কেন এই নৃশংসতা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

যেন সিনেমার কোনও মারামারির দৃশ্য। প্রকাশ্য দিবালোকে শত মানুষের সামনে কোপানো হচ্ছে এক তরুণকে। রক্তে ভিজে যাচ্ছে তার পোশাক। কণ্ঠে বাঁচার আকুতি। তবু কারও কোনও বিকার নেই! একমাত্র আক্রান্ত তরুণের স্ত্রী প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছেন রামদা হাতে উন্মত্ত সন্ত্রাসীদের থামাতে। কিন্তু তিনি একা পরাস্ত করতে পারেননি সন্ত্রাসীদের। কুপিয়ে মারাত্মক আহত করে ‘বীরদর্পে’ চলে যায় সন্ত্রাসীরা। সিসিটিভির ক্যামেরায় ধারণ হওয়া এই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে তোলপাড় সারাদেশ। বুধবার (২৬ জুন) বরগুনা সরকারি কলজের সামনে সংঘটিত নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড নাড়া দিয়েছে অসংখ্য মানুষকে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, মানুষ কেন এত নৃশংস হয়ে উঠছে? আর চোখের সামনে নৃশংসতা দেখেও কেন এগিয়ে আসছে না কেউ?

অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু রয়েছে। মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা বা অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা—এসব নানা কারণে অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে দুর্বৃত্তরা। একই সঙ্গে মানুষের প্রতিবাদের যে নৈতিক ভিত্তি তা দিনকেদিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এছাড়া পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের মধ্যে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ বেড়েছে। অহেতুক ঝামেলা এড়াতে চোখের সামনে নৃশংস ঘটনা ঘটলেও তাদের বোধ কাজ করছে না। ফলে কেউ প্রতিবাদও করছে না। আধুনিক সমাজব্যবস্থার কারণেও মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছেন। কেউ কারও বিপদে এগিয়ে আসছেন না।
অপরাধ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগের প্রধান ড. জিয়া রহমান বলেন, ‘মানুষের মধ্যে দুই ধরনের প্রবৃত্তি থাকে, তার একটি পশুপ্রবৃত্তি। আমাদের মতো সমাজে মানুষের মধ্যে এই ধরনের পশুপ্রবৃত্তি বেশি কার্যকর। যদিও ফ্রয়েডিয়ান থিওরি মতে, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সেটা রয়েছে। এখন এই পশুপ্রবৃত্তি সিভিলাইজড করা বা নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি বলেন, ‘ওয়েস্টার্ন সোসাইটিতে কিছুটা হয়েছে। তাদের রাষ্ট্রে নীতি এবং রাষ্ট্রের যে আইন তা পরিবর্তন সাপেক্ষে কার্যকর করা এবং একই সঙ্গে সোসাইটির ভেতরের অনুশাসনগুলো ধরে রাখায় তারা মোটামুটি একটা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। আমাদের মতো ট্র্যাডিশনাল সোসাইটিতে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণের অভাব থাকায় সবসময় মানুষের মধ্যে পশুপ্রবৃত্তির রিফ্লেকশনটা বেশি দেখা যায়।’

অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ‘এখন সোসাইটির ডাইমেনশন চেঞ্জ হচ্ছে। সোসাইটি ট্রান্সফরমেশনের দিকে যাচ্ছে বা আমরা এখন ট্রানজিশনাল ফেসের মধ্যে আছি। ফলে ধরনটা চেঞ্জ হয়েছে। এখন যে অস্থিরতা, কারণ সমাজের মধ্যে এত বেশি নেগেটিভ এলিমেন্ট ঢুকে গেছে; রাষ্ট্রের ভেতর থেকে এসব নিয়ন্ত্রণের নিয়ামক যদি না তৈরি করা হয় তাহলে সমাজে তা থাকবেই। এসব কিছু নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে ফ্রম দ্য স্টেট লেভেল ও সোসাইটি লেভেল থেকে।’

এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, ‘আগে যদিও এক ধরনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পেরেছিলাম, এখন তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যাচ্ছে না। বিকজ অব ট্র্যাডিশনাল ল, বিকজ অব ট্র্যাডিশনাল পুলিশ, বিকজ অব ট্র্যাডিশনাল কোর্ট, বিকজ অব ট্র্যাডিশনাল প্রিজন সিস্টেম এবং বিকজ অব ট্র্যাডিশনাল কারেকশন সিস্টেম। আমরা তো আমাদের ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে যে অস্থিরতা দেখছি, সেই অনুযায়ী কিশোর অপরাধ সেন্টার কি বেড়েছে? কিশোর অপরাধীদের কাউন্সেলিং করতে কতটুকু মেকানিজম আমরা তৈরি করতে পেরেছি? কাজেই আমি বলবো যে, টোটাল রিফ্লেকশন যে একজনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা বা একজন নারীকে রেপ করা বা বাবা-ছেলেকে মেরে ফেলা—এগুলো একই সূত্রে গাঁথা।’

ড. জিয়া রহমান, নূর খান লিটন ও অধ্যাপক রাশেদা ইরশাদ নাসির

অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের নৃশংসতা যে এবারই প্রথম, তা কিন্তু নয়। কিংবা এটা যে নতুন করে বেড়ে গেছে, তা-ও নয়। একটা সময়ে জমি দখল বা চর দখলের জন্য প্রকাশ্যে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের ওপর এমন নৃশংসতা চালাতো। সেসব এখন হয়তো নেই। তবে ধরন পাল্টেছে। সমাজব্যবস্থাও একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক কারণে সমাজে অস্থিরতা বেড়েছে। সেই সঙ্গে অপরাধের ধরনও পাল্টাচ্ছে। সমাজে নানারকম নেগেটিভ এলিমেন্ট ঢুকে পড়েছে। এ কারণে নৃশংস অপরাধের মাত্রাও বাড়ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘আমরা যদি খেয়াল করি, দেখবো, সিলেটে এ ধরনের একটি ঘটনা যখন ঘটলো, যদিও সেই মেয়েটি জীবনে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু এভাবেই কোপের পর কোপ দিয়েছে দুর্বৃত্ত। একটি মানুষও এগিয়ে আসেনি তাকে রক্ষা করতে। ঠিক একই ঘটনা আমরা বরগুনায় দেখতে পেলাম।’

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এবং গণতন্ত্র সংকুচিত হওয়ায় মানুষের যে নৈতিক প্রতিবাদ করার সাহস, সেটি কিন্তু ভোঁতা হয়ে গেছে।’

নূর খান বলেন, ‘সমাজে দুর্বৃত্তরা অনেক অপরাধ সংঘটিত করে, সেটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এটির মাত্রা এবং প্রকাশ্য দিবালোকে যখন প্রতিবাদহীনতা থাকে, অর্থাৎ কোনও প্রতিবাদ হয় না, প্রতিরোধ হয় না, সেটি হচ্ছে ভয়াবহ। দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক চর্চার অনুপস্থিতি, প্রতিবাদ ও যৌক্তিক সমালোচনার অগ্রহণযোগ্যতা সমাজে বা রাষ্ট্রে এ ধরনের অবস্থা তৈরি করেছে। সাধারণের ভেতরে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধের যে ক্ষমতা তা ক্রমান্বয়ে কমছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংস এমন ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক একটা যোগসাজশ থাকে। ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একের পর এক ক্ষমতার অপব্যবহার করে পার পেয়ে যাওয়া কোনও একজন ব্যক্তিকে ভয়ঙ্কর করে তোলে। অতীতেও এরকম ঘটনা দেখা গেছে। সেসবের পুনরাবৃত্তি চলছেই। এসবের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিচার প্রক্রিয়া ও সব ক্ষেত্রেই রাজনীতিকরণ সবচেয়ে বেশি দায়ী।

মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনীতি এখন দুর্বৃত্তদের দখলে। ফলে এই ধরনের মানসিকতাসম্পন্ন মানুষেরাই কিন্তু কোনও না কোনোভাবে রাজনৈতিক আনুকূল্য পেয়ে থাকে, রাজনৈতিক দলের আনুকূল্য পেয়ে থাকে। রাজনীতিতে আদর্শিক চর্চা অনুপস্থিত থাকার কারণে এই ধরনের ঘটনা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ অপরাধীকে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করলে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার কারণে মানুষের মাঝে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ বেড়েছে। আগের মতো ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ নীতিবাক্য মেনে চলার প্রবণতা নেই। এর কারণ হিসেবে অপরাধবিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করছেন, ‘নগরায়ণ বাড়ছে। মানুষের কাছে টাকা আসছে। প্রতিযোগিতা বাড়ছে। মানুষ নিজেকে বেশি ভালোবাসছে। পুরোপুরি না হলেও সমাজের বড় একটি অংশ এসবের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এছাড়া কারও বিপদে এগিয়ে যাওয়ার পর পুলিশি বা আদালতে গিয়ে হ্যারাস হওয়ার উদাহরণও রয়েছে। কিংবা কেউ একটা ভালো কাজ করলে তাকে যথাযথ মূল্যায়ন না করার কারণেও কেউ কারও বিপদে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করে না। অপরাধের রুট জানার জন্য গবেষণা নেই। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যারা কাজ করেন তাদের সঙ্গে একাডেমিক ব্যক্তিবর্গের কোনও যোগাযোগ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক রাশেদা ইরশাদ নাসির বলেন, ‘সমাজে হিংস্রতা বেড়েছে। হিংস্রতা মানুষের তখনই বাড়ে যখন মানুষের মধ্যে ইমোশন বা ভ্যালুজ কমতে থাকে। মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশের সমাজ একসময় ঐতিহ্যবাহী আবেগপ্রবণ ছিল। কিন্তু সেই সমাজ এখন রুটলেস হয়ে গেছে। আমাদের এখন মায়া-মমতা কমে গেছে, আবেগ কমে গেছে। সমাজে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বেড়েছে। অসুস্থ মানসিকতায় যেকোনও মূল্যে যেকোনও কিছু পাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এসব কারণেই হিংস্রতা বা নৃশংস উপায় বেছে নিচ্ছে মানুষ।’

মানুষের মধ্যে সামাজিক কোনও শিক্ষা নেই মন্তব্য করে এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, ‘মডার্ন সোসাইটিতে মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার প্রবণতা বাড়ে। আমাদের এখানে সমাজ পুরোপুরি আধুনিক হওয়ার আগেই আত্মকেন্দ্রিকতার চরমে গিয়ে ঠেকেছে। এজন্য মানুষ মানুষের জন্য কিছু আর করতে চায় না।’

আলোকিত সকাল

Facebook Comments Box