এ বর্ষায়ও ঝুঁকিতেই থাকছে রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ

আলোকিত সকাল ডেস্ক

এ বর্ষা মৌসুমেও ঝুঁকিমুক্ত হচ্ছে না রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। ২০১৭ সালের ১৩ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পাহাড়ধসের ঘটনায় ৫ সেনা সদস্যসহ ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটে। ঠিক এক বছরের মাথায় ২০১৮ সালের ১২ জুন নানিয়ারচরে পাহাড়ধসে ঘটে ১১ জনের প্রাণহানি। ভয়াবহ এ দুটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরও পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি পাহাড়ি এ জনপদের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত রাঙামাটি-চট্টগ্রামসহ জেলার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোতে চলতি বর্ষায়ও পাহাড়ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। রাঙামাটি সদরসহ সাত উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার অন্তত ১০ লাখ মানুষ এসব সড়ক ব্যবহার করে থাকেন। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশিদ বলেছেন, ‘সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আর ‘অস্থায়ী মেরামতের কাজ চলছে’ বলে জানিয়েছে রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)।

দপ্তরটি জানিয়েছে, রাঙামাটি-চট্টগ্রামসহ জেলার ক্ষতিগ্রস্ত ৫টি সড়কের মধ্যে রাঙামাটি শহরে ৩৩, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়কে ৫৬, রাঙামাটি বান্দরবান সড়কে ২৬, বাঙ্গালহালিয়া-রাজস্থলী সড়কে ৫ ও বগাছড়ি-নানিয়ারচর-লংগদু সড়কে ৩টি স্থানসহ ১২৮টি স্থানে সড়ক ধসে গেছে। এসব স্থানে স্থায়ী মেরামত ও পুনর্নির্মাণ কাজ করতে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে ডিপিপি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৬ এপ্রিল পাঠানো ওই প্রস্তাবনায় ১৭০ কোটি টাকা চাওয়া হয়। পরে তা বাড়িয়ে ফের ২৩০ কোটি টাকা চাওয়া হয়। ওই প্রস্তাবনায় ৪ হাজার ৭২৫ মিটার পাইলিংসহ রিটেইনিং ওয়াল এবং স্লোপ প্রটেকশন নির্মাণ ও কিছু সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রস্তাব রয়েছে।

কিন্তু এরই মধ্যে দুই অর্থবছর পার হলেও প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়নি মন্ত্রণালয়। এমনকি নতুন অর্থবছরের বাজেটেও স্থান পায়নি প্রকল্পটি। ফলে এবারও বর্ষায় প্রস্তাবিত কাজ সম্পন্ন করার সম্ভাবনা আর নেই। প্রকল্পের প্রস্তাবকারী রাঙামাটি সওজ’র নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন অন্যত্র বদলি হয়েছেন। সেখানে অতিরিক্তি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে খাগড়াছড়ির নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মো. ফয়সালকে। ফলে প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ে কি অবস্থায় আছে তার খোঁজও রাখেনি কেউ।

পাহাড়ধসের পর এসব সড়কের ১১৩টি স্থানে ভাঙন ও গর্তের মাত্র ৬ মাস স্থায়ী ‘সাময়িক সংস্কার’ কাজ করা হয়। শালবাগানে সড়কের ওপর একটি বেইলি সেতু স্থাপন ও গাছের খুঁটি দিয়ে মাটির বস্তার বাঁধ দেওয়ার কাজেই তখন ব্যয় করা হয় প্রায় ১৪ কোটি টাকা। তাতেও ঝুঁকিমুক্ত হয়নি সড়কগুলো।

মূলত রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সাপছড়ি শালবাগান এলাকায় মূল সড়কটি ধসে গভীর খাদে পড়ে যাওয়ায় ভয়াবহ ওই সংকট প্রলম্বিত হয়েছিল। এক নাগাড়ে ৩৩ দিন সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে প্রায় অবরুদ্ধ ছিল রাঙামাটি। এতে নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধিসহ সংকট দেখা দেয় খাদ্য ও জ¦ালানির। ধস নামে পর্যটন ব্যবসায়ও। তবে ৬৯ দিন পরে ভারী যান চলাচল শুরু হলে স্বস্তি ফিরে জেলাজুড়ে। পাহাড়ধসে প্রধান সড়ক ছাড়াও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রাস্তা, স্থাপনা, ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়। এতে শহরসহ জেলায় ১২ শতাধিক পরিবার সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত আর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাড়ে ৯ পরিবার।

গত ২৩ জুন রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাড়সকের বেশ কয়েকটি ভাঙন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখে যায় বেহাল অবস্থা। গত বর্ষায় পানির প্রবাহে সড়কের ভাঙনে মাটির বস্তা ও গাছের খুঁটির পাইলিং দিয়ে তৈরি বাঁধের অনেক স্থানেই ধসে গেছে। এ ছাড়া বস্তা আর খুঁটিকে সড়কের বিপরীত পাশ থেকে বেঁধে রাখা লোহার দঁড়ি ছিড়ে গেছে। দেবে গেছে মাটিও। পোকায় ধরে শুকিয়ে পচে গেছে গাছের খুঁটি। বাকিগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে। ভারী বৃষ্টিপাত হলে যে কোনো সময়ই ধসে যেতে পারে। কিন্তু এসব বাঁধের ভাঙনরোধে স্থায়ী কোনো অবকাঠামো তৈরি করা হয়নি।

দুবছরেও সড়কধসে স্থায়ী কাজের উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছে রাঙামাটি বাস মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দিন সেলিম। তিনি বলেন, বর্ষার আগেই সড়কগুলো ঝুঁকিমুক্ত করা দরকার ছিল। প্রতিদিন কয়েকশ দূরপাল্লার যান চলাচল করছে এ সড়ক দিয়ে। যাতায়াতে মারাত্মক ভোগান্তি আর আশঙ্কায় চলতে হচ্ছে যাত্রী ও চালকদের।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক একেএম মামনুর রশীদ বলেন, জেলা প্রশাসনের প্রত্যেকটি সভায় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। বর্ষা মৌসুমে সড়কগুলো সচল রাখতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং এলজিইডিকে বলা হয়েছে।

দপ্তরটির অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা খাগড়াছড়ির নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মো. ফয়সাল বলেন, ‘মূল প্রকল্পটি পাস হয়নি। তবে সাময়িক মেরামতের জন্য ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। আপাতত গাছের খুঁটি দিয়ে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে কাজ করা হচ্ছে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box