উপেক্ষা পরিবহন ভোগান্তি-বৈরী বৃষ্টি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

নাড়ির টানে, প্রাণের টানে ঘরে ফিরছে মানুষ। কোনো বাধা-বিঘ্ন-বিড়ম্বনাই এ যাত্রাকে ম্লান করতে পারছে না। কারণ আজ চাঁদ দেখা গেলে কাল ঈদ। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে শেকড়ের টানে ছুটছেন সবাই। ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়, সড়কে টিকিট নৈরাজ্য, নৌপথে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে লঞ্চডুবির ঝুঁকিসহ নানা ভোগান্তি এবং বাড়তি বিড়ম্বনা হিসেবে বৈরী আবহাওয়ার আভাস কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা করার অবসর নেই কারও। ফিরতে হবে মায়ের কাছে; বাবার কাছে, ভাই-বোন, স্বজন-প্রিয়জন, স্ত্রী-সন্তানদের কাছে। না হলে ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পাবে কী করে!

এবার ঈদের আনন্দকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের টাইগাররা। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ময়দানে সাউথ আফ্রিকাকে উড়িয়ে যে অভাবনীয় সূচনা করেছে মাশরাফি বাহিনী সে আনন্দে আত্মহারা গোটা দেশ। ঈদের আগেই এমন ঈদ আনন্দ নিয়ে যখন ঘরমুখো মানুষ ঢাকা ছাড়ছে তখন তাদের যেন কোনো ভাগান্তিই আর গায়ে লাগছে না।

টানা গরমের পর স্বস্তির বৃষ্টি দিয়ে শুরু হয়েছে জুন মাস। আর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহেই পড়েছে এবারের ঈদ। ফলে ঈদযাত্রায় বাড়তি বিড়ম্বনা হিসেবে হাজির হয়েছে বৃষ্টি, বজ্রবৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়া। ঈদেও এমন বিরূপ আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে আবহাওয়া অফিস। এমন কি কোথাও কোথাও কালবৈশাখীও হানা দিতে পারে পূর্বাভাসে এমনটাই জানানো হয়েছে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে কাল বুধবার বা বৃহস্পতিবার ঈদ ধরে নিয়ে আবহাওয়া অফিস সূত্র জানিয়েছে, এই দুই দিনও বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এমনকি ঈদের পর আরও কয়েকদিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে। ঢাকাসহ সারা দেশে বৃষ্টির এমন পূর্বাভাস থাকলেও রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে বৃষ্টি কিছুটা কম হতে পারে। মূলত বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে ঢাকা এবং দক্ষিণাঞ্চলে। এ ছাড়া সিলেট, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগেও বৃষ্টির আভাস রয়েছে। আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জুনের প্রথমার্ধের মধ্যে সারা দেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু (বর্ষা) বিস্তার লাভ করতে পারে।

এমন বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেই ঘরে ফিরছে মানুষ। যদিও এ পূর্বাভাসের আগে থেকে অর্থাৎ মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকেই ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে। এ বছর ঈদুল ফিতরে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে এক কোটি ৪৭ লাখ মানুষ নাড়ির টানে বাড়ি ফিরবে বলে জানিয়েছে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির ঈদ-পূর্ব প্রতিবেদন। এর মধ্যে ঢাকা ছাড়বে এক কোটি ১০ লাখ মানুষ। প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, গাজীপুর থেকে যাবে ২৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। আর ১১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ যাবে নারায়ণগঞ্জ থেকে। এই বিপুলসংখ্যক ঘরমুখী যাত্রীর ৫৫ শতাংশ সড়কপথে ও ২৫ শতাংশ নৌপথে এবং বাকি ২০ শতাংশ যাবে রেলপথে।

এরই মধ্যে এক কোটির বেশি মানুষ ঢাকা ছেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আজ শেষ দিনে নৌ, স্থল ও আকাশপথে ঘরে ফিরবে আরও কয়েক লাখ মানুষ। প্রথম থেকেই ঘরেফেরা মানুষের নিরাপত্তা এবং যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ-র‌্যাবসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বাড়তি উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নিয়েছে। বিশেষ করে সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণ, ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধ, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ, ট্রেনে শিডিউল বিপর্যয় রোধ, নৌপথে যাত্রীবহনে লঞ্চ মনিটরিং, সর্বত্র শৃঙ্খলা রক্ষাসহ নানা বিষয়ে সতর্ক ছিল প্রশাসন। কিন্তু এর পরও চরম ভোগান্তি সঙ্গী ছিল যাত্রীদের।

টাঙ্গাইল সড়কের দুটি ফ্লাইওভার ও চারটি আন্ডারপাস চালু, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু খুলে দেওয়া এবং মহাসড়ক সংস্কারের কারণে এবার সড়কপথে যানজট না থাকলেও গতকাল রাজধানী থেকে বের হওয়ার পথে বিভিন্ন পয়েন্টে লেগে ছিল যানজট। সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যাংক ও গার্মেন্ট কারখানাগুলোর শেষ কর্মদিবস ছিল গতকাল। তাই দুপুরের পরপরই নাড়ির টানে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন রাজধানীবাসী। এতে চাপ পড়ে মহাসড়কে। পরিবহনও মিলছে না। সাভারের হেমায়েতপুর, ফুলবাড়িয়া, সাভার, নবীনগর ও বাইপাইল এলাকার রাস্তায় গাট্টি-বোচকা, ব্যাগ-লাগজ নিয়ে ঘরমুখো মানুষকে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। গাড়ি না পেয়ে অনেকে পণ্যবাহী ট্রাকে করে বাড়ি ফিরেছেন। এ সুযোগে যাত্রী পরিবহনে রাস্তায় নেমেছে বিপুলসংখ্যক লোকাল বাস। দুই-তিনগুণ ভাড়া নিয়ে দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহন করছে পরিবহনগুলো। রাস্তায় ইচ্ছেমতো দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলার কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যানজট হচ্ছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

প্রশাসনের তৎপরতার অভাবে ‘স্বস্তির যাত্রা’ এভাবেই ঈদের আগের দিন পর্যন্ত বিঘ্ন ঘটবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া টিকিট নিয়ে নৈরাজ্য এখনো বন্ধ করতে পারেনি প্রশাসন। ঈদে কয়েকগুণ বাড়তি ভাড়া নিয়েছে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বেশকিছু পরিবহন কোম্পানি। এসব নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালিয়েও তেমন একটা কাজ হয়নি। এরপরও বাড়তি ভাড়া দিয়েই বাড়ি ফিরেছেন ঘরমুখো মানুষ। এ ছাড়া শেষ সময়ের বৃষ্টিও ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ।

এরই মধ্যে রোববার বৈরী আবহাওয়ার কারণে দক্ষিণাঞ্চলের ৪৩টি রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ফের টার্মিনাল থেকে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়। এতে নৌরুটের যাত্রীদের ভোগান্তি পৌঁছেছিল চরমে। তবে গতকাল সদরঘাট থেকে চাঁদপুর, মাদারীপুর, বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন লঞ্চ ছেড়ে গেছে নিয়ম করে।

লঞ্চ মালিকরা জানিয়েছে এবার ঈদযাত্রায় ২১৫টি লঞ্চ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) জানিয়েছে, প্রতিদিন ১০০টিরও বেশি লঞ্চ সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে ছেড়ে যাচ্ছে। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রামসহ কয়েকটি অঞ্চলের নদী বন্দরের জন্য এক নম্বর সংকেত জারি করা হয়েছে।

এবারের ঈদে যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেলওয়ের সেবা নিয়ে চরম অসন্তুষ্ট সেবাগ্রহণকারী যাত্রীরা। প্রথম দিন থেকেই যাত্রীদের চরম ভোগান্তির মধ্যে ফেলেছে রেলওয়ে। ৩১ মে থেকে শুরু হওয়া রেলের ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে শিডিউল বিপর্যয় দিয়ে। অগ্রীম টিকিট কাটার সময় যেমন ভোগান্তির অন্ত ছিল না তেমনি সময়মতো ট্রেন না পেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার ভোগান্তিও পোহাতে হয়েছে যাত্রীদের। এ ছাড়া অ্যাপসের মাধ্যমে অনলাইনে রেলের টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করেছিল রেলওয়ে। কিন্তু অ্যাপসের এমন বেহাল দশা যে তাতে ঢুকতেই পারেনি গ্রাহকরা। আবার কেউ ঢুকতে পারলেও কয়েকটি অপশনে গিয়েই আটকে গেছে। অনলাইনে টিকিট কাটার গোটা পরিকল্পনাই এবার ভেস্তে গেছে। গতকাল সোমবারও শিডিউল বিপর্যয়ে পড়ে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় প্লাটফর্মে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। পাঁচ ঘণ্টা দেরিতে ছেড়েছে তিন দিন ধরে ধারাবাহিক শিডিউল বিপর্যয়ে পড়া চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস। এ ছাড়া লালমনিরহাটগামী ঈদ স্পেশাল লালমণি এক্সপ্রেস সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে কমলাপুর স্টেশন ছাড়ার কথা থাকলেও দুপুর ১২টার দিকে ট্রেনটি ছেড়ে যায়। রংপুরগামী ট্রেন রংপুর এক্সপ্রেস সকাল ৯টায় ছাড়ার কথা থাকলেও দুই ঘণ্টা দেরিতে বেলা ১১টায় কমলাপুর থেকে ছেড়ে গেছে ট্রেনটি।

রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, রোববার সিলেটগামী ট্রেন ‘কুশিয়ারা এক্সপ্রেস’ হবিগঞ্জের রশিদপুরে লাইনচ্যুত হওয়ার কারণে শায়েস্তাগঞ্জ জংশন ও কুলাউড়া স্টেশনে সিলেট থেকে ঢাকাগামী ‘জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস’, চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী ‘জালালাবাদ এক্সপ্রেস’ এবং ঢাকা থেকে সিলেটগামী ‘পারাবত এক্সপ্রেস’ ট্রেন আটকা পড়ে।

এতে দুর্ভোগে পড়েছেন ঈদে ঘরমুখো যাত্রীরা। এসব ট্রেন ছাড়াও অন্যান্য ট্রেনও নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে চলাচল করছে, তার কারণ হিসেবে রেল কর্তৃপক্ষ বলছে ঈদে যাত্রীসংখ্যা বেশি। তাই বিভিন্ন স্টেশনে বিরতি দেওয়ার সময় বেশি লাগছে। ঈদযাত্রায় ১৫ থেকে ৩০ মিনিটকে বিলম্ব হিসেবে ধরে না বলে জানিয়েরেছ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box