উন্নয়নের গ্যাঁড়াকলে নগরবাসী

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ঢাকায় বছরজুড়েই উন্নয়নের নামে ফুটপাত, সড়ক সংস্কার ও মেট্রোরেলের কাজে দিনভর যানজটে নাকাল নগরজীবন। শত চেষ্টাতেও এ গ্যাঁড়াকল থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না নগরবাসী। এই নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কিংবা সিটি কর্পোরেশনের সবাই উদাসীন।

বিশেষ করে মিরপুর-১০, ১২, প্রেস ক্লাব, মতিঝিল এলাকার চাকরিজীবীরা উন্নয়নের গ্যাঁড়াতে চরম ভোগান্তিতে আছেন। পাশাপাশি নিউমার্কেট থেকে শুরু করে ঢাকার অধিকাংশ অলিগলিতে সড়ক সংস্কার ও হকারদের রাজত্বে ফুটপাত দিয়ে পথচারীরা চলাচল করতে পারছেন না।

এর মূল কারণ হচ্ছে— সিটি কর্পোরেশনের সড়ক সংস্কারে ঠিকাদাররা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় বিল পাওয়ার নামে উন্নয়ন কাজে ধীরগতি। এতে সাধারণ মানুষ ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারছেন না।

নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ মনে করেন, ঢাকার প্রতিটি খাল, সড়ক সংস্কার ও ফুটপাত কোনো না কোনোভাবে বেদখল হয়ে আছে। শুধু হকার নয়, বিভিন্ন ধরনের পার্কিং, রেস্টুরেন্ট এবং দোকানের বর্ধিতাংশের কারণে ফুটপাতে পথচারীর কোনো পরিবেশ নেই। যদি ফুটপাত সঠিকভাবে পরিকল্পনা করে পরিচালনা করা হতো তাহলে অনেকাংশে যানজট কমিয়ে আনা সম্ভব।

গতকাল মতিঝিল, ফকিরাপুল, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, গুলিস্তান, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, বাবুবাজার, ফুলবাড়িয়া, মালিবাগ, মিরপুর-১, মিরপুর-১০, শ্যামলী, উত্তরা ও আব্দুল্লাহপুর এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও ফুটপাত দখল করে হকারদের পণ্য বিক্রি করতে।

অসময়ে সড়ক সংস্কারের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান আমার সংবাদকে বলেন, ডিএসসিসির এলাকার সব ফুটপাত ও অলিগলির রাস্তাঘাট একসঙ্গে ভাঙে না। এজন্য একই সময়ে কাজ শুরু করা যায় না।

যখন যে রাস্তার কাজ করার দরকার তখন টেন্ডার দিয়ে কাজের আহ্বান করা হয়। সেখানে লটারির মাধ্যমে ঠিকাদাররা কাজ পান। আমরা ইচ্ছা করলেও একজন ঠিকাদারকে কাজ দিতে পারবো না। তবে উন্নয়ন কাজে কিছুটা ভোগান্তির শিকার থাকবে। এবং সেটি নগরবাসীকে মেনে নিতে হবে।

উন্নয়ন ছাড়াও হকারদের কাছ থেকে পজেশনের জন্য প্রতিদিন ১৫০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। একই অবস্থা হলো শ্যামলীর সামনে বসা হকারদের অবস্থা। তবে ব্যতিক্রম রয়েছে গুলিস্তানে। এখানে ফুটপাতে বসানো স্থায়ী হকারদের কাছ থেকে মাসিক ১৫ হাজার টাকা চাঁদা নেয়া হয়। ভাসমান ছোট্ট দোকানগুলো থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ১শ টাকা চাঁদা তুলেন লাইনম্যান।

জানা গেছে, রাজধানীর ফুটপাতের ২০ ভাগ হকারদের দখলে, ২৫ ভাগ দোকান মালিকদের দখলে, পাবলিক টয়লেট ও অন্যান্য যাত্রী ছাউনি ১২ শতাংশ, রাজনৈতিক দলের অফিস ২ শতাংশ, সব মিলিয়ে ৫৭ শতাংশ দখল এবং ৪৩ শতাংশ উন্মুক্ত রয়েছে। আর হকার সমিতির পরিসংখ্যানে, ফুটপাতে ৩ লাখের ওপরে হকার। ঈদের সময়ে হকারের সংখ্যা ৪-৫ লাখে পৌঁছে। মৌসুমী হকার ফুটপাতে বসার জায়গা না পেলে তারা পাড়া-মহল্লা ও গণপরিবহনে ব্যবসা করে।

হকারদের মতে, ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ হকারদের আইডি কার্ডসহ পুনবার্সনের জন্য মুক্তাঙ্গন, ওসমানি উদ্যানের ১ একর, নটরডেম কলেজের দক্ষিণ হতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উত্তর পর্যন্ত, মতিঝিল আইডিয়াল কলেজের পশ্চিম হতে টিএন্ডটি পর্যন্ত, পান্থপথ সোনারগাঁও হোটেল থেকে গ্রিনরোডের মোড়, নীলক্ষেত পেট্রোল পাম্প মোড় হতে পলাশী মোড়, মিরপুর কো-অপারেটিভ মার্কেট থেকে মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের সংযোগ রাস্তার উভয় পাশের ফুটপাতে বসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপর হকারদের এসব জায়গায় বসানোর কোনো তদারকি হয়নি। ফলে ইচ্ছামতো হকাররা যখন সেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই ফুটপাত দখল করে বসেছেন।

অন্যদিকে ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সিটি কর্পোরেশনের মাঠপর্যায়ে পরিদর্শক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় নগরীর যেখানে সেখানে হকার ও ভ্যানগাড়ি বসার সুযোগ পাচ্ছে। হকার উচ্ছেদের ক্ষমতা এককভাবে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে সম্ভব নয়।

হকার নেতারা বলেন, বিভিন্ন সময়ে খরা, বন্যা, নদী ভাঙনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও স্বশিক্ষিত বেকার মানুষগুলো নিজে ও পরিবার বাঁচানোর তাগিদে ঢাকাসহ সারাদেশে ফুটপাতে ব্যবসা করেন। এতে দোকান ভাড়ার দরকার হয় না, অল্প লাভে ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারেন।

এতে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে লাভবান হন। কিন্তু হঠাৎ ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদ করলে বিপাকে পড়েন তারা। তাদেরকে পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করে দিলে ফুটপাতে বসবে না।হকার পুনর্বাসন ছাড়াও ১০ দফা দাবির কথা জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক হকারদের পুনর্বাসন করা, হকারদের পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ সারা দেশে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে হকার উচ্ছেদ কার্যক্রম স্থগিত রাখা, ঢাকা দক্ষিণ ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক হকারদের জন্য বরাদ্দকৃত উনিশ কোটি আটানব্বই লাখ টাকা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় দেয়াসহ সারাদেশের হকারদের পুনবার্সনের জন্য আরও কমপক্ষে পাঁচশ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া, হকারদের কাছ থেকে অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধ করা, হকারদের নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক অনুমোদিত ৫টি হলিডে মার্কেট বসার ব্যবস্থা করে দেয়া, রেজিস্ট্রার করা হকার সংগঠনের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতিনিধি বা সদস্যদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা ইত্যাদি।

ফুটপাতে হকার বসানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি এমএ কাশেম আমার সংবাদকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহায়-সম্বল হারিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষিত-স্বশিক্ষিত মানুষ ঢাকা শহরে এসে বসবাস করা শুরু করেছেন।

এসব অসহায় মানুষের দায়-দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। তারাও এদেশের নাগরিক। এই মানুষগুলো নিজেদের কর্মসংস্থান নিজেরাই সৃষ্টি করার জন্য বেছে নিয়েছে ফুটপাত। সরকার হলিডে মার্কেট কিংবা নতুন কোনো জায়গা দিলে সেখানেই ব্যবসা শুরু করবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box