এবার নির্বিঘ্নে ঈদযাত্রা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঈদ যাত্রার আগেই খুলছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নতুন দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতু। আগামী ২৫ মে বহুল প্রত্যাশিত চারলেন বিশিষ্ট এ সেতু দুটি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেতু দুটি চালু হলে এবার নির্বিঘœ হবে ঈদযাত্রা।

সেতু দুটির নির্মাণ কাজ প্রায় শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে এক মাস আগেই। এখন সেতু দুটিতে বাতি লাগানো ও সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজ চলছে। এদিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত বুধবার দেশে এসেছেন। আশা করা হচ্ছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও যোগ দিবেন।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রী, বাস চালকসহ বিভিন্ন সংগঠনের দাবী দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতু উদ্বোধনের পরও যেন পুরাতন সেতু দুটি চালু রাখা হয়। সড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম কয়েকদিন আগে আভাস দিয়েছিলেন, নতুন দুটি সেতু চালু হলেও ঈদকে সামনে রেখে পুরাতন মেঘনা ও গোমতী সেতু দুটিও চালু থাকবে। তবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্র জানায়, দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতু ২৫ মে উদ্বোধন হলেও পুরাতন সেতু দুটি ঈদ মৌসুমে চালু রাখার বিষয়ে এখনো কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী ২৫ মে এর আগে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায় ঈদ মৌসুমে পুরাতন সেতু দুটি খোলার রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।

এদিকে, গত বুধবার সচিবালয়ে অর্থনৈতিক বিষয় ও সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভা শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, দ্বিতীয় কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী সেতুর সংস্কার প্রকল্পের ভেরিয়েশেন প্রস্তাব সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নির্মাণ সময় বৃদ্ধি ও অন্যান্য কারণে ৭৮ কোটি দুই লাখ টাকার ভেরিয়েশন প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসময় অর্থমন্ত্রী বলেন, ঈদের আগে দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতু উদ্বোধন হবে। তখন যানবাহন স্বাভাবিক চলাচল করবে। উদ্বোধন হলে অন্তত ওই পয়েন্টে যানজট থাকবে না। আশা করছি এবার ঈদযাত্রা নির্বিঘœ হবে।

অন্যদিকে সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, সেতু দু’টি উন্মুক্ত হলে দীর্ঘ দিনের যানজটের অবসান হবে। জ্বালানি তেল খরচ যেমনি কমবে তেমনি সময়েরও সাশ্রয় হবে। সচল হয়ে উঠবে দেশের অর্থনীতির চাকা।

রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম ও প্রধান সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করার জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম মহসড়কে দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কিন্তু চার লেনের সুফল পাওয়ার আগেই যানজটের যন্ত্রণায় সব ¤øান হয়ে যায়। সর্বশেষ গত সপ্তাহে টানা কয়েকদিন হাজার হাজার গাড়ি আটকা পড়ে এ মহাসড়কে। রমজানে প্রচÐ গরমে হাজার হাজার যাত্রীর সীমাহীন ভোগান্তি অতীতের রেকর্ডকে হার মানায়। অর্থনীতিতে পড়তে থাকে বিরুপ প্রভাব। সে সময় যানজটে একেবারে স্থবির হয়ে গিয়েছিল দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি।

জানা গেছে, চার লেনে উন্নীত হওয়ার পর থেকেই কাঁচপুর, মেঘনা এবং মেঘনা-গোমতী সেতু দিয়ে এক লেনে যানবাহন চলাচল করতে গিয়ে যানজট লেগেই আছে। তার উপর সেতুগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। এই তিনটি সেতুর কারনে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি যানবাহন চলাচল ও মালামাল পরিবহণের জন্য মোটেও উপযোগী নয়।

সড়ক বিভাগ সূত্র জানায়, ঝুঁকির মুখে থাকা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিদ্যমান এ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর পাশেই জনদুর্ভোগ কমাতে আরও তিনটি সেতু নির্মাণের লক্ষ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট কমাতে ২০১৩ সালে দ্বিতীয় কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সে সময় সরকারী সিদ্ধান্তে বলা হয়, নতুন এই তিনটি সেতু নির্মাণের পাশাপাশি পুরাতনগুলোর সংস্কার শেষ হলে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ হবে। সেই লক্ষ্যে ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে ঠিকাদারি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে সড়ক বিভাগ। ২০১৬ সালে কাঁচপুর দ্বিতীয় সেতু নির্মাণের দৃশ্যমান কাজ শুরু হয়। ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত কাজের মেয়াদকাল হলেও দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতুর কাজ শেষ হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে। এ প্রকল্পের প্রথম সেতু হিসেবে এরই মধ্যে কাঁচপুর দ্বিতীয় সেতু চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। চলতি বছরের ১৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর উদ্বোধন করেন। তবে দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতু খুলে দেয়ার সাথে সাথে পুরাতনটি বন্ধ করে দেয়ায় খুব একটা সুফল মেলেনি। ঢাকা-সিলেট এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিলনস্থলে আগের মতোই যানজট লেগে থাকে। ভুক্তভোগিদের মতে, দ্বিতীয় কাঁচপুর সেতুর সিলেট মহাসড়ক প্রান্তের ফ্লাইওভারটি চালু না হওয়া পর্যন্ত পুরাতন কাঁচপুর সেতুটি চালু রাখলে যানজটের ভোগান্তি থাকতো না। কাঁচপুর সেতুর শিমরাইল অংশের যানজটের প্রভাবে কাঁচপুর সেতুর দুই প্রান্তেই প্রতিনিয়ত ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

সওজ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় মেঘনা সেতুর দৈর্ঘ্য ৯৩০ মিটার। আর দ্বিতীয় গোমতী সেতুর দৈর্ঘ্য এক হাজার ৪১০ মিটার। সেতু দুটির প্রকল্প বাস্তবায়নকাল ধার্য করা হয়েছিল ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, নির্ধানিত সময়ের অন্তত ৭ মাস আগে সেতু ৩টির সম্পূর্ণ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ফলে প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে ৭০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। অর্থ্যাৎ এই পরিমাণ অর্থ কম ব্যয় হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, তিন সেতু নির্মাণের জন্য নেওয়া প্রকল্পে সব মিলিয়ে ব্যয় হচ্ছে আট হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। তার মধ্যে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) দিয়েছে ছয় হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। বাকি অর্থের জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চার লেন চালুর পরও তিনটি সেতু সরু হওয়ায় তীব্র যানজট লেগেই থাকে। এ যানজট কমাতে নতুন এ তিনটি সেতু নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। মেঘনা ও গোমতী সেতু নির্মাণ করেছে যৌথভাবে জাপানি প্রতিষ্ঠান ওবায়শি করপোরেশন, সিমিজু করপোরেশন এবং জেএফই ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গিয়ে দেখা গেছে, নবনির্মিত মেঘনা ও গোমতী সেতুতে বাতি লাগানো ও সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজ চলছে। চকচকে নতুন দুই সেতু দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই আছে। আলাপকালে কুমিল্লার ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম, বাস চালক আলমগীর হোসেন ও মমতাজ উদ্দিন বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নবনির্মিত কাঁচপুর সেতুটি যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলেও পুরাতন সেতুটি মেরামতের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যার কারণে সুফল মিলছে না এই মহাসড়কে। তারা বলেন, ২৫ মে দ্বিতীয় মেঘনা ও গোমতী সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেত্তয়া হলেও নতুনটির পাশাপাশি পুরাতন দুটি সেতু যেন আসন্ন ঈদ পর্যন্ত খোলা রাখা হয়। আর যদি নবনির্মিত সেতু দুটি খুলে যদি কাঁচপুর সেতুর মতো পুরাতন দুটি সেতু মেরাতের জন্য বন্ধ করে দেত্তয়া হয় তাহলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সহজেই যানজট থেকে পরিত্রাণ পাবে না যাত্রীরা।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box