২১শে গ্রেনেড হামলার চূড়ান্ত বিচারের অপেক্ষা জাতি

আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফ ও মোফাজ্জল হোসেন মায়ার নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা মানবঢাল তৈরি করেন

১৬ বছর আগে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে চালানো হয়েছিল ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। ২৪ জন নিহত ও ৫ শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলায় বিচারিক আদালতে রায় হয়েছে দুই বছর আগে। তবে এখনো উচ্চ আদালতে চূড়ান্ত বিচার শুরু না হওয়ায় দন্ড কার্যকরের জন্য অপেক্ষা রয়েই গেল। বিচারিক আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করে তাঁর দল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করাই ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ মদদে চালানো হামলার উদ্দেশ্য। ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর দেওয়া রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ আসামিকে মৃত্যুদন্ড দেয় ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। একই অপরাধে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ আসামিকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়। আরও ১১ আসামিকে দেওয়া হয় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা।

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানায়, এ ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে করা দুই মামলার ডেথ  রেফারেন্স ও আপিল শুনানি গ্রহণে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বস্তু পেপারবুক ছাপা শেষে সম্প্রতি বি জি প্রেস থেকে সুপ্রিম কোর্টে এসে পৌঁছেছে। যাচাই-বাছাই শেষে শুনানির জন্য বেঞ্চ নির্ধারণে প্রধান বিচারপতির নজরে আনা হবে। এদিকে মামলা দুটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। সুপ্রিম কোর্ট আরও জানায়, হত্যা মামলা ১৩ ভলিউমে মোট ৫৮৫টি এবং বিস্ফোরক মামলার জন্য ১১ ভলিউমে মোট ৪৯৫টি পেপারবুক প্রস্তুত রয়েছে। হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্সের পাশাপাশি ২২টি আপিল ও ১২টি জেল আপিল দায়ের হয়েছে। অন্যদিকে বিস্ফোরক মামলায় ১৭টি আপিল দায়েরের পাশাপাশি ১২টি জেল আপিল দাখিল করেছেন আসামিরা। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও স্পেশাল অফিসার মোহাম্মদ সাইফুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা পেপারবুক হাতে পেয়েছি। এখন তা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এ ছাড়া যদি পলাতক আসামি থাকেন, তাহলে তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী নিয়োগ করা হবে। সব প্রস্তুতি শেষ হলে মামলা দুটি শুনানির জন্য বেঞ্চ নির্ধারণে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে।’ ফৌজদারি কার্যবিধির ৩১ ধারা অনুযায়ী নিম্ন আদালত আসামিকে মৃত্যুদন্ড দিলে তা কার্যকরের জন্য হাই কোর্টের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণার পর মামলার সব নথি হাই কোর্টে পাঠানো হয়, যা ডেথ রেফারেন্স মামলা হিসেবে হাই কোর্টে এন্ট্রি হয়। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দন্ডিতরা আপিল ও জেল আপিল দায়ের করেন। ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিল একসঙ্গে শুনানি হয়। ডেথ রেফারেন্স শুনানির পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে পেপারবুক তৈরি করতে হয়। পেপারবুকে মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র, জব্দ তালিকা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের জবানবন্দি, জেরা ও বিচারিক আদালতের রায় পর্যায়ক্রমে সাজানো থাকে। জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে এ মামলা দুটির পেপারবুক তৈরি হয়েছে। প্রায় ২২ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক। আমি অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলাপ করেছি এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ মামলা দুটি দ্রুত শুনানির জন্য আবেদন করব, যাতে তারিখ নির্ধারণ হয়।’ সে আবেদনটাও অতি শিগগিরই করা হবে বলে জানান আইনমন্ত্রী। এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘প্রথমে আমাদের একটি দরখাস্ত করতে হবে এ মামলাটি দ্রুত শুনানির জন্য কোনো একটি বেঞ্চে পাঠিয়ে দিতে।’ তিনি বলেন, ‘এ মামলাটির যাতে বিচার না হয়, আসল আসামিরা যাতে ধরা না পড়ে সেজন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছিল। কাজেই মামলাটির শুনানি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হবে এটা আমরা মনে করি এবং সে ব্যাপারে আদালতের কাছে প্রার্থনা করব।’ তারেক রহমানের যাবজ্জীবন হয়েছে নিম্ন আদালতে, তার সাজা বাড়ানোর জন্য কোনো আপিল করবেন কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সাধারণত নিচের কোর্টে যদি যাবজ্জীবন দন্ড হয় সে ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতে ফাঁসির জন্য আপিল করে কোনো লাভ হয় না। কাজেই এ ব্যাপারে যে সাজাটা আছে তা যেন বহাল থাকে এটাই আমাদের প্রচেষ্টা থাকবে।’

ফিরে দেখা : বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়। ওই নৃশংস হামলায় আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত ও নেতা-কর্মী-আইনজীবী-সাংবাদিকসহ ৫ শতাধিক লোক আহত হন। এ হামলায় অল্পের জন্য বেঁচে যান তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রাণে বেঁচে গেলেও গ্রেনেডের প্রচ- শব্দে তাঁর কানের গভীর অঙ্গ জখম হয়। হামলার দিন রাতেই এসআই শরীফ ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা করেন। পরদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মামলা করতে গেলে তা নেওয়া হয়নি। মামলা ভিন্ন খাতে নিতে বিএনপির নীতিনির্ধারক অনেকে তৎকালীন একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করেন। তারা জজ মিয়া নাটক মঞ্চায়নের সব আয়োজনও সম্পন্ন করেন। এমনকি আওয়ামী লীগের দিকে সন্দেহের আঙ্গুল তুলে বিএনপি দিতে থাকে নানা বক্তৃতা-বিবৃতি। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পুনর্তদন্ত শুরু হয়। তখন বেরিয়ে আসতে থাকে অনেক অজানা তথ্য। ২০০৮ সালের ১১ জুন সিআইডি কর্মকর্তা ফজলুল কবীর দুটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দীন, হুজিবি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। ওই বছরই মামলা দুটি দ্রুত বিচার আদালতে স্থানান্তর করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে হামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয় আদালত। দুই বছর তদন্তের পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ ৩০ জনকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হয়। এ নিয়ে এ মামলায় মোট আসামির সংখ্যা হয় ৫২। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১২ সালের ১৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বিচার প্রক্রিয়া। গত বছর ১৮ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষের (রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষ) যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন রায়ের জন্য দিন ঠিক করেন। ১০ অক্টোবর রাজধানীর নাজিমউদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত বিশেষ এজলাসে চাঞ্চল্যকর এ মামলা দুটির রায় ঘোষণা করেন বিচারক। এরপর ২৭ নভেম্বর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি ও যাবতীয় নথিপত্র ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাই কোর্টে পাঠানো হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও তার সহযোগীরা গ্রেনেড হামলার কিছু দিন আগে বনানীর হাওয়া ভবনে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে এক বৈঠকে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা করার সহযোগিতা চায় জঙ্গিরা। তারেক রহমান উপস্থিত সবার সামনে জঙ্গিদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আর ওই হামলার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করে তাঁর দলকে নেতৃত্বশূন্য করা। 

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ১৯ আসামি হলেন : বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, ডিজিএফআইর সাবেক ডিজি মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআইর সাবেক ডিজি ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ (পলাতক), মাওলানা মো. তাজউদ্দীন (পলাতক), মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, মো. আবদুল মাজেদ ভাট ওরফে মো. ইউসুফ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ, মাওলানা শওকত ওসমান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান, মাওলানা আবু সাঈদ, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহমেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ, রফিকুল ইসলাম ও উজ্জ্বল ওরফে রতন।

যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত ১৯ আসামি : তারেক রহমান ওরফে তারেক জিয়া (পলাতক), হারিছ চৌধুরী (পলাতক), শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর আবু হোমাইরা ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমদ ওরফে আবদুল হান্নান সাব্বির, আরিফ হাসান ওরফে সুজন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, আবুবকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার, মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ, মহিবুল মোত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন (পলাতক), আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন (পলাতক), মো. খলিল (পলাতক), জাহাঙ্গীর আলম বদর (পলাতক), মো. ইকবাল (পলাতক), লিটন ওরফে মাওলানা লিটন (পলাতক), কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ (পলাতক), মুফতি শফিকুর রহমান (পলাতক), মুফতি আবদুল হাই (পলাতক) ও রাতুল আহম্মেদ বাবু (পলাতক)।

তিন আইজিপিসহ ১১ জনের দুই ও তিন বছর সাজা : পুলিশের সাবেক আইজি খোদা বক্স চৌধুরী (কারাগারে), সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (অব.) রুহুল আমিন (কারাগারে), এএসপি (অব.) আবদুর রশিদ (কারাগারে) ও এএসপি (অব.) মুন্সি আতিকুর রহমানকে (কারাগারে) তিন বছর করে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাদের ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভাগ্নে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক (কারাগারে), সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা (কারাগারে), সাবেক আইজিপি শহুদুল হক (কারাগারে), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন (পলাতক), লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার (পলাতক), ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক উপকমিশনার ওবায়দুর রহমান (পলাতক) ও ডিএমপির সাবেক উপকমিশনার খান সাঈদ হাসানকে (পলাতক) দুই বছর করে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।

Facebook Comments Box