হিজড়ারা কি আসলেই মগেরমুল্লুক পেয়েছে?

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সেই লাবণ্যর কথা মনে আছে? ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ ব্লগার ওয়াশিকুরকে হত্যার পর ধাওয়া খেয়ে পালাতে থাকা দুই জঙ্গি আরিফুল ইসলাম ও জিকরুল্লাহকে শুধু দুই হাত দিয়ে আটকে দিয়েছিলেন লাবণ্য হিজড়া। তুমুল আলোচনায় এসেছিলেন লাবণ্য। তবে বছরটির শেষ নাগাদ এই লাবণ্যকেই নিজের নিরাপত্তায় এলাকা ছাড়তে হয়। বর্তমানে তিনি দেশ ছাড়তেই বাধ্য হয়েছেন।

হিজড়াদের বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই। যাত্রীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, নবজাতক ও শিশুদের জিম্মি করে অভিভাবকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা বাগিয়ে নেওয়াসহ অনেক অনেক অভিযোগ। আর এত এত অভিযোগের ভিড়ে লাবণ্যদের কথা চাপা পড়ে যায়। রাস্তাঘাটে হিজড়াদের হাতে প্রায় জিম্মি হয়ে থাকতে বাধ্য হয় বলে মানুষও সহানুভূতিশীল হতে পারছে না। হিজড়া জনগোষ্ঠীরও অনেকে বিশেষ করে যাঁরা কিছুটা শিক্ষিত বা কোনো সম্মানজনক কাজের সঙ্গে যুক্ত তাঁরাও চান না হিজড়ারা মানুষকে জিম্মি করুক। তবে হিজড়ারা বাধ্য হয়েই এ ধরনের কাজ করেন বলেও বলছেন তাঁরা।

আসলেই কি হিজড়ারা বাধ্য হচ্ছেন? গত কয়েক দিন ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বসবাস করা হিজড়া, পুলিশ, হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নে কর্মরত সরকারি ও এনজিও সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা হয়। তবে হিজড়ারাও বুঝতে পারছেন, মানুষকে জিম্মি করার কারণে পুরো কমিউনিটি সম্পর্কেই মানুষের নেতিবাচক ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে, যা মূলত এই জনগোষ্ঠীর জন্যই খারাপ হচ্ছে।

নেতিবাচক কাজের জন্য ১৪ জুন গণমাধ্যমের খবর হন দুই হিজড়া। চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ময়মনসিংহগামী আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেসে ‘বকশিশ’-এর নামে যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা তুলছিলেন বেশ কয়েকজন হিজড়া। মো. জুয়েল ৫ টাকা দিলে হিজড়ারা ১০০ টাকা দিতে বলেন। পাল্টাপাল্টি ঝগড়ার একপর্যায়ে এক হিজড়া ক্ষুব্ধ হয়ে হাতে থাকা চাবির গোছা দিয়ে জুয়েলের মাথায় আঘাত করতে থাকেন। অন্য এক হিজড়া মারতে থাকেন কিলঘুষি। এতে জুয়েলের মাথা ফেটে যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া স্টেশন থেকে ট্রেনটি ছাড়ার পর এ ঘটনা ঘটে। ট্রেনটি ভৈরব স্টেশনে যাত্রাবিরতির সময় ওই দুই হিজড়াকে আটক করে ভৈরব রেলওয়ে পুলিশ। আটক দুই হিজড়া হলেন আঁখি বেগম (২০) ও সুন্দরী বেগম (২০)।

২০১০ সালের ঘটনা। রাজধানীর উত্তরায় বকশিশ না পেয়ে গৃহকর্তার পাঁচ বছরের শিশুকে নিয়ে দৌড় দিয়েছিলেন এক হিজড়া। গৃহকর্তা চিকিৎসক আজগর আলী বাধ্য হয়ে লাইসেন্স করা রিভলবার দিয়ে গুলি ছুড়লে ওই হিজড়াকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। হিজড়ারা ঈদে গৃহকর্তার কাছে চাঁদা দাবি করে না পেয়ে এই কাজ করেছিলেন।

আর এই চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে হিজড়ারা নিজেরা নিজেরাই মারামারি করছেন, খুন হচ্ছেন সে–সংক্রান্ত খবরও গণমাধ্যমে আসছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রাজধানীর খিলক্ষেতে হিজড়া সেলিম ওরফে বৃষ্টি (৫০) হত্যা মামলায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সন্দেহভাজন খুনির মধ্যে জহিরুল ইসলাম ও হিজড়া মল্লিকা খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ঢাকার আদালতে জবানবন্দি দেন। হিজড়া রাসেল ওরফে সজনীসহ (২৪) অন্যদের গ্রেপ্তার করা হয় এ মামলায়।

গত বছর চাঁদার টাকার ভাগ না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে মিরপুরে হিজড়া গুরু কোকিলাকে (৪০) খুন করেন দলের অপর দুজন হিজড়া সদস্য। হিজড়া মমতাজ ঢাকার আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন।

প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা মিরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরিফ হোসেন জানিয়েছিলেন, দলের সদস্যরা চাঁদার টাকা তুলে কোকিলার কাছে রাখতেন। কোকিলা দলের সদস্যদের ঠিকমতো চাঁদার টাকার ভাগ দিতেন না। এ নিয়ে দলের অপর সদস্যদের ক্ষোভ ছিল।

২০১৬ সালে জামালপুরে হায়দার আলী হিজড়া (৪২) হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন আসামিদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন হিজড়া।

হিজড়াদের অপকর্মে পুলিশ এখন পর্যন্ত সে ধরনের কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বলে নজির নেই। একাধিক হিজড়াগুরু এবং দলের সদস্য জানিয়েছেন, এসব চাঁদার ভাগ পায় পুলিশ থেকে শুরু করে রাঘব বোয়ালদের অনেকেই। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ নাকচ করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রথম আলোকে লিখিতভাবে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, হিজড়ারা অপরাধ করলে তাঁদের বিরুদ্ধেও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের কোনো সদস্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের দেওয়া বক্তব্য সঠিক হলে বলাই যায়, ভয়ে ভয়েই হিজড়াদের বিভিন্ন অপকর্ম করতে হচ্ছে। বরং হিজড়া নেত্রীরা বলছেন, হিজড়ারা অপকর্মগুলো করছেন বাধ্য হয়ে। কিন্তু এতে করে সাধারণ মানুষের তো ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা।

রাজধানীসহ সারা দেশেই এলাকা অনুযায়ী, একেক হিজড়ার রাজত্ব চলে, সেই রাজত্বে অন্য হিজড়ারা হানা দেন না। আর যানবাহনের ভেতর, বিভিন্ন সিগন্যালে যাত্রীদের জিম্মি করা তো সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

রাজধানীর মিরপুর থেকে ধানমন্ডিতে বাসে নিয়মিত যাতায়াতকারী মাহবুবা রহমান বললেন, ‘প্রতিদিন বাসে উঠেই আতঙ্কে থাকতে হয়। দল ধরে হিজড়ারা হানা দেয়। টাকা চাইলে ২০ টাকা তো দিতেই হয়। না দিলে গালি দেয়। নিজেদের পরনের কাপড় তুলে বাজে অঙ্গভঙ্গি করে। বাধ্য হই টাকা দিতে। কিন্তু প্রতিদিন ২০ টাকা করে দিতে বাধ্য হই বলে রাগও লাগে। কোনো দিন যদি হিজড়াদের দেখা না পাই তখন শুকরিয়া আদায় করি।’

রাজধানীর উত্তরার এক বাসিন্দা রোকেয়া লিটা আক্ষেপ করে বললেন, ‘বাচ্চা পেটে নিয়ে কষ্ট করলাম, কষ্ট করে বাচ্চা হলো। আর হাসপাতাল থেকে বাচ্চা নিয়ে বাসায় যাওয়ার আগেই বাসায় হানা দিয়ে ৩ হাজার টাকা চাঁদা নিয়ে গেল হিজড়ারা। যাওয়ার সময় অবশ্য একটা কার্ডও দিয়ে গিয়েছিল।’ তিনি জানালেন তাঁর বাচ্চা হওয়ার আগেই তাঁর পাশের বাসায় ঢুকে হিজড়ারা ১০ হাজার টাকা দাবি করে। না দিলে বাচ্চা নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখায়। তারপর ৪ হাজার টাকা দিয়ে রেহাই পায় পরিবারটি। তা দেখে আগে থেকেই আতঙ্কিত এবং বিরক্ত ছিলেন তিনি। পরে মার্চ মাসে মেয়ের জন্মের পর তাঁকেও এ চাঁদা দিতে হয়।

উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরসহ বিভিন্ন এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানালেন, অনেকেই বাচ্চা হওয়ার পরপর হিজড়াদের কল্যাণ সমিতিতে গিয়ে কয়েক হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে রসিদ নিয়ে আসেন। তারপর সেই রসিদ দেখালে অন্য হিজড়ারা আর উৎপাত করে না। রোকেয়া লিটার ভাষায়, ‘এভাবে হিজড়ারা কেন টাকা নেবে? এটা কি মগের মুল্লুক নাকি?

তবে একাধিক হিজড়া বললেন, বাচ্চা নাচানো, বিভিন্ন দোকান থেকে সপ্তাহে একদিন টাকা তোলা হিজড়াদের কালচারের অংশ। আর এই দিয়েই হিজড়াদের জীবন চলে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আক্ষেপ করে বললেন, ‘ছোটবেলায় পরিবার, সমাজ দূর দূর করে তাড়িয়ে দিছে। আমরা তো মানুষ। তিন বেলা খাবার খাইতে হয়। কাপড় পিনতে হয়। কে দিব এই সব? হাত পাতলে কেউ সহজে টাকা দেয় না, তখন একটু–আধটু খারাপ ব্যবহার করতে হয়।’

গৌতম বণিক এখন হয়েছেন অনন্যা বণিক। অনন্যা বলছিলেন, মেয়েদের মতো সাজায় তাঁর জন্য সাইকেলের চেইন দিয়ে পায়ের জন্য বেড়ি বানানো হয়েছিল। শুধু শৌচাগার পর্যন্ত যেতে পারতেন। বাবা মারা গেলে মায়ের সহায়তায় পায়ের বেড়ি খুলে বাড়ি ছেড়েছিলেন।

অনন্যা জানালেন, বেশির ভাগ হিজড়ার জীবনের কাহিনি প্রায় একই রকম। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে পড়াশোনায় ইতি টানতে হয়। হিজড়া দলে নাম লেখাতে হয়। তারপর জীবনের তাগিদেই অনেক ধরনের কাজে জড়িয়ে যেতে হয়।

অনন্যা পরিবারের সঙ্গে থাকা অবস্থাতেই উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পান। তারপর হিজড়াদের নিয়ে কর্মরত এনজিও বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির কাছ থেকে সার্বিক সহায়তা পান। অনন্যা বুলবুল ললিতকলা একাডেমি থেকে নাচের ওপর ডিপ্লোমা করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে নৃত্যশিল্পী হিসেবে অনুষ্ঠান করেছেন। বর্তমানে উত্তরণ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনন্যা অন্য হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন।

কিন্তু এই অনন্যার মতো তো সবাই না। অনন্যার মতো যেসব হিজড়া সমাজে প্রতিষ্ঠিত তাঁরা চান, হিজড়ারা চাঁদাবাজি বন্ধ করুক। সম্মানজনক কাজ করে সমাজে অন্যদের মতোই জীবিকা নির্বাহ করুক।

জামালপুরের আরিফ হয়েছেন আরিফা ইয়াসমিন ময়ূরী। একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ হওয়ার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন তিনিসহ বেশ কয়েকজন হিজড়া। হাটবাজার থেকে টাকা তোলা বা ছল্লা, বাচ্চা নাচিয়ে পয়সা নেওয়াসহ হিজড়াদের আদি পেশাকে অনেক হিজড়া জবরদস্তির পর্যায়ে নিয়ে গেছেন বলে আরিফা নিজেও বিরক্ত।

আরিফা প্রথমবারের মতো ২০১৭ সালে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ‘জয়িতা’ পুরস্কার পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে ৫০ হাজার টাকা ও ক্রেস্ট নিয়েছেন। জামালপুর ‘সিঁড়ি সমাজকল্যাণ সংস্থা’ এবং ‘সিঁড়ি তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন মহিলা সংস্থা’ নামের দুটি সংগঠনে বর্তমানে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। প্রায় ১০০ জন হিজড়া এসব সংগঠনের কর্মকাণ্ডে জড়িত। তবে আরিফার কণ্ঠেও আক্ষেপ, ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে তড়িৎকৌশলে ডিপ্লোমা পাস করার পরও শুধু হিজড়া বলে কোনো চাকরি পাননি তিনি।

অনেক বঞ্চনার মধ্যেও আশার কথা হলো, ২০১৩ সালে নারী-পুরুষের পাশাপাশি হিজড়াদের হিজড়া হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার। ২০১৪ সালে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু তারপর? হিজড়াদের মতে, এই কাগুজে স্বীকৃতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে সহায়তা করছে, কিন্তু জীবন–জীবিকার সংস্থানে তা এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। হিজড়াদের মূল্যায়নেও প্রভাব ফেলেনি। ২০১৭ সাল থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে ১২ জনকে নিয়োগ দিয়েছে। এর বাইরে সরকারি পর্যায়ে কোনো হিজড়া চাকরি পেয়েছেন তার নজির নেই।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে দুজন হিজড়া দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ পেয়েছিলেন। তবে নিয়োগপত্র দেওয়া, চাকরি চূড়ান্ত করাসহ যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল তাঁরা তা পাননি বলে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন বলে জানিয়েছেন দুজনই।

হিজড়া জনগোষ্ঠীর হিসাবে, দেশে হিজড়ার সংখ্যা দেড় থেকে দুই লাখ। তবে সমাজসেবা অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে প্রকৃত হিজড়ার সংখ্যা ১২ হাজার। হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নে সমাজসেবা অধিদপ্তর ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে পাইলট কর্মসূচি চালু করে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ কর্মসূচিতে ৬৪ জেলায় বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ১১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। স্কুলগামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের (জনপ্রতি মাসিক প্রাথমিক ৭০০, মাধ্যমিক ৮০০, উচ্চমাধ্যমিক ১০০০ এবং উচ্চতর ১২০০ টাকা হারে) উপবৃত্তি দিচ্ছে। ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের অক্ষম ও অসচ্ছল হিজড়াদের বিশেষ ভাতা হিসেবে জনপ্রতি মাসিক ৬০০ টাকা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মক্ষম হিজড়াদের প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ শেষে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে।

তবে বেশির ভাগ হিজড়ার অভিযোগ, যাঁরা প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন তাঁদের নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে ১০ হাজার টাকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এই টাকায় এই যুগে কিছু করে খাওয়া কঠিন। টাকার পরিমাণ বাড়ানো এবং প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নের বিষয়টিতে একমত সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক এবং হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার। তাঁর মতে, কর্মক্ষম হিজড়াদের অঞ্চলভিত্তিক কোন কাজের চাহিদা বেশি, সেই কাজ শেখানোর জন্য ৫০ দিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণের সময় তিন বেলা খাবার বাবদ দিনে ৩০০ করে টাকা দেওয়া হচ্ছে। এরপর দেওয়া হচ্ছে ১০ হাজার টাকা। কেউ যদি চান, এ টাকা দিয়ে সৎভাবে জীবিকা নির্বাহ করবেন তা করা সম্ভব। এ ছাড়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের ভবঘুরে কেন্দ্রেও বিনা মূল্যে থাকা–খাওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেখানে হিজড়ারা থাকতে চান না। অথচ হিজড়াদের অনেকেই পথেঘাটে ছিনতাই, চাঁদাবাজি করে একটি চক্র ব্যবসা করছে। এদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। এই কর্মকর্তা ‘নকল’ হিজড়াদের প্রসঙ্গটি আবার সামনে আনলেন।

২০১৩ সালে হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন নীতিমালায় হিজড়াদের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, হিজড়া শব্দের ইংরেজি পরিভাষা হচ্ছে ট্রান্সজেন্ডার। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুসারে, ক্রোমোজমের ত্রুটির কারণে জন্মগত যৌনপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি যাদের দৈহিক বা জেনেটিক কারণে নারী বা পুরুষ কোনো শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় না, সমাজে তাঁরা হিজড়া হিসেবে পরিচিত। নীতিমালা অনুযায়ী, সমাজে যিনি হিজড়া হিসেবে পরিচিত এবং যিনি নিজেকে হিজড়া পরিচয় দিতে ইতস্তত বোধ করেন না তাকে বোঝাবে।

তবে ‘নকল’ হিজড়া চিহ্নিত করার প্রক্রিয়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তরে ১২ জন হিজড়া চাকরির জন্য মনোনয়ন পেয়েও চাকরি পাননি। ২০১৫ সালে ডাক্তারি পরীক্ষায় ঢাকার সিভিল সার্জন অফিস ১২ জনকেই পুরোদস্তুর পুরুষ হিসেবে আখ্যায়িত করে। হিজড়াদের মত ছিল, শুধু যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করেই হিজড়া শনাক্ত করা উচিত নয়। মানসিকভাবে যাঁরা নিজেদের নারী মনে করেন, তাঁরাও এই সম্প্রদায়ভুক্ত। যে চিকিৎসক দল হিজড়াদের পরীক্ষা করেছিল, সেখানে কোনো মনোবিজ্ঞানী ছিলেন না। তারপর এখন পর্যন্ত কোনো হিজড়া এ অধিদপ্তরে কোনো কাজ পাননি।

মনোনয়ন পাওয়া এই ১২ জনের একজন ছিলেন তানিশা ইয়াসমীন চৈতি। তিনি সেই অপমানজনক শারীরিক পরীক্ষার কথা এখন পর্যন্ত ভুলতে পারেননি বলে জানান। ডিগ্রি পাস চৈতি মানবাধিকার কমিশনেও কাজ করেছেন। বললেন, মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের সদিচ্ছার কারণে তাঁদের চাকরি হলেও তা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়নি। বললেন, ‘উত্তরণ ফাউন্ডেশনের সহায়তায় রাজবাড়ীতে এখন নিজে গরুর খামার পরিচালনা করছি। এ খামারে অন্য দুজন হিজড়া কাজ করছে। সব মিলে ভালো আছি।’

হিজড়া হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও এখন পর্যন্ত হিজড়াদের নারী বা পুরুষ হিসেবেই ভোট দিতে হচ্ছে। পাসপোর্ট করতে হচ্ছে।

অনন্যা বণিকের মতে, ‘ভোটার তালিকায় নারী, পুরুষ না “অন্যান্য” যে ঘর তাতে হিজড়া লিখে ভোট দেওয়ার চেয়েও সরকার, সমাজ আমাকে মূল্যায়ন করল কি না, তা–ই বড় বিষয়। সমাজ তো আমাকে মূল্যায়ন করছে না। কাজ না শিখিয়েই বলছে আমি কাজের যোগ্য না। আমাকে কাজ শিখিয়ে উপযুক্ত কাজ দেওয়ার পরও না করলে তখন বলতে পারে। অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার পরই অভ্যাস পরিবর্তনের কথা বলতে পারে।’

আলাপের সময় বিভিন্ন এলাকার হিজড়ারা উত্তরণ ফাউন্ডেশন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের নাম বারবার উচ্চারণ করেছেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি (উপমহাপরিদর্শক) হাবিবুর রহমান বেদে ও হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নে উত্তরণ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৬ সাল থেকে এ ফাউন্ডেশনের আওতায় হিজড়াদের অংশগ্রহণে ঢাকার আশুলিয়াসহ বিভিন্ন জায়গায় উত্তরণ বিউটি পারলার, ডেইরি ফার্ম, ট্রেনিং সেন্টার ও বুটিক হাউস, মিনি গার্মেন্টস, টেইলার্স স্থাপন করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। গত বছর বাংলাদেশের উত্তরণ ফাউন্ডেশন ও ভারতের হাবিব ফাউন্ডেশনের এক চুক্তি অনুযায়ী, বিশ্বখ্যাত হেয়ার এক্সপার্ট জাভেদ হাবিবের তত্ত্বাবধানে হেয়ার ফ্যাশনে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন বাংলাদেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। বর্তমানে দুজন এ প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরেছেন। তবে হিজড়াদের প্রশ্ন হাবিবুর রহমানের মতো কতজন ব্যক্তি হিজড়াদের উন্নয়নে এগিয়ে এসেছেন? লাবণ্যসহ অন্য হিজড়াদের সুরক্ষায় রাষ্ট্র কতটুকু আন্তরিক?

সমাজসেবা অধিদপ্তর, পুলিশ এমনকি হিজড়া জনগোষ্ঠীও হিজড়াদের পুনর্বাসনে পরিবারকে গুরুত্ব দিচ্ছে। শুধু হিজড়া পরিচয় দেওয়ার কারণে পরিবার যদি হিজড়াদের পথে ঠেলে না দিত তাহলে হয়তো অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যেত। এ ছাড়া হিজড়া কমিউনিটিকেও নিজেদের ভালোটুকু বুঝতে হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box