২০২১ এর প্রথম মাসে করোনার টিকা পাচ্ছে বাংলাদেশ

৭১কন্ঠ ডটকম
সুসংবাদটি এলো বছর শেষের আগের দিন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত করোনাভাইরাসের টিকা ‘কোভিশিল্ড’ ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাজ্য। এর ফলে বাংলাদেশ সরকার আশা করছে, খুব দ্রুতই অর্থাৎ জানুয়ারি মাসের শেষে অথবা এর আগেও এই টিকা বাংলাদেশ পেয়ে যেতে পারে। যুক্তরাজ্যে এর আগে ফাইজারের টিকা অনুমোদন পেয়ে তা মানুষের মধ্যে প্রয়োগও শুরু হয়ে গেছে। ফলে অক্সফোর্ডের টিকা নিয়ে দেশটিতে যতটা উচ্ছ্বাস, তার চেয়ে অনেক বেশি উচ্ছ্বাস-আগ্রহ বাংলাদেশের মানুষের ভেতর। কারণ বাংলাদেশ আগে থেকেই এই টিকার অংশ হয়ে আছে ক্রেতা হিসেবে। এই টিকার অন্যতম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে আগাম তিন কোটি ডোজ কিনে রেখেছে।
এত দিন অপেক্ষা ছিল যুক্তরাজ্যে এই টিকার অনুমোদনের। গতকাল বুধবার সেই প্রত্যাশিত টিকার অনুমোদন যুক্তরাজ্যে মিলে যাওয়ায় দেশে টিকা আনার ক্ষেত্রে বড় বাধাটি দূর হয়েছে। তবে ছোট বাধা হিসেবে রয়েছে ভারতের সেরামকে দেশটির সরকারের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি। আজ-কালের মধ্যেই ভারতেও অনুমোদন জুটে যেতে পারে। গত রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভারতীয় ওষুধ প্রশাসনের এই টিকা অনুমোদনের বিষয়ে সভা চলছিল। ভারতে অনুমোদনের পরই টিকাটি বাংলাদেশে পাঠানোর কাজ শুরু হবে। এরই মধ্যে এ ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক কার্যক্রম, অর্থ লেনদেনসহ অন্যান্য অপরিহার্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায়। সেরামের কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে টিকা এনে সরবরাহ করার দায়িত্বপ্রাপ্ত বেক্সিমকো ফার্মার পক্ষ থেকে কাজ এগিয়ে রাখা হয়েছে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে দেশেও ঔষধ প্রশাসনের মাধ্যমে অক্সফোর্ডের টিকার অনুমোদন দিতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ভারতে অনুমোদনের পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে পেলেই বৈঠকে বসবে ঔষধ প্রশাসনের নির্দিষ্ট কমিটি। কয়েক দিন ধরেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকসহ অন্যরা বারবার বলে আসছিলেন, জানুয়ারির শেষ দিকে বা ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকেই দেশে অক্সফোর্ডের টিকা চলে আসবে। গতকাল রাজধানীর বিসিপিএস মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু যুক্তরাজ্যে অক্সফোর্ডের টিকার অনুমোদন হয়ে গেছে, ফলে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহের আগেও আমরা টিকা পেয়ে যেতে পারি।
বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাব্বুর রেজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে অনুমোদনের মাধ্যমে আমাদের বড় এক ধাপ অগ্রগতি হয়েছে। এখন ভারতে অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। আমরাও সার্বক্ষণিক সেরামের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ভারতে অনুমোদন হলেই আমাদের সেরামের কাছ থেকে কিছু তথ্য-উপাত্ত পাব, সেগুলো নিয়ে বাংলাদেশের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কাছে জমা দিতে হবে। সে অনুসারে বাংলাদেশের ঔষধ প্রশাসনও একটি বৈঠক করে অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে। অনুমোদন হয়ে গেলেই আর কোনো বাধা নেই। এর পরই কেবল আমদানিপ্রক্রিয়ার পরিবহনকেন্দ্রিক ধাপ। এ জন্য অনেকগুলো কাজই আমরা আমাদের তরফ থেকে এগিয়ে রেখেছি। রাব্বুর রেজা বলেন, ‘আশা করি আমাদের ঔষধ প্রশাসনে খুব একটা দেরি হবে না। এই প্রক্রিয়ায় দেরি হলে টিকা আনাও পিছিয়ে যাবে। আর আমরা দেরি করলে বরং সেটি সেরামের জন্য সুযোগ ঘটবে অন্যদের দিয়ে দেওয়ার। সবাই এখন মুখিয়ে আছে আগে টিকা আদায় করে নেওয়ার জন্য।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (টিকাদান) ডা. সামসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশে সেরাম-বেক্সিমকোর মাধ্যমে টিকা আসবে মোট তিন কোটি, যা দেওয়া যাবে দেড় কোটি মানুষকে। এ ক্ষেত্রে প্রথম লটে আসবে ৫০ লাখ টিকা, যা দেওয়া যাবে ২৫ লাখ মানুষকে। পর্যায়ক্রমে প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে টিকা আসবে। এরই মধ্যে কাদের অগ্রাধিকার দিয়ে টিকা প্রয়োগ করা হবে, সেই পরিকল্পনাও করা হয়েছে। সবার আগে টিকা পাবেন চিকিৎসক ও করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসাকর্মীরা। এর পরে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সম্মুখসারির যোদ্ধারা টিকা পাবেন। ওই কর্মকর্তা জানান, তালিকাভুক্ত প্রত্যেককে দুই ডোজ করে দেওয়া হবে। প্রথম ডোজ দেওয়ার ২৮ দিন পরে আরেক ডোজ দেওয়া হবে। যুক্তরাজ্যে আগামী সোমবার থেকে অক্সফোর্ডের এই টিকা দেওয়া শুরু হবে। দেশটির সরকার এরই মধ্যে ১০ কোটি ডোজ টিকা কিনে নিয়েছে পাঁচ কোটি মানুষের জন্য।
বেক্সিমকো ফার্মার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাব্বুর রেজা বলেন, ‘সেরামের সঙ্গে আমাদের চুক্তি অনুসারে আমাদের দেশে টিকা অনুমোদনের এক মাসের মধ্যেই তারা প্রথম লটের টিকা পাঠাতে হবে। এটা সর্বোচ্চ সময়। তারা যদি সেটা না পারে, তবে আমাদেরকে টাকা ফেরত দেবে। তবে আমরা আশা করছি, আমাদের ঔষধ প্রশাসনে অনুমোদনের পর বড়জোর সপ্তাহ দুই সময় লাগতে পারে টিকা দেশে এনে ঢোকাতে। আর এই টিকা আমাদের দেশে উপযোগী তাপমাত্রায় অর্থাৎ ২ থেকে ৮ ডিগ্রিতেই সংরক্ষণ করা যাবে, যা আমাদের দেশের নরমাল ফ্রিজেও রাখা সম্ভব।
এদিকে যুক্তরাজ্যের দ্য মেডিসিন অ্যান্ড হেলথকেয়ার প্রডাক্টস রেগুলেটরি এজেন্সি (এমএইচআরএ) অক্সফোর্ডের টিকার অনুমোদন দেওয়ায় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে উপাচার্য অধ্যাপক লুসি রিচার্ডসন উল্লেখ করেছেন, ‘এটা ব্রিটিশ বিজ্ঞানের জন্য একটি শুভ দিন। সেই সঙ্গে এই দিনটির মাধ্যমে টিকা দিতে পেরে বহু মানুষের জীবন বাঁচবে।’ এ ছাড়া ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাকসিন গ্রুপের পরিচালক অধ্যাপক অ্যান্ড্রু পোলার্ড গতকাল দিনটিকে ‘নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিনের ল্যান্ডমার্ক’ বলে উল্লেখ করেছেন।

Facebook Comments