আমাদের মহানায়ক

আলোকিত সকাল ডেস্ক

দুঃখ, হাহাকার আর বঞ্চনাময় জীবনের মলম হিসেবে আমরা সবসময় একজন ‘হিরো’ হাতড়ে বেড়াই। কিন্তু সবসময় পাই কি? অবশ্যই না। তারপরও হাল ছাড়ি না। কখনো ফুটবলে, কখনো ক্রিকেটে, কখনো পর্দায় আমরা নায়কের সন্ধান করেছি। যিনি আমাদের স্বপ্ন দেখাতে পারেন, ভুলিয়ে দিতে পারেন যাপিত জীবনের নানা দুঃখ-কষ্টকে। অবেশেষে আমরা তেমন একজন নায়ককে পেয়ে গেছি। তিনি সাকিব আল হাসান, আমাদের মহানায়ক।

সাকিবের নানামাত্রিক পরিচয় আছে, সেসবের কিছু হয়তো তর্কসাপেক্ষ। তবে তিনি যে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার এই নিয়ে কেউ দ্বিমত করেননি এবং ভবিষ্যতেও করার আপাত কোনো স্কোপ নেই। এর বাইরে একেক জনের কাছে তার পরিচয়টা একেক রকম। তিনি অহংকারী, চাপা স্বভাবের; আবার কারও কাছে দারুণ প্রাণোচ্ছল, আত্মবিশ্বাসে উদ্দীপ্ত, শেকড় ভুলে না যাওয়া একজন মানুষ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের যেমন অন্ত নেই, ভালোবাসার ভাণ্ডারেও সঞ্চয় নেহাত কম নয়।

রক্তে মিশে ছিল ফুটবল, নিজের সবচেয়ে বড় প্যাশনের জায়গাটাও বরাবরই ছিল সেটা। কিন্তু দারুণ সাহসী এবং আত্মবিশ্বাসী সাকিব যেন পেলে-ম্যারাডোনা হতে চাইলেন না, চাইলেন বাংলাদেশের জার্সি গায়ে বিশ্ব মাতাতে। তাই ফুটবলপাগল বাবা মাশরুর রেজা যখন তাকে বললেন ক্রিকেট ছেড়ে ফুটবলে মনোযোগ দিতে, সাকিব পরিষ্কার করে বলে দিলেন, ‘ক্রিকেট খেললে বিশ্বকাপ খেলা যাবে।’ এত কম বয়সে কী দৃপ্ত উচ্চারণ, কী দারুণ আত্মবিশ্বাস! পরিণত হয়ে সাকিব আজ যা ছড়িয়ে যাচ্ছেন বিশ্বময়।

নায়করা বোধহয় বিশুদ্ধবাদী হন না। আমাদের মহানায়কও তাই। সাকিবকে নিয়ে নানা সময় বিতর্ক হয়েছে, সমালোচনা হয়েছে কিন্তু তার মধ্যে এক অসম্ভব ক্ষমতা আছে সেগুলো শুষে নেওয়ার। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে হাসিমুখে সেসব বরণ করে নিয়েছেন কিংবা উড়িয়ে দিয়েছেন, হাঁস যেমন গা থেকে জল ঝেড়ে ফেলে! আর পারফরম্যান্সের কথা? উল্টো বিতর্ক হলেই যেন জ্বলে ওঠেন সাকিব।

ব্যাট-বল হাতে সাকিব যেমন প্রতিপক্ষকে গুনেন না, মাইক্রোফোন হাতেও সেই চরিত্রটা বেরিয়ে আসে প্রায়-ই। তাতে বিতর্ক যেমন হয়, তেমনি প্রিয়ও হয়ে ওঠেন এমন ঠোঁট কাটা স্বভাবের জন্য।

দুএকটা উদাহরণ মনে করা যাক। এই যেমন বাংলাদেশ ম্যাচ হেরে যাওয়াতে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন এসেছে, ‘ম্যাচ হারার কারণ কী?’ একাদশ পছন্দ না হওয়ার ব্যাপারে কোনোরকম অসন্তোষ মনে লুকিয়ে না রেখে তিনি বলে দিয়েছেন, যে টিমটা আজকে খেলেছে, সেটা আমার না।’ আবার বলেছেন, ‘দলের সেরা দুজন ফিল্ডার মাঠের বাইরে বসে ছিলেন বলে ফিল্ডিংয়েই পিছনে পড়ে গেছি আমরা।’ কিংবা ব্যাটিং বিপর্যয়ের কারণ জিজ্ঞাসা করলে মজা করে উত্তর দিয়েছেন, ‘লাঞ্চটা বেশ ভালো ছিল, তাই বোধহয়!’ এ ছাড়াও একবার তিনি বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের পেশিশক্তি কম হওয়ার প্রসঙ্গে বলেছিলেন অরেঞ্জ জুস খাওয়ার কথা!

একটু পেছনে ফেরা যাক। লর্ডস, মেলবোর্ন, ইডেন গার্ডেন, মিরপুর মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো সাকিবের শুরুটা হয়েছিল পাশের গ্রামের আলোকদিয়ার মাঠে! অনেক বছর পরে সেই মাঠে গিয়ে সাকিব বলেছিলেন, ‘এই মাঠ থেকেই সব শুরু হয়েছিল। এই মাঠের জন্যই এত দূর এসেছি।’ ২০০১ সালের দিকে ক্লাস সেভেনে থাকাকালীন ওই মাঠে ‘খ্যাপ’ খেলতে গিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। বিধ্বংসী ব্যাটিং আর পেস বোলিংয়ে নজর কেড়েছিলেন সবার। হ্যাঁ, সাকিব প্রথমে পেসারই ছিলেন! সাকিবের ওই দিনের পারফরমেন্স মুগ্ধ করেছিল সেই ম্যাচের আম্পায়ার সাদ্দাম হোসেনকে। পরবর্তীতে তার পরামর্শেই সাকিব মাগুরায় ইসলামপুরপাড়া স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেন। টেপড টেনিস বলে খেলা সাকিব সেখানেই প্রথম আসল ক্রিকেট বল হাতে পান।

২০০১ সালে বিকেএসপির প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রমে মাগুরা জেলার হয়ে নড়াইল ক্যাম্পের জন্য মনোনীত হন। নড়াইল ক্যাম্প থেকে ঢাকার বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য যে ২০ জন সুযোগ পায় তার মধ্যে সাকিবও ছিলেন। বিকেএসপির তৎকালীন ক্রিকেট প্রশিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বাপ্পী এবং সাকিবের কোচ সৈয়দ সাদ্দাম হোসেন গোর্কির পরামর্শে সাকিবের বাবা শেষ পর্যন্ত সাকিবকে বিকেএসপির ক্রিকেট বিভাগে ভর্তি করিয়ে দেন। ভর্তির পর বাংলাদেশের হয়ে বয়সভিত্তিক দল অর্থাৎ অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৯ এর হয়ে খেলার সুযোগ পান এবং নিজের প্রতিভার সাক্ষর রাখেন।

২০০৬-এ ওয়ানডে অভিষেকের পর ২০০৭ তে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় সাকিবের। শুরুটা সাকিবসুলভ না হলেও নিজের জাত চেনান সাকিব। একজন অলরাউন্ডার হওয়া সত্ত্বেও অক্টোবর ২০০৮-এর নিউজিল্যান্ডের বাংলাদেশ ট্যুরের আগ পর্যন্ত সাকিবকে বোলার নয়, ব্যাটসম্যান হিসেবেই গণ্য করা হােত। পরের মাসেই বাংলাদেশ দল দুটি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও একটি টি-২০ খেলতে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যায়। দক্ষিণ আফ্রিকার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় দিনেই পাঁচ-পাঁচটি উইকেট তুলে নেন সাকিব। দ্বিতীয় টেস্টে সাকিব আবারও এক ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার করেন। ওই সিরিজে সাকিব ২০.৮১ গড়ে ১১ উইকেট নেন। ২০০৯ সালটা সাকিবের ক্যারিয়ারের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাকিব সেই যে ঝলক তুললেন, আর থামলেন না।

ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের পুরস্কার পেতেও দেরি হলো না। ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো আইসিসির ওডিআই অলরাউন্ডার তালিকার ১ নম্বরে উঠে আসেন। আইসিসি ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার এবং আইসিসি টেস্ট প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ারের জন্য মনোনয়ন পান। ওই একই বছর শচীন টেন্ডুলকার, জ্যাক ক্যালিস, গৌতম গম্ভীরের মতো খেলোয়াড়কে পেছনে ফেলে জিতে নেন উইজডেন টেস্ট প্লেয়ার বর্ষসেরার পুরস্কার!

২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর তারিখে সাকিব আল হাসান যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী উম্মে আহমেদ শিশিরের সঙ্গে জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করেন। শিশির সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এ স্নাতক, পড়াশোনা করেন মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এত এত খ্যাতির পরও সাকিবকে মাঝেমাঝে অপ্রীতিকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছে। তবে কোনো কিছুই মাঠে সাকিবের পারফরমেন্সের ওপর প্রভাব ফেলতে পারেনি। সাকিবের প্রত্যাবর্তন প্রতিবারই ছিল সাকিবের মতো।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box