কলেজে যাওয়ার আগে অসুস্থ মাকে যে কথা বলেছিল রিফাত

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বরগুনা সদর উপজেলায় বুধবার (২৬ জুন) প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। নববিবাহিত স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে নিয়ে খুনি নয়ন বন্ডের সঙ্গে রিফাত শরীফের দ্বন্দ্ব চলছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। এক সময়ের বন্ধু নয়ন দাবি করছিল মিন্নি তার স্ত্রী। মিন্নির সঙ্গে নয়নের প্রেমের সম্পর্কের বেশকিছু ছবিও ফেসবুকে পোস্ট করে সে।

বিষয়টি নিজের মাকে জানায় রিফাত। সবকিছু শোনার পর পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত মিন্নির নিয়ে কলেজ এলাকায় যেতে ছেলেকে নিষেধ করেন রিফাত শরীফের মা। প্রয়োজন ছাড়া বরগুনা শহরে যেতেও নিষেধ করেন তাকে।

সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হওয়া সন্তানের বিছানায় হাত রেখে হাউমাউ করে কাঁদছেন অসহায় মা।

চারপাশে প্রতিবেশীরা শোকাহত মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কিন্তু কোনো সান্ত্বনায় শান্ত হতে পারছেন না তিনি। একটু পরপর বলছেন, কে যেন ফোন দিয়ে আমার আব্বুরে কলেজে নিয়ে গেছে, আমি সেটা বলতে পারব না। আমি শুধু সবার কাছে অনুরোধ করছি। কে আমার বাবারে ফোন দিয়ে কলেজে ডেকে নিয়ে গেল, আমি একটু জানতে চাই!

গত বুধবার সকালে রিফাত তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে নিয়ে বরগুনা সরকারি কলেজে যান। কলেজ থেকে ফেরার পথে নয়ন, রিফাত ফরাজীসহ তাদের সহযোগীরা রিফাতের ওপর হামলা চালান। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকেন। এতে বাধা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেন স্ত্রী আয়েশা। কিন্তু কিছুতেই হামলাকারীদের থামাতে পারছিলেন না তিনি। এরপর দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।

গুরুতর আহতাবস্থায় রিফাতকে প্রথমে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ভর্তির এক ঘণ্টা পর বেলা সাড়ে ৩টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

সন্তান হারা মায়ের এই আর্তনাদ কেউ সইতে পারছেন না। যারা তাকে সান্ত্বনা দিতে এসেছেন, তারাও শাড়ির আঁচলে চোখ মুছছেন।

রিফাতের মা ডেইজি আক্তার বলেন, আমি শুনেছিলাম আমার ছেলের বউকে নিয়ে কলেজে ঝামেলা চলছে। আমি চাইনি, ওইদিন রিফাত তার স্ত্রীকে নিয়ে কলেজে যাক। বারবার আমি বাবাকে নিষেধ করেছি, বাবা আমার কথা শোনেনি।

রিফাতের মা কেঁদে কেঁদে বলেন, আমি অসুস্থ ছিলাম। আমি বললাম, আমি অসুস্থ তুমি আজ কলেজে যেও না বাবা। আমার কাছে থাকো। মিন্নিকে অন্য কেউ কলেজে নিয়ে যাবে। তখনো আমি বিছানায় শুয়ে আছি, একটু পর আমার কাছে এসে বসল রিফাত। মা তুমি অসুস্থ,শুয়ে থাকো বলে কাঁথা আমার শরীরের ওপর দিয়ে চলে গেল। সেই যে আমার ছেলে চলে গেল, আর ফিরে এলো না। যখন এলো তখন মৃত হয়ে।

তিনি বলেন, আজকে আমার বুক থেকে আমার সন্তান হারিয়েছে। যে আমার বুকের ধন ছিনিয়ে নিয়েছে আল্লাহ তারে যেন শাস্তি দেয়। যারা যারা এখনো পলাতক আছে, তাদেরকে পুলিশ ধরলেই আপনারা জানতে পারবেন। আমার ছেলেকে কেন এবং কিভাবে হত্যা করা হলো, আমিও সেটা শুনতে চাই। রিফাতের বাবা দুলাল শরীফ বলেন, নয়ন প্রতিনিয়ত আমার পুত্রবধূকে উত্ত্যক্ত করত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট দিত। এর প্রতিবাদ করায় আমার ছেলেকে নয়ন তার দলবল নিয়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে।

শনিবার (২৯ জুন) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা প্রেসক্লাবের সামনে রিফাত হত্যার মূল আসামিদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।

মানববন্ধনের একপর্যায়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় সবার সামনে কাঁদতে কাঁদতে রিফাতের বাবা আবদুল হালিম বলেন, রিফাত আমার একমাত্র সন্তান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আকুল আবেদন, আমার ছেলে হত্যাকাণ্ড অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক।

এ মানববন্ধনে জেলা ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগসহ সর্বস্তরের পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেয়।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box