নজর কাড়বে নারী প্রধান চলচ্চিত্র

আলোকিত সকাল ডেস্ক

পর্বতারোহী জন লং এর গল্প ‘ক্লিফহ্যাঙ্গার’ নিয়ে যখন সিনেমা নির্মাণের ভাবনা হলো, তখন কোনো প্রযোজক বা পরিচালকই এর কেন্দ্রীয় চরিত্রে কোনো নারীকে ভাবতে পারেননি। তাই ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ক্লিফহ্যাঙ্গার’ সিনেমায় আমরা মহাতারকা সিলভেস্টার স্ট্যালোনকে দেখি দূর্গম পর্বতে দুর্ধর্ষ চোরদের বিরুদ্ধে একই লড়াই করতে। কিন্তু এই চরিত্রে কোনো নারীকে ভাবা হলো না কেন? চলচ্চিত্রে মাসল ফুলিয়ে বীরত্ব দেখানোই কি সব?

অবশ্যই বদলে যাচ্ছে হলিউড, বদলে যাচ্ছে বিশ্ব চলচ্চিত্র। তাই ওই ছবির ২৬ বছর কানে আবারো দেখা যাবে ‘ক্লিফহ্যাঙ্গার’। তবে অবশ্যই ভিন্ন এক আঙ্গিকে। এবার রক্ষাকর্তা নয়, সব সমস্যার সমাধানে দেখা যাবে এক রক্ষাকর্তীকে। এ বছরের কান চলচ্চিত্র উৎসবের অন্যতম আলোচিত এবং ‘গরম’ ছবি হতে যাচ্ছে ‘ক্লিফহ্যাঙ্গার’। বছরের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির প্রযোজকরা বিশ্বব্যাপী পরিবেশনার জন্য পরিবেশক খুঁজতে এসেছেন। বলাবাহুল্য তা তারা পেয়েও যাবেন। না, এখনই দর্শকরা ছবিটি দেখতে পারবেন না। কারণ এখনো ছবির কাজ মাত্র শুরু হয়েছে। তবে কান উৎসবে ছবিটির একটি টিজার দেখানো হবে।
অানা লিলি আমিরপুর

ছবির প্রধান চরিত্রে হলিউডের একজন শীর্ষস্থানীয় অভিনেত্রীকে দেখা যাবে, এমন কথা দেয়ার পাশাপাশি ছবির প্রযোজকরা পরিচালনার ভারও তুলে দিয়েছেন এক নারীর হাতেই। হাই অকটেন এই ছবিটি পরিচালনা করবেন এরইমধ্যে ইরানি নির্মার্তা অানা লিলি আমিরপুর। ‘আ গার্ল ওয়াকস হোম অ্যালোন’ ছবিটি দিয়ে যিনি এরই মধ্যে বিশ্ব চলচ্চিত্রে নিজের স্থান করে নিয়েছেন।

নারী প্রধান চরিত্র বা ছবিরে পেছনের প্রধান সৃজনশীল প্রতিভা থাকা ‘ক্লিফহ্যাঙ্গার’-ই কিন্তু এই বছরের কানের একমাত্র বড় প্রযেক্ট নয়। এ বছর কানে আরো দেখা যাবে রোমান্টিক ড্রামা ‘লেট মি কাউন্ট দ্য ওয়েজ’ যার প্রধান চরিত্র এলিজাবেথ ব্যারেট চরিত্রে দেখা যাবে এমিলিয়া ক্লার্ককে। কানে এ বছর আরো এসেছেন শিশু সাহিত্যিক, গ্রাফিক নভেলিস্ট, কার্টুনিস্ট ও চলচ্চিত্র নির্মাতা মারজানি সাত্রাপি। বহুগুণে গুণান্বিতা ইরানি বংশোদ্ভুত এই ফরাসী নারী পরিচালক নিয়ে এসেছেন ‘রেডিওঅ্যাকটিভ’। বিখ্যাত নারী বৈজ্ঞানিক মেরি কুরির ওপর নিমির্ত এ ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ব্রিটিশ অভিনেত্রী রোজামন্ড পাইক। আরো আছে কার্ল মার্কসের ছোট মেয়ে ইলেনরের জীবনী অবলম্বনে নির্মিত ‘মিস মার্কস’। ছবিটির নির্মাতা আরেকজন বহু প্রতিভার অধিকারিনী ইতালীয় অভিনেত্রী, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক সুজানা নিচ্চিয়ারেলি। ছবির নাম ভূমিকায় এবং যথারীতি প্রধান চরিত্রে দেখা যাবে আরেক ব্রিটিশ প্রতিভা রামোলা গারাইকে।
রোজামন্ড পাইক

প্রযোজনা ও পরিবেশনা সংস্থা ‘স্টুডিওক্যানাল’-এর প্রধান আনা মার্শ বলেছেন, ‘এখনকার ছবিগুলোতে নারী চরিত্রগুলো শুধু মাত্র এক ধরনের শোভা বর্ধণ বা একই ধারার বদলে বহুমাত্রিক রুপে দেখতে পাচ্ছি। ফলে দর্শকরাও ছবির নারীদের জটিল এবং জোরালো রূপে পাচ্ছেন। নারীদের কঠিন ও জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পরতে দেখছেন এবং তা সমাধানও করতে দেখছেন।’

ফলে প্রতি বছরের তুলনায় এবারের কানের ছবিটা একেবারেই বিপরীতমুখি। কয়েক বছর আগেও কানে অাসা চলচ্চিত্রগুলোতে নারী চরিত্রগুলো ছিল স্ত্রী বা প্রেমিকার, অথবা পেশি ফোলানো নায়কের সাহায্যপ্রার্থী কোনো অবলার। পাশাপাশি নারী নির্মাতাদেরকেও নির্মাণের জন্য প্রযোজক পেতে কিংবা পরিবেশনার জন্য পরিবেশক পেতে হিমসিম থেকে হয়েছে। এ বছর কানে নিজের প্রথম পরিচালনা ‘ল্যান্ড’ নিয়ে আসা হলিউড তারকা রবিন রাইটও মানছেন পরিবর্তন হচ্ছে, আরো হবে। রবিন বলেছেন, ‘নারীদের জন্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে। হয়তো যতোটা দ্রুত বা বেশি হওয়া উচিৎ তা হচ্ছে না কিন্তু সম্ভাবনা প্রতিদিনই বাড়ছে। যে কাচের দেয়ালটি ছিল তা ভেঙে গেছে।’
রবিন রাইট

বলা বাহুল্য সাম্প্রতিক সময়ের ‘দ্য ফেফারিট’ বা ‘ক্রেজি রিচ এশিয়ানস’ এর ব্যাপক ব্যবসা সফলতাই মূলত প্রযোজক ও পরিবেশকদের নারী প্রধান চলচ্চিত্রগুলোর প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে, তুলছে। মিস্টার স্মিথ এন্টারটেইনমেন্টর্র প্রধান নির্বাহি ডেভিড গ্যারেট বলেন, ‘পুরুষ প্রধান অ্যাকশন বা থ্রিলারধর্মী ছবির দর্শক সীমিত, একটি নির্দিষ্ট বয়সের ছেলে বা পুরুষই এর দর্শক। অপরদিকে একটি নারীপ্রধান চলচ্চিত্রের দর্শক কিন্তু ১৬ বছর কিশোরী থেকে ৮০ বছরের মহিলাটিও দেখেন, বারবার উপভোগ করেন। এমনকি এই ছবির রস আস্বাদন থেকে পুরুষরাও বাদ যান না।

ব্যবসার খাতিরে এটি বেশ ভাল খবর। নারী-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রগুলো যেমন দর্শক প্রিয়তা পাচ্ছে, তেমনি ব্যবসা সফলতাও পাচ্ছে, আবার সমালোচকরাও পছন্দ করছেন। কিন্তু যদি চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর দিকে নজর দেয়া হয়, যেখানে সবার নজর থাকে লাল গালিচার দিকে, সেখানে এখনো পুরুষ-আধিপত্য বজায় অাছে। এ বছর কানের অফিসিয়াল সিলেকশনে আছে ৬৯টি চলচ্চিত্র।

ব্যবসার খাতিরে এটি বেশ ভাল খবর। নারী-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রগুলো যেমন দর্শক প্রিয়তা পাচ্ছে, তেমনি ব্যবসা সফলতাও পাচ্ছে, আবার সমালোচকরাও পছন্দ করছেন। কিন্তু যদি চলচ্চিত্র উৎসবগুলোর দিকে নজর দেয়া হয়, যেখানে সবার নজর থাকে লাল গালিচার দিকে, সেখানে এখনো পুরুষ-আধিপত্য বজায় অাছে। এ বছর কানের অফিসিয়াল সিলেকশনে আছে ৬৯টি চলচ্চিত্র। যার মাত্র ২৮ ভাগ নারী নির্মাতাদের। এ সংখ্যাটা কিন্তু সানড্যান্স বা টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে আরো কম। উৎসবের ইতিহাসে এই বছর প্রথমবারের মতো কান কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিটির সদস্যদের অর্ধেক নারী করার পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু যখন পুরস্কার দেয়ার প্রশ্নটি আসে, তখন কিন্তু নারীর বদলে পুরুশদের বেছে নেয়ার হারটা বেশিই থাকে।

এই সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বছরের উৎসব পরিচালক থিয়েরি ফ্রেমক্স কিছু মানুষের প্রশ্নের শিকার হন যখন তিনি উল্লেখ করেন, “অফিসিয়াল সিলেকশনে তেমন মহিলা পরিচালক নেই কারণ বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে তেমন নারী পরিচালক নেই।” এছাড়াও তিনি কোটা ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করার বিরোধিতাও করে বলেন, “উৎসবে ৫০ শতাংশ চলচ্চিত্র নারীদের তৈরি হতে হবে এমনটা কেউ আমাকে বলেনি। এটা কিন্তু মূলত তাদের (নারীদের) জন্য অসম্মানজনকই।”

ফ্রেমক্সের এই কথার সঙ্গে অনেকেই দ্বিমত প্রকাশ করেছেন যার মধ্যে আছেন অস্কারজয়ী অভিনেত্রী জুলিয়ান মুর, যিনি এর আগেও কান উৎসবে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষে কথা বলে শিরোনাম তৈরি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি কোটা প্রথায় বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি তাদের লিঙ্গ, তাদের সংস্কৃতি, জাতিগত নির্বিশেষে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে। আপনাকে সবার জন্যই দরজা খুলে দিতে হবে। কিন্তু আমরা এমন এক রীতি নীতিতে বিশ্বাসী যেখানে বহু বছর ধরে শুধু একটা পথই খোলা ছিল এবং তা শুধু একটি বিশেষ শ্রেণীর জন্য।
জুলিয়ান মুর

ফ্রেমক্সের এই কোটা সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে হয়তো আরো আনেক বিতর্ক হবে বা হতেই পারে, তবে এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই য যে স্টুডিওগুলি দশকের পর দশক নারী প্রতিভা উপেক্ষা করেছে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে পুরুষরা চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের যেমন বেশি সুযোগ পেয়েছেন, পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন এমনকি নারী সহশিল্পীর তুলনায় বেশি সংলাপও পেয়েছেন। তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। ‘টাইমস আপ’-এর মতো সংগঠন এবং ‘# মিটু’-এর মতো সামাজিক আন্দোলন বিনোদন জগতে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াই উজ্জেবিত ও উদ্দীপিত করার পাশাপাশি নারী প্রতিভাদের জন্য প্লাটফর্ম তৈরিতে যথেষ্ঠ পরিমাণে কাজ না করার জন্য মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আঙুল তুলতেও ছাড় দিচ্ছে না।
ন্যাডিন লাবেকি

কান উৎসবে এমনই এক আলোচনায় অস্কার মনোনয়ন পাওয়া ন্যাডিন লাবেকি বলেছেন, ‘আমি মানুষের মনে পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি, তবে পরিবর্তন যেমন দেখতে পাচ্ছি, ঠিক তেমনি সেখানে বির্তক, আলোচনাও দেখতে পাচ্ছি। আমরা এখন বিষয়টি নিয়ে কথা বলি। প্রতি বছর উৎসব পরিচালক চলচ্চিত্রের বাছাইয়ের সময় বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছেন, বিষয়টি নিয়ে ভাবছেন, আলোচনা করছেন। এটাই আমাদের পাওনা।’

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box