নৃশংসতায় স্তম্ভিত দেশ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনায় প্রকাশ্য সড়কে স্ত্রীর সামনে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় স্তম্ভিত সারা দেশ। এমন নৃশংসতায় সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে প্রতিবাদের ঝড়। সোচ্চার বিবেকবান মানুষ। মূল ঘাতক ও তার সহযোগীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান সবাই। জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আসামিরা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে, সে জন্য সীমান্তে রেড এলার্ট জারির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্টও।

বরগুনা শহরের কলেজ রোডে সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের বড় লবণগোলা গ্রামের দুলাল শরীফের ছেলে রিফাতকে (২৩) গত বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কুপিয়ে জখম করে একদল যুবক। এসময় তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার মিন্নি প্রাণপণ বাধা দিয়েও তাদের আটকাতে পারেননি। এ হামলার জন্য সাব্বির হোসেন নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড নামে স্থানীয় এক যুবক ও তার সহযোগীদের অভিযুক্ত করেন মিন্নি। গুরুতর আহত রিফাতকে প্রথমে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নিহতের বাবা বাদী হয়ে ১২ জনকে আসামি করে মামলা করার পর তাদের মধ্যে চন্দন নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

স্বামীকে হত্যার হৃদয় বিদারক বর্ণনা দিয়ে মিন্নি বলেন, আমার চোখের সামনেই আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে তারা। অনেক চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারিনি আমি। চিৎকার করে অন্যদের সাহায্য চেয়ে, খুনিদের দুই হাতে জাপটে ধরে ও ধাক্কা দিয়ে সরিয়েও স্বামীকে বাঁচাতে পারিনি।

এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ওই ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত গণমাধ্যমের প্রতিবেদন গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের বেঞ্চের নজরে আনেন। আদালত তখন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ বি এম আবদবুল্লাহ আল মাহমুদ বাশারকে বরগুনার ডিসি ও এসপির সঙ্গে যোগাযোগ করে এ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা দুপুর ২টার মধ্যে জানাতে নির্দেশ দেন। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, দেশের পরিস্থিতি কোথায় গেছে! অনেকে দাঁড়িয়ে দেখলেন। কেউ প্রতিবাদ করলেন না। সমাজ কোথায় যাচ্ছে? আমরা সবাই মর্মাহত।

দুপুরে আবার আদালত বসলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বলেন, আমি এরই মধ্যে বরগুনার ডিসি, এসপি ও সংশ্লিষ্ট থানার ওসির সঙ্গে যোগাযেগ করেছি। তারা বলেছেন, এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। রিফাতের বাবা আবদুল আলিম দুলাল শরীফ মোট ১২ জনকে আসামি করে বৃহস্পতিবার সকালে বরগুনা সদর থানায় ওই মামলা দায়ের করেন। এজাহারের চার নম্বর আসামি চন্দনকে গত বুধবার রাতেই গ্রেপ্তার করার কথা জানায় পুলিশ।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ তথ্য জানানোর পর বিচারক বলেন, যেহেতু গতকাল ঘটনাটি প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটেছে, তাই এর অ্যাকশন দ্রুত হওয়া উচিত ছিল। পুলিশের ভূমিকা জোড়ালো মনে হচ্ছে না। বিচারক এরপর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেন, বরগুনা যেহেতু সুন্দরবন ও সীমান্তের কাছে, সেহেতু আইজিপিকে জানাতে হবে যাতে আসামিরা কোনোভাবে সীমান্ত পার না হতে পারে।

আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল এ বিষয়ে আদেশ চাইলে বিচারক বলে, আমরা আদেশ দিচ্ছি না। কিন্তু কোনো অনিয়ম বা অবহেলা আছে কিনা আমরা নজরে রাখব এবং এ বিষয়টি আগামী বৃহস্পতিবার আবার আসবে, আমরা অগ্রগতি জানাব।

অন্যদিকে রিফাতের ঘাতকদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, এই ঘটনায় ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদেরও গ্রেপ্তার করার প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে আছে। যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের যে কোনো মূল্যে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন।

এ বিষয়ে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে এটা একটা নৃশংস ঘটনা, একটা মর্মান্তিক ঘটনা। আমি যতটা পুলিশ সূত্রে জানতে পেরেছি এবং গণমাধ্যমেও খবর এসেছে- বিষয়টি অনেকটা ব্যক্তিগত সম্পর্কের, প্রেমঘটিত একটা বিষয়। সেখান থেকে ব্যক্তিগত বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটেছে খুব নগ্নভাবে।

স্ত্রীর সামনে যুবককে কুপিয়ে হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। সব আসামিকে অচিরেই গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রæতি দিয়ে তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডটি কেন ঘটেছে সেটা তদন্ত করেই আপনাদের বিস্তারিত জানাতে পারব। আমার কাছে এই মুহূর্তের খবর হলো, দুজনকে আমাদের পুলিশ ধরে ফেলছে এবং বাকি যে কজন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাইকে আমরা ধরব। সবাইকে আইনের সামনে আমরা হাজির করে দেব।

রিফাত শরীফের শরীরে আটটি কোপের চিহ্ন পেয়েছেন চিকিৎসকরা। একই সঙ্গে ঘাড়ের রগ ও শরীরে বড় বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জামিল হোসেন বলেন, রিফাত শরীফের শরীরে মারাত্মক আঘাত করা হয়েছে। তার গলা, মাথা ও বুকের ওপর তিনটি বড় ক্ষত রয়েছে। তার গলার রগ কেটে গেছে। গলার রগ কেটে প্রচুর রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ভারী অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত করা হয়েছে। তার ডান হাত এবং বাম হাতে দুটি বড় ক্ষত রয়েছে। রিফাতের শরীরে সাত-আটটি বড় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। যেসব আঘাতে বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এসব ক্ষত থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে রিফাত মারা যান।

রিফাতকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যাকারী নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজির ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার সকালে বরগুনা সরকারি কলেজ ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করে তারা এ দাবি জানান। পরে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলে বরগুনা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজির হন।

স্ত্রীর সামনে কুপিয়ে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার হবে, হতেই হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। ঘটনার পর ফেইসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে এ মন্তব্য করেন তিনি।

রামদা হাতে রিফাতের ওপর হামলার একটি ভিডিও বুধবার ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। সেখানে দেখা যায়, কয়েকজন যুবক চড়াও হয়েছে রিফাতের ওপর, তার মধ্যে দুজন রামদা হাতে রিফাতকে একের পর এক আঘাত করে চলেছে। রিফাতকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছিলেন তার স্ত্রী। হামলাকারী যুবকরা রিফাতকে রক্তাক্ত করে সবার সামনে দিয়েই চলে যায়। এ হামলার জন্য বরগুনা পৌরসভার ক্রোক এলাকার নয়ন বন্ড নামে এক যুবককে দায়ী করেন রিফাতের স্ত্রী। এ ছাড়া রিফাত ফরাজি, রাব্বি ও আকন নামের কয়েকজনের কথাও তিনি বলেছেন।

বরগুনার ওসি আবির মোহাম্মদ হোসেন বলেন, রিফাতের স্ত্রী স্থানীয় একটি কলেজের ছাত্রী। দুই মাস আগে তাদের বিয়ে হয়। নয়ন ওই ছাত্রীকে নিজের স্ত্রী বলে দাবি করে আসছিল। অন্যদিকে রিফাতের পরিবার বলেছে, মেয়েটিকে নয়ন প্রায়ই উত্ত্যক্ত করত। এই বিরোধকে কেন্দ্র করেই রিফাতের ওপর হামলা চালানো হয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box