ঢাকার প্রায় ২২ লাখ রিকশাচালকের ৯৪ শতাংশই অসুস্থ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রিকশায় চড়েন না – এমন মানুষ খুব কমই আছে ঢাকা শহরে। কিন্তু আপনি জানেন কি – ঠিক কী পরিমাণ রিকশা ঢাকা শহরে চলে আর এর সাথে সংশ্লিষ্ট আছে কত মানুষের জীবিকা? কিংবা তাদের মাসিক আয়ই বা কত?

এসব বিষয় নিয়ে প্রথমবারের মত বিস্তর পরিসরে গবেষণা করেছে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার রাইটস (বিলস) নামে একটি শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠান।

যেখানে বলা হয়েছে ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ রিকশা চলছে। এই রিকশাগুলো সাধারণত বিভিন্ন সংস্থার অধীনে নিবন্ধন পেয়ে থাকে। একেকটি রিকশা দুই শিফটে ভাড়া হয়। সে হিসেবে ২২ লাখ মানুষ রিকশা চালক হিসেবে কাজ করছে। যাদের ৯৪ শতাংশই শারীরিকভাবে অসুস্থ। আর এদের ভেতরে ৩০ শতাংশ রিকশা চালক জন্ডিস রোগে আক্রান্ত।

সংস্থাটির মতে ঢাকা শহরের ২৭ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই পেশার সাথে জড়িত আছেন। জরিপে দেখা গেছে, শ্রমিকদের গড় আয় মাসে ২৪ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। আগের চেয়ে তাদের আয় বাড়লেও বাড়েনি জীবন যাত্রার মান। অধিকাংশ শ্রমিকই ভুগছেন নানা রকম রোগে। টাকা বাঁচাতে গিয়ে রিকশা চালকদের একটি বড় অংশ দুপুরে খাবার বিভিন্ন টং দোকানে রুটি, কেক ও চা খেয়ে সাড়েন।

ঢাকার ৯৪ শতাংশ রিকশা চালকই অসুস্থতায় ভোগেন। বিশেষ করে জ্বর-কাশি, ঠাণ্ডা, গায়ে ব্যথা, দুর্বলতা লেগেই থাকে। আর সুপেয় পানির অভাবে ৩০ শতাংশ রিকশা চালক জন্ডিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। এছাড়াও রিকশার গঠন-আকৃতি রিকশা চালকদের জন্য আরাম দায়ক না।

বিলসের পরিচালক কোহিনূর মাহমুদ বলেন, এই কাজটি খুবই শ্রমসাধ্য এবং রোদ-বৃষ্টিতে পুড়ে তাদের রিকশা চালাতে হয়। যার একটা বড় ধরনের প্রভাব তাদের স্বাস্থ্যের ওপর পড়ে। ফলে বিশেষ করে জ্বর-কাশি, ঠান্ডা, গায়ে ব্যথা, দুর্বলতা তাদের লেগেই থাকে। তার মধ্যে রিকশা চালকেরা সুপেয় পানি, পুষ্টিকর খাবার ও টয়লেটের তীব্র সংকটে ভোগেন।

রিকশা চালক রিপন মিয়া জানান, তাদের বেশির ভাগ সময় ড্রেনে বা গাছপালার আড়ালে টয়লেটের কাজ সারতে হয়। এ ছাড়া যে কয়টা মোবাইল টয়লেট বা পাবলিক টয়লেট রয়েছে, সেগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ৫ থেকে ১০ টাকা গুনতে হয় বলে তিনি জানান। বেশির ভাগ রিকশাওয়ালা তাদের দিনের খাওয়া সারেন বিভিন্ন টংয়ের দোকানে রুটি, কেক ও চা খেয়ে। যাতে তারা ভাত খাওয়ার পয়সা সাশ্রয় করতে পারেন।

এখন রাস্তাঘাটে যদি তাদের কথা ভেবে সস্তায় পুষ্টিকর খাবার বিক্রির ব্যবস্থা রাখা হতো, তাহলে তাদের হয়তো এতটা ভোগান্তির মুখে পড়তে হতো না বলে মনে করছে সংস্থাটি।

সব মিলিয়ে এই রিকশাচালকরা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন বলে জানান কোহিনূর মাহমুদ।

পেশাগত দুর্ঘটনা: ৫৪ শতাংশ রিকশাচালক কোনো না কোনা দুর্ঘটনার শিকার হন। প্রায় ৪৪ শতাংশ রিকশাচালক বাসের সঙ্গে ধাক্কায় আহত হন। এক রিকশার সঙ্গে আরেক রিকশার সংঘর্ষই বেশি হয়। এ দুর্ঘটনায় খুব বেশি ক্ষতি হয় না। তবে বাসের সঙ্গে দুর্ঘটনায় ক্ষতি হয় অনেক বেশি। দুর্ঘটনায় পড়লে ৩৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই পথচারীদের সহায়তাই পান রিকশাচালকেরা। ৩২ শতাংশ ক্ষেত্রে অন্য রিকশাচালকেরা সহায়তার হাত বাড়ান তাঁদের প্রতি।

চুরি ও ছিনতাইয়ের কারণে ঢাকা শহরের রিকশাচালকদের এক-চতুর্থাংশ তাঁদের রিকশা হারান। এ ক্ষেত্রে দায় তাঁদের ওপরই বর্তায়।

অসুস্থতা: রিকশা চালনার জন্য এক বা একাধিক রোগে ভোগেন রিকশাচালকেরা। জ্বর রিকশাচালকের একেবারে সাধারণ অসুখ। এর পাশাপাশি সর্দি, ব্যথা, দুর্বলতা, জন্ডিস ও ডায়রিয়ার শিকার হন। অসুখে পড়লে ৯৬ শতাংশ রিকশাচালক যান হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে।

রিকশাচালকের সঙ্গে ব্যবহার: প্রায় সব রিকশাচালক বলেন, তাঁরা আরোহীদের কাছে থেকে দুর্ব্যবহার পান। আরোহীরা রিকশাচালকদের মারপিট, গালিগালাজ এবং ভাড়া নিয়ে ঝামেলা করেন। চালকদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ বলেছে, তারা আরোহীদের দ্বারা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়।

ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে রিকশাচালকের সম্পর্ক ভালো না কোনোমতেই। ৯১ শতাংশ রিকশাচালক জানান, তাঁরা পুলিশের কাছে থেকে নানা রকম নিগ্রহের শিকার হন। এর মধ্যে আছে ধমক, তাচ্ছিল্য করা ও শারীরিক নিগ্রহ। পুলিশ রিকশার টায়ারের হাওয়া ছেড়ে দেয়, সিট নিয়ে চলে যায়, কখনো কখনো কান ধরতে বাধ্য করা হয়।

গবেষণায় পুলিশের এই আচরণের বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের পশ্চিম বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) লিটন কুমার সাহা বলেন, ঢাকায় ট্রাফিক পুলিশ কোনোভাবেই রিকশাচালকের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করে না। কোথাও ব্যাটারিচালিত রিকশা কেউ চালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এ ধরনের রিকশা চালানো নিষিদ্ধ। এ ছাড়া যেসব জায়গায় রিকশা চালানো নিষিদ্ধ, সেখানেও অনেক সময় রিকশা চলে। তখন হয়তো পুলিশ ব্যবস্থা নেয়।

লিটন সাহা দাবি করেন, পুলিশ অন্যায্য আচরণ করলে তা ক্যামেরায় ধরা পড়বেই। তাই এ ধরনের নিগ্রহের ঘটনা ঘটানো সম্ভব না পুলিশের পক্ষে।

যে মালিকদের কাছে থেকে রিকশা নেন, সেই মালিকদের মাধ্যমে নিগ্রহের শিকার কম হন চালকেরা। ৬০ শতাংশ চালক বলেন, মালিকেরা তাঁদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন না। তবে ৪০ শতাংশ চালক বলেন, তাঁরা ধমক, তাচ্ছিল্য ও শারীরিক নিগ্রহের শিকার হন। ব্যতিক্রম ছাড়া বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মালিকদের সঙ্গে রিকশাচালকদের সম্পর্ক ভালো।

আলোকিত সকাল/এসআইসু

Facebook Comments Box