নতুন বলে আলো খুঁজছে বাংলাদেশ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ভারতীয় দল চলে এসেছে বার্মিংহামে। কাগজ-কলমে আরো আগে থেকে একই শহরে এসেছে বাংলাদেশ দলও। তবে পাঁচ দিনের ছুটি থাকায় পুরো দল একই হোটেলে ওঠেনি গতকাল পর্যন্ত। সব ঠিকঠাক থাকলে আজ বার্মিংহামের হায়াত রিজেন্সিতে ‘হাউসফুল’ নোটিশ উঠবে, বাংলাদেশ দলের সবাই এসে পড়বেন যে!

ভারতের বিপক্ষে মহারণের প্রস্তুতি শুরু হবে এর পরদিন, ৩০ জুন। তবে রণপ্রস্তুতি থেমে নেই। কোন বোলার কখন কাকে বল করবেন, তার জন্য মানানসই ফিল্ড সেটিংয়ের ছক এঁকে ফেলেছেন দলের কম্পিউটার অ্যানালিস্ট শ্রীনিবাস চন্দ্রশেখর। তেমনি ব্যাটসম্যানদের জন্যও ভারতীয় বোলিং বৈচিত্র্য মলিন করার রোডম্যাপও তৈরি। সব ম্যাচের আগেই এসব করা হয়, সেটার প্রতিফলনের ওপর নির্ভর করে দলের হার-জিত। এটা সব দলের জন্যই প্রযোজ্য।

বাংলাদেশ দলের সাফল্যের ফর্মুলা অবশ্য সোজাসাপ্টা—খেলাটাকে প্রথম ১০ ওভারেই ধরে ফেলো। ব্যাটিং কিংবা বোলিং—যেটাই আগে করতে হোক না কেন। প্রথমে ব্যাটিং করলে ১০ ওভারে একটির বেশি উইকেট না হারানোর নির্দেশ দেওয়া আছে টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে। সে নির্দেশ পালন করতে গিয়ে একটু ধীরে-সুস্থে খেললেও ৪০ এর বেশি রান উঠে যাচ্ছে। এরপর ইনফর্ম ব্যাটসম্যানরা আছেন ইনিংসটাকে প্রত্যাশিত গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

বোলিং প্ল্যানও নির্ভরশীল প্রথম ১০ ওভারের ওপর। শুরুতে প্রতিপক্ষের দুই-তিনটি উইকেট নিতে পারলে মাঝখানের ওভারগুলো বোলাররা স্বস্তিতে বোলিং করতে পারেন। বাংলাদেশ দলে এমন কোনো উইকেট শিকারি নেই, যিনি যেকোনো পরিস্থিতিতে এসেই উইকেট তুলে দলকে ম্যাচে ফেরাবেন। বাংলাদেশের বোলাররা দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাটসম্যানদের মতো পার্টনারশিপের কথা বেশি বেশি বলে আসছেন। সেই জুটির রহস্য হলো, দুই প্রান্ত থেকে রান আটকানোর বোলিং করা গেলে চাপে পড়ে ব্যাটসম্যান বড় শটের ঝুঁকি নেবেনই। তাতে সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়বে এবং বাংলাদেশি বোলাররা সেটি পেয়ে অভ্যস্তও। কিন্তু বিশ্বকাপে এই শুরুর ১০ ওভারের বোলিং পরিকল্পনাই কার্যকর হচ্ছে না। এ নিয়ে আফগানিস্তান ম্যাচের পর খানিক উদ্বেগও প্রকাশ করেন সাকিব আল হাসান, ‘নতুন বলের বোলিংটা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতে দুই-তিনটি উইকেট নিতে পারলে পরে আমরা যারা বোলিংয়ে আসি, তাদের জন্য সুবিধা হয়। শুরুতে উইকেট না পেলে আমরা যখন বোলিংয়ে আসি, তখন দেখা যায় ব্যাটসম্যান সেট হয়ে গেছে।’

সেট ব্যাটসম্যানের সামনে বাংলাদেশের পরের বোলারদের কী হাল হয়, সেটা ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে পরিষ্কার দেখেছেন সবাই।

প্রথম ১০ ওভারে উইকেট না হারানো অস্ট্রেলিয়া পরের ৩০ ওভারে ১৯৭ রান তুলেছিল স্বচ্ছন্দে। এরপর তো অজিরা রানের ঝড় বইয়ে দিয়েছিল নটিংহামে। এর আগে কার্ডিফে প্রথম পাওয়ার প্লেতে বিনা উইকেটে ৬৭ রান করা স্বাগতিকরা ১১ থেকে ৪০ ওভারের দ্বিতীয় পাওয়ার প্লেতে তুলেছিল ২০৮ রান! দুই ম্যাচেই শেষ ১০ ওভারে তাই নির্দয় পাওয়ার হিটিংয়ের শিকার হয়েছিল বাংলাদেশ।

সমস্যাটা তাই ভাবাচ্ছে পুরো দলকেই। ইংলিশ কন্ডিশনে স্পিন-নির্ভর বোলিং সাজানোর সুযোগ নেই। নিয়ম মেনে পেস-নির্ভর বোলিং আক্রমণই সাজানো হচ্ছে। তবে সেই পেসে গতির অভাব সব সময়ই ছিল। তবে গতিই তো আর পেস বোলিংয়ের মূলমন্ত্র নয়। সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ পেসার কার্টলি অ্যামব্রোস টন্টনের প্রেসবক্সের করিডরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাকে ঠিক জায়গায় বোলিং করতে হবে।’ সেই ‘ঠিক জায়গা’র খোঁজে প্রতিদিনই পেস বোলারদের স্পট বোলিং করতে দেখা যাচ্ছে নিয়মিত নেট সেশনের বাইরে। কিন্তু সেই প্রস্তুতির প্রতিফলন নেই মাঠে।

মাশরাফি বিন মর্তুজার ক্রিকেট জীবনের বাজিই ঠিক জায়গায় বল ফেলা। তিনি প্র্যাকটিস সেশনে স্পট বোলিং না করলেও কোচিং স্টাফরা নিশ্চিত ম্যাচে ঠিকই লেংথটা খুঁজে পাবেন মাশরাফি। উইকেটে বল গ্রিপ করলে তাঁর কাটারে উইকেটও মিলবে। কিন্তু বিশ্বকাপে এ অঙ্কটা মিলছে না। মিলছে না কারণ, পেস বোলারদের জুটিটা ঠিকভাবে কাজ করছে না। নতুন বলে মাশরাফির সঙ্গী মুস্তাফিজুর রহমানের সঠিক লাইন-লেংথ খুঁজে পেতে সময় লাগছে। মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিনেরও একই অবস্থা। পরে তাঁরা ঠিকই উইকেট নিচ্ছেন, কিন্তু শুরুতে ভুল লাইনে বল ফেলে রান দিচ্ছেন প্রায় প্রতি ম্যাচেই। আর তাতে ‘সেট’ ব্যাটসম্যানের সামনে পড়ে যাচ্ছেন সাকিব ও মেহেদী হাসান মিরাজ।

ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তাই প্রথম ১০ ওভারের বোলিংই বাংলাদেশের জন্য সতর্কঘণ্টা হয়েই বাজছে। শুরুতে দুই-তিনটি উইকেট না নিতে পারলে রোহিত শর্মা আর বিরাট কোহলিরা যে ইনিংসটাকে কোথায় নিয়ে যাবেন! এখন আবার দিন বদলেছে। বিশ্বকাপ শুরুর আগে বাংলাদেশের ‘ভারত-দর্শন’ ছিল, দ্রুত ৩ উইকেট তুলে নিতে পারলেই কেল্লাফতে! ভারতের ভঙ্গুর মিডল অর্ডার আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু মহেন্দ্র সিং ধোনি মিডল অর্ডারে খেলাটাকে ধরার পর হার্দিক পাণ্ডে যেভাবে ব্যাট চালাচ্ছেন, তাতে ভারতের ব্যাটিংকে শুরুর তিন উইকেটে আর শেষ মনে হচ্ছে না।

বরং শক্তিশালী বোলিং ইউনিট থাকায় ধীরে-সুস্থে খেলেও জয়ের পুঁজি পেয়ে যাচ্ছে ভারত। ২২৪ কিংবা ২৬৮ রান করেও তাই ম্যাচ জিতেছে কোহলির দল। আগে ব্যাটিংয়ে পাঠিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকেও তাই বেঁধে ফেলতে পেরেছে মাত্র ২২৭ রানে। তাই বলে ভারতকে আপাদমস্তক বোলিং-ওরিয়েন্টেড দল মনে করার কোনো কারণ নেই। ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের সঙ্গে মানানসই তিনশোর্ধ্ব দুটি ইনিংসও রয়েছে তাদের।

তবে ভারতকে ‘অ্যাম্বুশ’ করার একটা ছক নিয়েই বেশি ভাবছে বাংলাদেশ—ওদের ব্যাটিংকে শুরুতেই আক্রমণে কোণঠাসা করে ফেলা। সে দায়িত্ব পড়ছে নতুন বলের বোলারদের ওপরই।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box