাচের অন্যতম মিতব্যায়ী বোলার শিনওয়ারিকে আক্রমণে আনতে পারতেন নাইব। এতে করে যে বিষয়টি পরিষ্কার বোঝা যায় তা হলো, মুজিবুরের কোটা শেষ করে এবং কোনো কারণ ছাড়াই শিনওয়ারিকে বন্ধ রেখে পাকিস্তানিদের শেষ মুহূর্তে হাত খুলে খেলার সুবর্ণ সুযোগটি করে দেন আফগানদের পরাজয়ের হোতা অধিনায়ক নাইব।

* ম্যাচের শেষ ওভারে আবারও বল হাতে তুলে নেন নাইব। কি কারণে, তা হয়তো শুধু তিনিই জানেন! ম্যাচজুড়ে বাজে বল করে পাকিস্তানের রানের ভাণ্ডার পুষ্ট করা আফগান অধিনায়ক হয়ে উঠলেন ঘরের শত্রু বিভীষণ! একের পর এক লাইন লেন্থ হারা ফুলটস হাফ ভলি ডেলিভারিতে চাপে থাকা পাকিস্তানিদের হেসে খেলে জয় তুলে নেয়ার কাজে তার করণীয়টুকু বিশ্বস্ততার সঙ্গে সম্পন্ন করে আফগানদের জেতা ম্যাচ পাকিস্তানের পায়ে লুটিয়ে দেন তিনি। ওভারের তৃতীয় বলে ইমাদ ওয়াসিম কভার অঞ্চলে বল ঠেলে দিলে সেখান থেকে ফিল্ডার তা ফেরত পাঠানোর আগে ১ রান দেন। কিন্তু গুলবাদিন নাইব বল ধরতে না পেরে যেভাবে পড়ে গিয়ে মিস ফিল্ডিং করেন এবং সেই সুযোগে ইমাদ ওয়াসিম আরও একটি রান তুলে নেন, তাতে বোঝাই গিয়েছে আফগান অধিনায়ক অভিনয়টাও ভালোই জানেন! এরচেয়ে স্পষ্টভাবে এবং উলঙ্গভাবে ম্যাচ পাতানোর নিদর্শন কোনো কালে কেউ প্রতিষ্ঠা করেছেন কি না, তা বলা কঠিন।

বোলার হিসেবে ক্রিজে থেকে ম্যাচ ফিক্সিংয়ে নিয়োজিত জোকিদের যেমন বল ডেলিভারির মাধ্যমে পাতানো ম্যাচের নিশ্চয়তার সংকেত পাঠানো হয়, নাইবের ক্ষেত্রেও এমন একটি বিশেষ কাণ্ড চোখে পড়ার মতো ছিল। শেষ ৫ ওভারের মধ্যে তার করা দুইটি ওভারেই অর্থাৎ ৪৬ ও ৫০তম ওভারটি তিনি শুরু করেন একটি করে ফুলটস হাফভলি ডেলিভারির মাধ্যমে। আর দুইটি ওভারের ক্ষেত্রেই চতুর্থ বলটিতে একটি করে বাউন্ডারি পান ইমাদ ওয়াসিম, যেখানে দুইটি বলই শর্টপিচ অফ স্ট্যাম্পের বাইরে দেয়া হয়।

অস্বাভাবিক কী ছিল এদিন যা অন্য ম্যাচে ছিল না

সচরাচর দেখা যায়, যে ম্যাচটি পাতানো খেলা হিসেবে নির্ধারণ করেন জকিরা সে ম্যাচের দিন অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটানোর প্রবনতা প্রায়ই দেখা গেছে। যাতে করে মাঠের পাপ থেকে সকলের দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখা যায়। এদিন হেডিংলিতেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। পুরো আসরজুড়ে যা হয়নি, এদিন তাই ঘটলো ইংল্যান্ডের এই স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে। সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচেও কিন্তু দু’দলের সমর্থকদের মাঝে কোনো আগ্রাসন বা মারমুখী ভাব ছিল না। আর বাকি ম্যাচগুলোর ক্ষেত্রে তো এমন কিছুর প্রত্যাশাই করা হয়নি আর ঘটেওনি।

তবে পাকিস্তান-আফগানিস্তান ম্যাচের দিন স্টেডিয়ামের বাইরে দু’দলের সমর্থকদের মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেয়া হয়। ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দেয়া হয় পুরো চত্বর। কিছু সময়ের জন্য এমনই একটি হাতাহাতির ঘটনা গ্যালারিতেও হয়। তবে স্টেডিয়ামের বাইরের এই ঘটনাটির সময় সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের উপরেও হামলা চালানো হয়। হয়তো অনেকে প্রশ্ন করবেন, এর সাথে ম্যাচ পাতানোর কি সম্পর্ক? বাস্তবতা হলো, ঘনিষ্ঠ আছে সম্পর্ক।

গতকাল ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্র গণমাধ্যম আর মানুষের আলোচনার মূল ইস্যু হয়ে ওঠে এই মারামারির বিষয়টি। অর্থাৎ ম্যাচ শেষে তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সুযোগ দেয়া হলো না কর্তৃপক্ষ বা ক্রিকেট অনুরাগীদের কাউকেই। এদিকে সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনায় ম্যাচ কাভারেজ ও ম্যাচ পরবর্তী নানা বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণের যে কাজটি গণমাধ্যমকর্মীরা করে থাকেন, তা আর সেভাবে হয়ে ওঠেনি। একদল সাংবাদিক ম্যাচ কভারেজ থেকে বিরত থাকার হুমকি যেমন দিয়েছেন, অনেকে আবার ম্যাচ রেখে সরব হয়েছেন এই হামলা ও ইংল্যান্ডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, মাঠের সম্ভাব্য যে ম্যাচ পাতানোর বিষয়টি ধারণা করা হচ্ছে তা থেকে মানুষের দৃষ্টি চট করে একেবারে অন্যদিকে সরিয়ে নেয়া হলো। আর পেছনে রয়ে গেল অনেক প্রশ্নের অজানা উত্তরের আক্ষেপ।

সামগ্রিক বিষয়ে যে সকল যুক্তি ও তথ্য উপস্থাপন করা হলো, বিশ্বের কোটি ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের দায়ভার রইলো। দল যেই হোক, ক্রিকেটের মহামঞ্চ সমগ্র বিশ্বের সকল মানুষের জন্য, সকল আয়োজন শুধুই বিভেদ ভুলে এক কাতারে আসার জন্য। কোনো কারণে সেই উদযাপনের মহামঞ্চ যদি কলঙ্কিত হয়, তবে তা হবে সকলের তরে লজ্জার।

পাকিস্তানের এই ম্যাচ কেলেঙ্কারির ঐতিহ্য যেন এশিয়ার আর কোনো দেশের মাঝে সংক্রামিত হতে না পারে, সেজন্য নানা কারণে উত্থাপিত এমন আশঙ্কাগুলোকে শুরু থেকেই স্বচ্ছ অনুসন্ধানের আওতায় আনতে হবে। দোষী প্রমাণ হলে নিশ্চিত করতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। এই জুয়াড়ি চক্রের কালো ছায়া দূরীভূত না হলে অদূর ভবিষ্যতে ক্রীড়াঙ্গণ হয়ে উঠবে এক অপসংস্কৃতির আখড়া। একে একে আমাদের সম্ভাবনা আর সম্পদ বিনষ্ট করবে। ছড়িয়ে দেবে সংঘাত।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box