৬৯ বছর পর সেই ‘অভিশপ্ত’ সাদা জার্সি এবং ব্রাজিলের জয়

আলোকিত সকাল ডেস্ক

রাজকীয় হলুদের সঙ্গে কলার কিংবা হাতায় সবুজের মিশ্রণ। হাফ ট্রাউজারটা নিল। মোজাটা সাদা। ব্রাজিল ফুটবল দলকে এ রঙয়েই সবচেয়ে বেশি চেনে মানুষ। মাঝে-মধ্যে অ্যাওয়ে জার্সিতেও দেখা যায়। সেই জার্সির রঙ হয় নিল। জামা-ট্রাউজার এবং মোজা- সবই নিল। এই রঙটাও অচেনা নয় ভক্তদের কাছে।

কিন্তু শুক্রবার রাতে, কোপা আমেরিকার উদ্বোধনী ম্যাচে ভলিবিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে হঠাৎই ভিন্ন এক রঙয়ের জার্সি পরে ভক্ত-সমর্থকদের সামনে ধরা ছিল ব্রাজিল ফুটবল দল। রাজকীয় হলুদের চিহ্ন পর্যন্ত নেই ব্রাজিলের ফুটবলারদের গায়ে। জার্সিটা পুরোপুরি সাদা। হলার এবং হাতায় নিলের মিশ্রণ। হাফ ট্রাউজারটা নিল এবং মোজাটা নেভি ব্লু।

হঠাৎ এই পরিবর্তিত জার্সিতে কেন ব্রাজিল ফুটবল দল? কেন তাদের জার্সিতে নেই ঐতিহ্যবাহী হলুদ রঙ? একরাশ প্রশ্ন জেগেছে ব্রাজিল ফুটবল সমর্থকদের মনে। মূলতঃ ব্রাজিল শত বছরের এক ঐতিহ্যকে স্মরণ করতেই ৬৯ বছর পর ফিরিয়ে আনলো তাদের একসময়ের প্রধান, সাদা রঙয়ের জার্সি।

ব্রাজিল ফুটবলকে ভালোবাসেন আর মারাকানাজ্জো ট্র্যাজেডির কথা জানেন না, এমন লোক খুজে পাওয়া দায়। ফুটবল ইতিহাসেই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছিল ১৯৫০ সালে রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে। সেই হৃদয়বিদারক মারাকানা ট্র্যাজেডিরই এক স্মৃতি ৬৯ বছর পর ফিরিয়ে আনলো ব্রাজিল এবং সাফল্যও ঘরে তুলে নিলো তারা।

১৬ জুলাইয়ের ম্যাচটিকে ফাইনাল বলা না হলেও আক্ষরিক অর্থে ওটাই ছিল ফাইনাল। সেই বিশ্বকাপ আয়োজন হয়েছিল গ্রুপ পদ্ধতিতে। শেষ পর্যন্ত যারা শীর্ষে থাকবে তারাই হবে চ্যাম্পিয়ন।

লিগ পর্বের ম্যাচ, ঘুরতে ঘুরতে শেষ ম্যাচটাই পরিণত হয়েছিল ফাইনালরূপে। যেটাতে ড্র করলেও চ্যাম্পিয়ন হবে ব্রাজিল। উরুগুয়েকে জিততেই হবে। প্রথমবারেরমত বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৃশ্য নিজ চোখে দেখার জন্য মারাকানায় সেদিন উপস্থিত হয়েছিল ২ লাখেরও বেশি ব্রাজিলিয়ান ফুটবল ভক্ত।

৪৭ মিনিটে ফ্রিয়াকার গোলে ব্রাজিল এগিয়ে গেলেও ৬৬ মিনিটে শিয়াফিনোর গোলে সমতায় ফেরে উরুগুয়ে। ৭৯ মিনিয়ে ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক বারবোসার এক ভুলে ঘিগির গোলে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে উরুগুয়ে।

ঘিগিয়া যখনই গোল করেন, তখনই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো মারাকানা। পিন পড়ারও শব্দ ছিলো না। নিজেদের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছিল না ব্রাজিলিয়ানরা। রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভে-শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে পুরো মারাকানা। পরাজয় সইতে না পেরে গ্যালারি থেকেই লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে ৫০ জনেরও বেশি ফুটবল প্রিয় মানুষ। ইতিহাসে এটাই মারাকানা ট্র্যাজেডি।

সাদা জার্সি পরে বিশ্বকাপ তো জয় হলোই না, উল্টো বিশাল ট্র্যাজেডির জন্ম হয়েছিল মারাকানায়। যে কারণে ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের পর সাদা জার্সিকে পুরোপুরি বিদায়ই বলে দিয়েছিল জোগো বোনিতোরা। সাদা জার্সির পরিবর্তে তারা প্রবর্তণ করলো ঐতিহ্যবাহী হলুদ-নীল জার্সি।

১৯৫৪ সাল থেকে হলুদ-নিলেই সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল। একটা ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে এই রঙয়ের জার্সি। পেলে তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছে এই জার্সি পরে। জিকো-সক্রেটিসরা বিশ্ব কাঁপিয়েছেন এই জার্সি পরে। ১৯৯৪, ১৯৯৮ এবং ২০০২- টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলেছে তারা এই জার্সি পরে এবং জিতেছে দুটি। ২০১৮ বিশ্বকাপ পর্যন্ত এই জার্সিই ছিল তাদের সঙ্গী।

কিন্তু ২০১৯ নিজ দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকায় হঠাৎ এই জার্সি বদলে ফেলার কারণ কি? হঠাৎই কেন সেই অভিশপ্ত জার্সি ফিরিয়ে আনলো তারা?

বিশেষ একটি কারণেই মূলতঃ সাদা জার্সিকে ফিরিয়ে আনলো ব্রাজিল। সেটা হচ্ছে, ১৯১৯ সালে কোপা আমেরিকার মধ্য দিয়ে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিলিয়ানরা। সেবার টুর্নামেন্টের ফাইনালে তারা হারিয়েছিল উরুগুয়েকেই। ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সাদা’ই ছিল ব্রাজিলের জার্সির মূল রঙ।

১৯১৯ সালের পর ২০১৯, অর্থ্যাৎ প্রথম শিরোপা জয়ের শতবর্ষপূর্তিতে উদযাপন করার জন্যই মূলতঃ সাদা জার্সি ফিরিয়ে আনলো সেলেসাওরা। যে জার্সিকে অভিশপ্ত হিসেবে বাতিল করে দিলেও ৬৯ বছর পর আবারও সেই ‘অভিশপ্ত’ জার্সিকে ফিরিয়ে আনলো ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন। শুধু ফিরিয়ে আনাই নয়, কোপা আমেরিকার উদ্বোধনী ম্যাচে বলিভিয়ার বিপক্ষে সেই ‘অভিশপ্ত’ জার্সিই পরেই ৩-০ গোলে বাজিমাত করলো নেইমারবিহীন ব্রাজিল।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box