একা এবং অনন্য মালিঙ্গা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

তাঁর বিরুদ্ধে কখনোই অভিযোগের অন্ত ছিল না কোনো। এমনকি ১৯৯৬-তে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গাকেও প্রকাশ্যে তাঁর চুল নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থের প্রলোভনে জাতীয় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তো ছিলই। অভিযুক্ত হয়েছেন দলের ভেতরে খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফের সদস্যদের কারো কারো সঙ্গে বিবাদে জড়ানোর জন্যও। ছবি তোলার জন্য পোজ না দেওয়া কিংবা দেদার অটোগ্রাফ না বিলানোয় ভক্তরাও নাখোশ ছিলেন তাঁর ওপর। এত দিনেও সেই অভাব-অভিযোগ যায়নি। এসব ক্ষেত্রে নিজেকে না বদলানো লাসিথ মালিঙ্গার মাঠের পারফরম্যান্সও বদলায়নি। ব্যাটসম্যানের প্রাণক্ষয়ী ডেলিভারি এখনো গোলার মতো ছুটছে তাঁর হাত থেকে। যেমন ছুটত সেই ২৩ বছর বয়সেও। এই ৩৬ বছর বয়সেও তা এতই কার্যকরী যে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল স্বপ্নও ঝলমলিয়ে উঠছে।

দীর্ঘ ক্যারিয়ার সায়াহ্নে এসেও ম্যাচের ফলকে প্রভাবিত করার মতো পারফরম্যান্স তাঁকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেয়নি। বিশ্বকাপ খেলার জন্য দেশের লিগ ক্রিকেটেও মন-প্রাণ সঁপে দিয়ে খেলেছেন। সে জন্য নিবেদন নিয়েও প্রশ্ন তোলার কোনো অবকাশ ছিল না। আগের রাতে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের হয়ে আইপিএল ম্যাচ খেলেই পরদিন ক্যান্ডির পাল্লেকেলেতে পারফরম্যান্সের মুক্তা ঝরিয়েছেন। আইপিএল ম্যাচ খেলার ২০ ঘণ্টার মধ্যেই গড়েছেন লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটের নতুন রেকর্ডও। এদিকে আবার চোট-আঘাতও ছিল নিত্যসঙ্গী। তবে গত অক্টোবরে আবার বিবেচনায় ফেরার পর সে জন্য একটি ম্যাচও মিস করেছেন, এমন নজির নেই।

মুম্বাই ইন্ডিয়ানসকে জিতিয়েছেন সব শেষ আইপিএল। এবার বিশ্বকাপেও অভিজ্ঞ মালিঙ্গার আগুনঝরা বোলিং এখনো শেষ চারের দৌড়ে লঙ্কানদের রেখে দিয়েছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৩ রানে নিয়েছেন ৪ উইকেট। বাড়ন্ত বপুও তাঁর দুরন্ত পারফরম্যান্সের পথে বাধা হতে পারেনি। বরং তাঁর সুইং হেডিংলিতে বিপর্যস্ত করেছে ইংলিশ ব্যাটসম্যানদের। নিজেদের ডেরায় মার্ক উড, ক্রিস ওকস ও বেন স্টোকসরা যা সুইং পেয়েছেন, তার তুলনায় এই কারুকাজ ঢের বেশি দেখা গেছে মালিঙ্গার বোলিংয়ে। ক্রিকভিজের পরিসংখ্যান মতে ওই ম্যাচের অন্য পেস বোলারদের চেয়ে শতকরা ৩০ ভাগ বেশি সুইং করিয়েছেন মালিঙ্গা। বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখিয়ে যেতে থাকা এই ফাস্ট বোলার এখনো নিজ সামর্থ্যের জানান দিয়ে যাচ্ছেন যখন, তখনো দলের ভেতরে তাঁর অবস্থা খুব একটা বদলায়নি।

অনেকের সঙ্গে মালিঙ্গার বিরোধ এখনো প্রকাশ্য। সেগুলো নিয়ে মুখ খুলতেও দ্বিধা করেন না কখনো। মুখ খুলেছেন এই সেদিনও। তাঁর নেতৃত্ব যাওয়া নিয়ে সোচ্চার হয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘কিছু খেলোয়াড় এবং কোচদের কেউ কেউ অধিনায়ক হিসেবে আমাকে চায়নি। আমি জানি, আমাকে বের করার জন্য ওদের বেশ খাটতেও হয়েছে। কিন্তু এতে আমি হেরে যাইনি। আমি এখনো খেলায় আমার সেরাটা দিয়ে যাচ্ছি। বরং আমার পেছনে যারা লেগেছিল, তাদেরই ভুগতে হচ্ছে। ওদের কেউ কেউ দলেও নেই। আবার যারা আছে, তারাও রান করতে কিংবা উইকেট নিতে পারছে না।’

কিন্তু মালিঙ্গা পারছেন। দলের মধ্যে তাঁর বিরোধী হাওয়ার মধ্যেও। ইতিমধ্যে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেওয়া দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে সেমিফাইনালের পথে যখন আরেক ধাপ এগোনোর আশা শ্রীলঙ্কার, তখনো মালিঙ্গাতেই ভর দিয়ে আছে দলটির সাফল্য-ভাগ্য। এখানেই আলাদা তিনি। দলের মধ্যে একা হয়েও অনন্য।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box