১১৮ লাখ কোটি টাকায় ভর করে দিল্লীর সিংহাসনে মোদী

আলোকিত সকাল ডেস্ক

টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বের বৃহত্তম নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নির্বাচনি প্রচারের প্রধান প্রতিশ্রুতিগুলো যদি মোদী অনুসরণ করেন, তাহলে ভারতের অর্থনীতি একটি বড় অগ্রগতির জন্য প্রস্তুত। প্রতিশ্রুতি দিতে মোদীর বিকল্প নেই, নির্বাচনের আগে ভারতের অর্থনীতি নিয়ে যেসব প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে দেয়া হয়েছে, তার আংশিক পূরণ হলেও দেশটির অর্থনীতিতে একটা ভাল প্রবৃদ্ধি আসবে। বিশাল অর্থনীতির দেশটির জন্য আগামী ৫ বছরের মোদী শাসন ভারতের ইতিহাসে বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতে যাচ্ছে, সংসদে এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা মোদী সরকারের নীতিমালা প্রণয়নে বেশ ভূমিকা রাখবে।

ভারতীয় জনতা পার্টি রাস্তা, রেলওয়ে ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ, উৎপাদন বৃদ্ধিতে এবং রপ্তানি দ্বিগুণ করার জন্য কৃষকদের কাছে ১ দশমিক ৪৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১১৮ লাখ কোটি টাকা নগদ হস্তান্তরের অঙ্গীকার করেছে। দীর্ঘ ৬ সপ্তাহব্যাপী নির্বাচনি প্রক্রিয়া শেষে বৃহস্পতিবার (২৩ মে) আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ফলাফল অনুযায়ী মোদী ভার্সন ২.০ ক্ষমতায়। তার প্রতিশ্রিতির মধ্যে মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের কর হার হ্রাস ছিল আর এই প্রতিশ্রুতি ভোটারদের মনযোগ আকর্ষণে সাহায্য করেছিল, যার ফলে বিজেপি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়েছে।

ভারতের অর্থনীতিতে উদ্দীপনার প্রয়োজন। ছায়া ব্যাংকের ঋণ সংকোচনের প্রভাবে ভোক্তা খরচ একটি সংকট হিসাবে দেশটিতে দখল নিয়েছে। বিনিয়োগ কমে গেছে এবং বেসরকারী পরিসংখ্যানে বেকারত্বের হার চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা জানায়, চলতি বছরের শুরু থেকে মার্চ পর্যন্ত, টানা তিন মাস অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে রয়েছে যা ২০১৭ সালের মাঝামাঝি থেকে সবচেয়ে ধীর গতির।

অবিলম্বে জনসাধারণের কাছে প্রতিশ্রুতি দেয়া টাকা পৌঁছে দেয়ার জন্য অর্থের সন্ধান করাই মোদীর জন্য চ্যালেঞ্জ। সরকার ইতোমধ্যেই ২০২০ সালের মার্চের বাজেট পর্যন্ত ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রায় জিডিপি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি করতে চাচ্ছে। তহবিল অধীনে রাজস্ব নিয়ে সরকার আরো ঋণসংগ্রহ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত মূলধন নিষ্কাশন করতে চাইছেন। রাজস্ব ঘাটতিতে আরও বিস্তৃত হলে দেশটির ক্রেডিট রেটিং ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

বৃহস্পতিবার ফিচ রেটিং লিমিটেড জানায়, দেশের দুর্বল সরকারি অর্থনীতির উন্নতি করা নতুন সরকারি প্রশাসনের জন্য অনেক কঠিন হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিজেপির অধীনে আর্থিক একীকরণ স্থগিত করা হয়েছে এবং দলটির প্রচারণায় আয়কে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি তাদের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিবে।

সিঙ্গাপুরের ক্যাপিটাল ইকোনমিক্স লিমিটেডের সিনিয়র ইন্ডিয়ান অর্থনীতিবিদ শিলান শাহ বলেন, ‘আর্থিক সীমার কারণে তাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা বেশ কঠিন হবে। তবে, যদি তারা আংশিকভাবেও তাদের প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করতে পারে তাহলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করবে।

বিজেপি সরকারের ইশতেহারে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটির অবকাঠামোতে ১০০ ট্রিলিয়ন রুপি (১ দশমিক ৪৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। এটি ২০১৯ সালের মার্চের জন্য সড়ক ও রেলপথের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশাল ব্যয় বহন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ

অর্থনীতির ধীর গতি চলছেই এবং বছরের শেষ দিকে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার শুরু হওয়ার আগে আমাদের অনেক আঘাতের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। আমাদের দৃষ্টিতে, বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ে দ্রুত গতিতে পুনরুদ্ধারের পক্ষে সাহায্য করবে। কারণ, আইনের শাসনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ধারাবাহিকতার মাধ্যমে আরো বিদেশী মূলধন প্রবাহ আকর্ষণে সাহায্য করবে।

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অভিষেক গুপ্ত জনান, মোদীর প্রথম মেয়াদের অর্থনৈতিক রেকর্ড সামঞ্জস্যহীন ছিল। তিনি লাল টেপ হ্রাস করেছেন, দেশটির শতাব্দীর পুরনো দেউলিয়া আইনগুলি পুনর্নির্ধারণ করেছিলেন এবং দেশব্যাপী বিক্রয় কর চালু করে বিনিয়োগকারীদের প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু, ২০১৬ সালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন কর ব্যবস্থা চালু এবং উচ্চমূল্যের মুদ্রা নোট নিষিদ্ধ করায় ব্যবসায়িক কার্যকলাপকে ব্যাহত করেছিল, যার প্রভাব আজও অনুভূত হচ্ছে।

মোদির বিজয় নিশ্চিতের পরেই প্রাথমিকভাবে শেয়ারবাজারে যে রমরমা অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের নীতির ধারাবাহিকতা এবং আরও অর্থনৈতিক সংস্কার আশা করা যায়। বৈশ্বিক বাণিজ্যের পশ্চাৎপদ অবস্থার বিরুদ্ধে তাকে লড়াই করতে হবে। ভারতের সবচেয়ে প্রধান আমদানি পণ্য এবং অর্থনৈতিক ঘাটতির মূল চালিকা শক্তি তেলের দামের অস্থিরত্বের সঙ্গেও লড়াই করতে হবে।

তার প্রথম মেয়াদে সরকারের প্রধান ব্যর্থতার মধ্যে একটি ছিল চাকরির অভাব, বিশেষত তরুণদের জন্য। হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি তাদের ইশতেহারে জামানত মুক্ত ঋণের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের উত্সাহিত করা এবং স্টার্ট-আপগুলির জন্য নিয়মকানুন সহজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মোদি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলিতে শেয়ার বিক্রি, এয়ার ইন্ডিয়া লিমিটেডের মতো দেউলিয়াগ্রস্থ ইউনিটগুলিকে বেসরকারীকরণ এবং রাষ্ট্র পরিচালিত ব্যাংকগুলিকে মার্জ করতে পারে। স্থানীয়ভাবে ডিসিনভেস্টমেন্ট হিসাবে উল্লিখিত, এই বিকল্পগুলি সরকারের অর্থ ব্যয় করতে ও রাজস্ব বাড়াতে সাহায্য করবে। রপ্তানিকারকদের জন্য, বিজেপি বাণিজ্য উন্নয়নে এবং অর্থনীতিতে উৎপাদন ভাগ বৃদ্ধি করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে

দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের বৃহত্তর উদ্বেগ মোকাবিলার জন্য সরকারকে জমি কেনা ও লোক নিয়োগ ও ছাটাই করার আইন শিথিল করা উচিত বলে মনে করেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ উপদেষ্টা। বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগে সাম্প্রতিক পতনের পাল্টাতে এমন কিছু উপায় অবলম্বন করতে হবে।

এশিয়া ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং নয়াদিল্লী ভিত্তিক জাতীয় কাউন্সিল অফ ফলিত অর্থনীতির একজন বিশিষ্ট ফেলো রজত নাগ বলেন, ‘ম্যানিফেস্টোগুলি উচ্চাকাঙ্ক্ষী, তবে বৃহদাকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে আমাদের কিছু অর্থনৈতিক সংকটকে বিপন্ন না করেই কঠোর পরিসংখ্যান করা হচ্ছে। বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে বৃহদাকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

আস/এসআইসু

Facebook Comments