হারিয়ে যাচ্ছে চরমুগরিয়ার বানর

আলোকিত সকাল ডেস্ক

বসবাসের সহায়ক পরিবেশ ও খাদ্যের অভাবে মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী চরমুগরিয়ার বানর হারিয়ে যাচ্ছে। বনজ ও ফলদ গাছ কমে যাওয়া এবং বসতবাড়ি বেড়ে যাওয়ায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। এমনকি বানরের আবাসস্থলের জন্য কুমার নদের তীরে নয়াচর এলাকায় প্রায় ১৮ একর জায়গায় ইকোপার্ক নির্মাণ করা হলেও এখনো বানরগুলোকে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আড়িয়াল খাঁ নদীবেষ্টিত মাদারীপুরের চরমুগরিয়া অঞ্চল বনজ ও ফলদ গাছে পূর্ণ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের আগে এখানে প্রায় ১০ হাজারের মতো বানরের দেখা পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে ছোট-বড় সব মিলিয়ে পাঁচশ থেকে এক হাজার বানর চরমুগরিয়ায় বসবাস করছে বলে অনুমান করছেন স্থানীয়রা। তবে জেলা বনবিভাগের দাবি অনুযায়ী চরমুগরিয়ায় এখনো আড়াই হাজারের মতো বানর আছে।

এলাকাবাসীর ধারণা, মাদারীপুরের কুলপদ্বী, পুরান শহর ও চরমুগরিয়া এলাকায় বানরের বিচরণ বেশি ছিল। আর দেশভাগের আগে এসব অঞ্চলে অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। তারা বানরকে কলা, ফলমূল, মোয়া, মুড়ি, চিড়া খেতে দিত। বন-জঙ্গল ও শত শত গাছ থাকার কারণে বানরগুলো এলাকাজুড়ে বসবাস করত। আগে পুরো চরমুগরিয়ায় বানরের দেখা মিললেও বানরের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বর্তমানে কমিউনিটি সেন্টার, আদমজী পাট কেন্দ্র ও চৌরাস্তার স্বর্ণকারপট্টি এলাকায় দেখা যায়।

সরজমিনে দেখা যায়, চরমুগরিয়ার চৌরাস্তা মোড়ের স্বর্ণকারপট্টির বাড়ির ছাদ, বিদ্যুতের তার ও দোকানঘরের টিনের চালায় বানর বসে আছে। বাচ্চা বানরগুলোকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে বড় বানরগুলো লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। বানরগুলো বাসাবাড়ির উঁচু ছাদের কার্নিশ বেয়ে উপরে উঠছে আবার নিচে নামছে। কখনো খাবারের সন্ধানে দোকানঘরের চালার ওপর বসে থাকছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা পাউরুটি, বিস্কুট, কলা, বাদাম ও মুড়ি ছিটিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। যানবাহন ও মানুষের চলাচলের কারণে বানরগুলো নিচেও নামছে না। লোকশূন্য বুঝেই বানর খাবার খেয়ে গাছ বেয়ে, দেয়াল টপকিয়ে চলে যাচ্ছে। আবার ক্ষুধার জ্বালায় বিভিন্ন স্থানে থাকা অন্য বানরগুলো ধাওয়া দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। খাদ্যের অভাবে বানরগুলো দুর্র্বল হয়ে জীর্ণশীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া বানরগুলো বসতবাড়ি, দোকানঘর ও কারখানার গুদামের বিভিন্ন অংশে বসবাস করছে। ফলে চরমুগরিয়ার স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরে-বাইরে বানরের উৎপাতের শিকার হচ্ছেন। তবে খাবারের ব্যবস্থা হলে বানরের উৎপাত বন্ধ হয়ে যাবে বলেও মনে করেন স্থানীয়রা।

বানরগুলোকে মাদারীপুরের ঐতিহ্য দাবি করে স্বর্ণকারপট্টির একাধিক বাসিন্দা বলেন, গাছপালা না থাকা ও বসতবাড়ির সংখ্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বানরের বসবাসের আগের পরিবেশ নেই। এছাড়া দিনে দিনে চরমুগরিয়ায় বানরের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আর প্রাকৃতিকভাবে খাবারের জোগান কমে যাওয়ায় বানরগুলো দর্শনার্থী ও মানুষের দেওয়া যৎসামান্য খাবার খেয়ে কোনোমতে বেঁচে আছে। এছাড়া খাবার ও আশ্রয়ের জায়গা না পেয়ে বানরগুলো মাদারীপুর শহরসহ বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে। তাই বানরগুলোর পুনর্বাসন করতে দেরি হলে চরমুুগরিয়ায় বানর খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাহিমা আক্তার মুক্তা ঢাকায় বাস করেন। প্রতিবছর পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে মাদারীপুরে আসেন। সন্তানদের বানর দেখাতে নিয়ে আসেন। তিনি বললেন, ১০ বছর আগে দেখেছি চরমুগরিয়ার এলাকাজুড়ে অনেক বানর ছিল। যতদিন যাচ্ছে বানরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এখানে যে বানরগুলো আছে সেগুলো সহায়ক পরিবেশ ও খাদ্যের অভাবে জীর্ণশীর্ণ হয়ে পড়ছে। প্রত্যেক প্রাণীই প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ও বানরগুলোকে টিকিয়ে রাখতে এখনই স্থানীয় ও জেলা প্রশাসনকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ঘরবাড়ি নেই এমন স্থানে বানরগুলোর সংরক্ষণসহ তাদের পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকেও তদারকি প্রয়োজন।

জেলা বনবিভাগ বলছে, চরমুগরিয়া ইকোপার্ক আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মাধ্যমে ইকোপার্কের অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্পূর্ণ আধুনিকায়নসহ বানরের খাবারের উপযোগী এমন গাছ (কাঁঠাল, পেয়ারা, আম ও ডুমুর) রোপণ করা হবে। যাতে করে বানরের খাদ্য সংকটও পূরণ হয়। বনবিভাগের কর্মকর্তার কার্যালয়ে টাঙানো ব্যানার থেকে জানা যায়, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বানরের জন্য বরাদ্দ ছিল ১২ লাখ ১৯ হাজার টাকা। যা ২০১২-১৩ অর্থবছরে নেমে আসে তিন লাখে।

মাদারীপুর জেলা বনবিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাপস কুমার সেনগুপ্ত বলেন, বানরের জন্য বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আবেদন করা হয়েছে। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি, অর্থ বরাদ্দ হলে বানরের খাবার সংকট থাকবে না।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box