এবারের ঈদে তারা এলাকায় যাননি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

এবারের ঈদে নির্বাচনী এলাকায় যাননি অধিকাংশ বিএনপি নেতা। তৃণমূলের হতাশাগ্রস্ত কর্মীদের পাশে নেই কেন্দ্রীয় নেতারাও। নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর এলাকা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন দলটির অনেকেই। পরাজিত হাতেগোনা কিছু নেতা এলাকায় গেলেও যাননি হাজার হাজার মনোনয়নপ্রত্যাশী দলীয় নেতা, পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী নেতা। একই পথ অনুসরণ করেছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারাও।

দল ও জোটের নেতাদের এমন আচরণে ক্ষুব্ধ ও হতাশ তৃণমূল নেতাকর্মীরা। ভবিষ্যতে দুঃসময়ে কর্মীদের পাশে থাকা ত্যাগী নেতাদের মনোনয়ন দেওয়ার জোরালো দাবি তুলছেন তারা। অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপির নীতিনির্ধারক নেতারা বলছেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা হামলা-মামলার আশঙ্কাসহ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যার যার এলাকার কর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন।

বিএনপির মাঠ পর্যায়ের নেতাদের মতে, নির্বাচনের এখনও অনেক দেরি। এত আগে মাঠে নেমে ‘লাভ’ নেই। এ অবস্থায় এলাকায় গেলে টাকা-পয়সা খরচ হবে, নতুন মামলা-মোকদ্দমায় জড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। লাভ-লোকসানের এমন হিসাব-নিকাশ কষে ঈদুল ফিতরে এলাকায় কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেও যাচ্ছেন না ‘বসন্তের কোকিল’ হিসেবে পরিচিত এই নেতারা।

প্রায় অভিন্ন চিত্র দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মভূমি বগুড়া, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পৈতৃক বাড়ি ফেনী, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের জেলা ঠাকুরগাঁও এবং সাবেক মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের জেলা মানিকগঞ্জেও। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এসব এলাকায় নির্বাচনে মনোনয়নপ্রাপ্ত নেতাদের মধ্যে মির্জা ফখরুল, ফেনীতে খালেদা জিয়ার নির্বাচনী আসনের প্রার্থী রফিকুল আলম মজনুসহ দু-একজন এলাকায় গেলেও মনোনয়নপ্রাপ্ত ও প্রত্যাশী বেশিরভাগ ‘মৌসুমি রাজনীতিবিদ’ই যাননি।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে ৩০০ আসনে চার হাজার ৫৮০ জন নেতা ও ব্যবসায়ী এবং পেশাজীবী বিএনপি থেকে মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন। তারা সবাই দূরে থাক, মনোনয়নপ্রাপ্ত ৩০০ নেতার সবাই এবার এলাকায় যাচ্ছেন না। অবশ্য নির্বাচনের আগে গত ঈদুল আজহায় চিত্র ছিল ভিন্ন। তখন মনোনয়নপ্রত্যাশী পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের স্ব-স্ব নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াতে দেখা গেছে।

অবশ্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেছেন, তাদের কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের অসংখ্য নেতা হাজার হাজার মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কেন্দ্রীয় নেতারা যার যার এলাকায় যাচ্ছেন এবং যোগাযোগ রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, বিগত নির্বাচনের প্রার্থীরা নানামুখী চাপের মধ্যে রয়েছেন। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি ও পুলিশি হয়রানি অব্যাহত রয়েছে। সুস্থ ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকায় নেতারা এলাকায় যেতে পারছেন না।

শুধু ঈদ নয়- অভিযোগ রয়েছে সারাবছর এলাকার নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে বিএনপির অনেক সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও নেতাকে পাশে পাওয়া যায় না। মামলা-মোকদ্দমায় জর্জরিত হাজার হাজার নেতাকর্মীর পাশে দাঁড়ানোর কেন্দ্রীয় নির্দেশও পালন করেননি আইনজীবী নেতারা। অবশ্য গতকাল রাতে বিএনপির চেয়ারপাসন খালেদা জিয়ার পক্ষে গুলশান কার্যালয়ে নিখোঁজ নেতাকর্মীদের পরিবারের স্বজনদের ঈদ উপহার দেওয়া হয়। এ ছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে ‘আন্দোলনে নিহত ও গুম’ আট শতাধিক নেতাকর্মীর পরিবারকে ঈদ উপহার বাক্স পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী সমকালকে বলেন, নানা ভয়ভীতি ও বাধা-বিপত্তির মধ্যেও তাদের নেতারা এলাকায় যাচ্ছেন। রাজশাহীতে তাদের দুটি টিম সফরে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে বিরোধী নেতাদের পক্ষে মতবিনিময় এবং গণসংযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও নাটোর জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু সমকালকে বলেন, ‘সুবিধাবাদী’ ও ‘মৌসুমি’ রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ায় দলের পরিস্থিতি এখন এমন হয়েছে। জেল-জুলুম খাটা ত্যাগী ও তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা নেতাদের মনোনয়ন দিলে তারা ঈদ ছাড়াও সার্বক্ষণিক মাঠে থাকতেন।

চার ঘাঁটির খণ্ড চিত্র : বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান বগুড়ার নির্বাচনী এলাকায় বিএনপি নেতাদের তৎপরতা নেই বললেই চলে। গত নির্বাচনে এ জেলার সাতটি নির্বাচনী আসনে ৩০ জনের বেশি নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। এখন মাঠে নেই তেমন কেউ। জেলার দুপচাঁচিয়া উপজেলা বিএনপি সভাপতি আবদুল হামিদ সমকালকে জানান, সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার আশা নিয়ে গেল বছর ঈদের সময় যারা এলাকায় গণসংযোগ, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং ইফতার মাহফিলসহ ঈদ সামগ্রী বিতরণে ব্যস্ত সময় পার করেছেন, তাদের কাউকেই এবার দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য পুলিশের ভয়েও নেতাকর্মীরা জড়ো হতে পারেন না।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পৈতৃক বাড়ি ফেনী জেলায় বিএনপি থেকে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন ২৫ জনের বেশি নেতা। তাদের বেশিরভাগ ঈদ উপলক্ষে এখনও এলাকায় যাননি। অবশ্য মনোনয়নপ্রাপ্ত ফেনী-১ আসনের প্রার্থী রফিকুল আলম মজনু, ফেনী-২ আসনের প্রার্থী অধ্যাপক জয়নাল আবেদীন এবং ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী আকবর হোসেন ইফতার পার্টিতে অংশ নিয়েছেন। এ বিষয়ে রফিকুল আলম মজনু সমকালকে বলেন, পুলিশের গ্রেফতার ও আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের হামলার ভয়ভীতির মধ্যে বিএনপি সাধ্যমতো ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছে। তিনি তাতে অংশও নিয়েছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে গত নির্বাচনের সময় মনোনয়নপ্রত্যাশী কারোরই কোনো তৎপরতা নেই। একমাত্র মির্জা ফখরুলই নিয়মিত এলাকায় যাতায়াত করেন। গত নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ও বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ড. টিএম মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছেন তারা। তবে সামনে নির্বাচন না থাকায় তৎপরতা কিছুটা কম।

বিএনপির সাবেক মহাসচিব মরহুম অ্যাডভোকেট খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের জেলা মানিকগঞ্জের তিনটি আসনে গত নির্বাচনে ১১ জন নেতা দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু মনোনয়নপ্রাপ্ত তিনজনসহ ১১ জনের কেউই এলাকায় যাননি। মানিকগঞ্জ জেলার বিএনপির সদস্য সচিব এসএ কবির জিন্নাহ জানান, গত নির্বাচনের সময় নেতারা যে উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে এলাকায় গণসংযোগ করেছেন, এবারের চিত্র তার বিপরীত।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box