কোপার সেমিতে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মহারণ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ভেনেজুয়েলার মারমুখী ট্যাকেলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আগ্রাসন আর দুর্দান্ত গতির আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দিয়ে কোপা আমেরিকার দ্বিতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে জয় তুলে নিয়েছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। দলের দুই তরুণ তারকা লৌতেরো মার্তিনেজ ও গিওভানী লো চেলসোর লক্ষ্যভেদে আসে আলবিসেলেস্তেদের জয়। আর সেই সাথে স্বাগতিক ব্রাজিলের বিরুদ্ধে এবারের কোপা সেমিফাইনাল নিশ্চিত করলো আকাশি নীল-সাদা জার্সিধারীরা।

শনিবার (২৯ জুন) বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় শুরু হওয়া নক আউট পর্বের এই ম্যাচে ঐতিহ্যবাহী মারাকানা স্টেডিয়ামে লড়তে নামে মেসির আর্জেন্টিনা। গ্রুপপর্বে কাতারকে হারানো ম্যাচের নায়ক, তরুণ আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার মার্তিনেজ আবারো জ্বলে উঠলেন। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে খেলার ১০ মিনিটের মাথায় তার করা একমাত্র গোলে প্রথমার্ধে এগিয়ে যায় মেসির দল। ৭৪ মিনিটের মাথায় দলের পক্ষে অপর গোলটি করেন বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামা লো চেলসো। আর তাতে করে সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে খেলা শেষ প্রীতিম্যাচে, নিজেদের দুই গোলের হারের প্রতিশোধ নিতে তাদের কোপা থেকে বিদায়ই করে দিলো মেসিরা।

এবারের কোপা আসরের গ্রুপপর্বে ধুকতে থাকা আর্জেন্টিনা এদিন নিজেদের চেনা রূপে আবির্ভূত হয় ঐতিহ্যবাহী ৪-৩-৩ ফরমেশনে। ম্যাচের শুরু থেকেই দলের প্রধান তারকা, অভিজ্ঞ লিওনেল মেসির গতির ঝড় আর যাদুকরী ড্রিবলিংয়ে দিশেহারা ভেনেজুয়েলার রক্ষণভাগে একের পর এক হানা দিতে থাকেন তরুণ স্ট্রাইকার মার্তিনেজ ও অভিজ্ঞ ম্যানসিটি তারকা ক্যুন আগুয়েরো। মধ্যমাঠে ডি পল আর পাজ্জেলার সাথে মেসির দারুণ বোঝাপড়ার পাশাপাশি দু’প্রান্ত দিয়ে আগুয়েরো-মার্তিনেজের ডিফেন্স চেরা পুশ ইনে বার বার তাল হারাতে থাকে ভেনেজুয়েলার ডিফেন্স। তবে একেবারে মেসিদের ছেড়ে কথা বলেনি সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে এক প্রীতিম্যাচে জয় পাওয়া মাদুরোর দেশ। কিন্তু এদিন মাঠে ফুটবলের চেয়ে তাদের বেশি মনযোগ প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের পায়ের দিকেই ছিলো।
সতীর্থদের আলিঙ্গনে খুদে যাদুকর

অনেকটা গুছিয়ে আসা তাগলিয়াফিকো, ফয়েথ আর ওতামেন্ডিজকে নিয়ে গড়া আর্জেন্টাইনদের রক্ষণভাগও বেশ ভালই সামাল দিয়েছে ভেনেজুয়েলার আক্রমণভাগকে। তবে বারপোস্টের পাহারায় থাকা আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক আরমানি এদিন যেন প্রতিপক্ষের দুঃস্বপ্নে পরিণত হন। ম্যাচে ভেনেজুয়েলার একাধিক সম্ভাবনাময় আক্রমণ এসে আজ মুখথুবড়ে পড়ে এই ‘আরমানি পর্বত’-এর পাদদেশে।

অবশেষে নিজেদের প্রত্যাশিত চেহারায় কিছুটা রঙ ছড়ানো আর্জেন্টিনা দলের একের পর এক আক্রমণে এদিন রীতিমত অস্থির হয়ে পড়ে ভেনেজুয়েলার ডিফেন্স। কিছুটা সামনে থেকে ফলস নাইন পজিশনে খেলা মেসি সমান তালে ডান ও বাম প্রান্তে বলের যোগান দিয়ে যাওয়ায় দুই ফরোয়ার্ড আগুয়েরো ও মার্তিনেজের হানায় ত্রাসের সৃষ্টি হয় ভেনেজুয়েলার গোল মুখে। বিনিময়ে খেলার মাত্র ১০ মিনিটের মাথায় আসে মেসিদের প্রথম সাফল্য।

মাঝমাঠের তরুণ ক্রেজ- আকুনা, পেজ্জেলা ও ডি পলের সাথে চমৎকার পাসিংয়ে এ সময় পরিকল্পিত একটি আক্রমণ সাজান অভিজ্ঞ মাস্টার মাইন্ড মেসি। তা থেকে পাওয়া ডান প্রান্তে থেকে নেয়া কর্ণার কিকের বল এ সময় দারুন দক্ষতায় বক্সের মুখে ফেলেন মেসি। সেখানে থাকা আগুয়েরো ছোট্ট টোকায় বল দেন বক্সের মাঝে তিন ডিফেন্ডারে ঘেরা মার্তিনেজের পায়ে। আর সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে প্রায় অসম্ভব পজিশেন থেকে দুর্দান্ত এক ব্যাকহিল স্পিনে ভেনেজুয়েলার জালে বল জড়িয়ে দেন আলবিসেলেস্তেদের এই তরুণ স্ট্রাইকার। সাথে সাথে পুরো গ্যালারি ‘ভেমোস ভেমোস আর্হেন্তিনা’ স্লোগানে ফেটে পড়ে।
ভেনেজুয়েলার দুঃস্বপ্ন ‘আরমানি পর্বত’

খেলার দ্বিতীয়ার্ধে আরো ধারালো হয় আর্জেন্টাইন আক্রমণ। বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে আসেন, লো চেলসো, দিবালা আর ডি মারিয়া। মাঝ মাঠে এদিন ক্লান্তি ভুলে যাওয়া দুর্বার মেসি হয়ে ওঠেন পুরোদস্তুর প্লে-মেকার। গোলের কোন চেষ্টায় না গিয়ে জাদুকরী ফুটবল, বিদ্যুৎ গতির দৌড় আর একের পর এক ডিফেন্স চেড়া থ্রু পাসে ভেনেজুয়েলা ডিফেন্সে রীতিমত নাভিশ্বাস তুলতে থাকেন বিশ্বসেরা এই ফরোয়ার্ড। খেলার প্রায় শেষ অংশে ভেনেজুয়েলার একটি দুর্দান্ত আক্রমণ প্রতিহত হয় আর্জেন্টাইন ডিফেন্সে। নিজেদের অংশ থেকে দারুণ খেলতে থাকা তরুণ ডিফেন্ডার তাগলিয়াফিকোর পাস এ সময় মাঝমাঠে খুঁজে পায় মেসিকে।

চিতার গতিতে প্রতিপক্ষের তিন ডিফেন্ডারকে পিছে ফেলে আক্রমণে সামনে বাড়েন মেসি। হঠাৎ তার ভোগবাজির মত একটি ফ্লিক ডানপ্রান্তে দক্ষতার সাথে রিসিভ করেন ডি পল, বাড়ান সামনে থাকা আগুয়েরোর উদ্দেশ্যে। চোখের পলকে ঘুরেই বারে গোলার মত এক কিক করেন আগুয়েরো। প্রথম ধাক্কায় বল প্রতিহত করলেও দ্বিতীয় ধাক্কা সামাল দিতে ব্যর্থ হন ভেনেজুয়েলার গোলরক্ষক। তার ফেরানো বল এ সময় বক্সে থাকা লো চেলসোর পায়ে এসে পড়ে। আর দুই ডিফেন্ডারের পায়ের নিচ দিয়ে বাঁ পাশের বার ঘেষা লো চেলসোর মাটি কামড়ানো কিক আর্জেন্টাইনদের উদযাপনের লগ্ন এনে দেয় দ্বিতীয়বারের মত।

শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলের জয় নিশ্চিত করে বিশ্বের লাখো কোটি ফুটবলামোদীদের চির প্রত্যাশিত ‘ইউনিভার্সাল ক্ল্যাসিকো’র উপলক্ষ সৃষ্টি করে আর্জেন্টিনা। মেসিদের এই জয়ে কোপা আমেরিকার প্রথম সেমিফাইনলটি পরিণত হল ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ফুটবল মহারণে। এবারের আসরের সবচেয়ে জমজমাট এই লড়াই দেখার প্রতীক্ষায় এখন সারা বিশ্ব। যেখানে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়বে স্বাগতিক ব্রাজিল ও তাদের চির প্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা।

প্রথম কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে প্যারাগুয়েকে টাইব্রেকারে হারিয়ে এরইমধ্যে সেমিতে পৌছে গেছে স্বাগতিক ব্রাজিল।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box