হাটভর্তি কোরবানির হাটে পশু, বিক্রি কম

রাজধানীর পশুর হাটে বিক্রেতারা কোরবানির পশুর ইচ্ছামতো দর হাঁকছেন। আকারভেদে ৬০ হাজার থেকে ২৫ লাখ টাকা দাম হাঁকা হচ্ছে একেকটি গরুর। এসব গরুর আবার বিভিন্ন নামও দেওয়া হয়েছে। যেমন টাইগার, কালোহাতি, যুবরাজ প্রভৃতি। পশু ব্যবসায়ীরা বলছেন, আজ শুক্রবার থেকেই জমে উঠবে। ইতিমধ্যে হাটে পর্যাপ্ত পশু আমদানিও হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে গতকাল বৃহস্পতিবার হাটের প্রথম দিনে ক্রেতাদের তেমন দেখা পাওয়া যায়নি। দুপুর পর্যন্ত হাটগুলোতে অল্প কিছু পশু বিক্রি হয়। বিকেলের পর হাটে ক্রেতার সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও বৃষ্টির কারণে তার আর হয়নি। বৃষ্টি নিয়ে বিক্রেতাদের মধ্যে বেশ দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে।

গতকাল রাজধানীর গাবতলী হাট ঘুরে দেখা যায়, এখানে বিপুলসংখ্যক পশুর আমদানি হয়েছে। দেশি বিভিন্ন জাতের পাশাপাশি নেপালি, ভারতীয়, অস্ট্রেলিয়ান,  ভুটানি গরুর প্রচুর সমারোহ। উট-দুম্বাও আছে অনেক।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার মথুরাপুর গ্রাম থেকে ১৮টি গরু এনে গাবতলী হাটে তুলেছেন শফিকুল ইসলাম। এর মধ্যে দুটি নেপালি ও সংকর প্রজাতির গরুর তিনি দাম হাঁকছেন সাড়ে ৩ লাখ টাকা করে। একেকটি গরুর ওজন হবে ছয় থেকে সাত মণ। তিনি বলেন, পশুখাদ্যের দাম খুব বেশি হওয়ায় গরুর দামও বেড়েছে।

মাসুদ নামের একজন বিক্রেতা একটি ব্রাহাম জাতের গরুর দাম চাচ্ছেন ৮ লাখ টাকা। কালো-সাদা রঙের দৃষ্টিনন্দন গরুটির ওজন প্রায় ১২ মণ হবে বলে তিনি জানান।

মাসুদ জানান, দু’বছর আগে ৫০ হাজার টাকায় একটি বাছুর কিনে নিজের বাড়িতে লালনপালন করেন তিনি। একে বাইরে থেকে কেনা কোনো খাবার খাওয়াননি। অনেকে কৃত্রিম উপায়ে গরু মোটাতাজা করে। বাজারের খাবার খাওয়ায়। তিনি সেটা করেননি। এ কারণে ১২ ঘণ্টা ট্রাকে ভ্রমণ করার পরও তার গরুটি তরতাজাই আছে। ফিড খাওয়ানো গরু হলে এত ধকল সইতে পারত না।

কুষ্টিয়ার রামকৃষ্ণপুরের বাসিন্দা পশু ব্যবসায়ী তোফাজ্জল বলেন, তিনি ফ্রিজিয়াম জাতের দুটি গরু বসিলা হাটে তুলেছেন। দুটোয় আট মণ মাংস হবে। প্রতিটির এক দাম ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, তারা কয়েকজন মিলে একটি ট্রাকে গরু হাটে এনেছেন। ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে ট্রাক ভাড়া। এ ছাড়া পথে কিছু খরচ আছে। ট্রাকচালকের বকশিশ আছে। পাশাপাশি গরু লালনপালন করার যে খরচ তাতে কম দামে এবার কেউ পশু বিক্রি করতে পারবে না। তিনি বলেন, আরও অনেকে পশু নিয়ে আসছেন।

গাবতলী পশুহাটে সবার নজর কাড়ছে কালোহাতি নামের একটি গরু। ওজন প্রায় ৪১ মণ দাবি করে গরুটির দাম হাঁকা হচ্ছে ২৫ লাখ টাকা। কালো রঙের গরুটি হাটে তুলেছেন জামালপুরের বজ্রাপুর গ্রামের বাসিন্দা শামসুল হক। তিনি বলেন, গরুটি দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা রাখাল গরুটিকে হাঁটানোর জন্য নিয়ে বের হলে সবাই কালোহাতি বের হয়েছে বলে উল্লেখ করত। এ জন্যই নাম কালোহাতি হয়ে গেছে। তিনি জানান, কালোহাতির বয়স সাড়ে তিন বছর। ছয়টি দাঁত হয়েছে। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে এটি লালনপালন করা হয়েছে। প্রতিদিন এটির খাবারের পেছনে ব্যয় হয় অন্তত ৫০০ টাকা। খাবার হিসেবে দেওয়া হয় খড়, ঘাস, গমের ভুসি, চালের গুঁড়া, ভুট্টার গুঁড়াসহ নানা পদ। ইতিমধ্যে একজন ১০ লাখ টাকা দাম বলেছেন জানিয়ে শামসুল হক বলেন, ১৮-২০ লাখ টাকা হলে বিক্রি করবেন।

গাবতলী হাটের স্থায়ী গরু ব্যাপারী আলফাজ হোসেন বলেন, প্রথম দিকে ক্রেতা থাকে না। পশু বিক্রেতারা ইচ্ছামতো দর হাঁকেন। বেচাবিক্রি শুরু হলে বোঝা যাবে কোন পশু কেমন দামে বিক্রি হয়।

গাবতলী হাট পরিচালনা কমিটির সদস্য সানোয়ার হোসেন বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার দু-একটি পশু বিক্রি হয়েছে। সেগুলো বড় আকৃতির নয়। এগুলো বাজার দামেই বিক্রি হয়েছে। শুক্রবার থেকে বোঝা যাবে দাম কেমন হয়। তবে এবার ডেঙ্গু নিয়ে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে কোরবানির দিকে মানুষের নজর কম। কাজেই পশুর দাম কমতে পারে।

কমলাপুরে হাটেও ক্রেতা কম : গতকাল কমলাপুর হাট ঘুরে দেখা যায়, নির্ধারিত জায়গা ছাড়িয়ে হাট ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের সড়কগুলোতে। গত মঙ্গলবার থেকেই কমলাপুর-গোপীবাগ-মানিকনগরের রাস্তাগুলো হাটের রূপ নিতে শুরু করেছে। মূল মাঠের চৌহদ্দি পেরিয়ে রাস্তার দু’পাশজুড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী এই পশুহাট। ফুটপাত ঘেঁষে বাঁশের বেষ্টনী দিয়ে পশু বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফুটপাতে পশুর খাবার ও বিক্রেতাদের বসার স্থান বানানো হয়েছে। বৃষ্টি ও রোদ থেকে বাঁচতে মাথার ওপর দেওয়া হয়েছে ত্রিপল বা পলিথিনের ছাউনি।

গতকাল সকাল থেকেই ছিল বৃষ্টি। থেমে থেমে দিনভর শ্রাবণের বাদল ঝরেছে। বৃষ্টিতে গরু ব্যাপারীদের মুখে চিন্তার ভাঁজ দেখা গেছে। তারা জানিয়েছেন, এভাবে বৃষ্টি হতে থাকলে কোরবানির পশুগুলো ভিজে অসুস্থ হয়ে পড়বে। ক্রেতাদের আগমনও কম হবে। বেচাকেনায় সমস্যা হবে।

গোপীবাগ বালুর মাঠ ও কমলাপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন বিশ্বরোডের সড়কগুলোও নানা আকারের কোরবানির পশুতে ভরে গেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই গরু। তবে অন্য পশুরও দেখা মিলেছে। একের পর এক ট্রাক আসছে গরু ও ছাগল নিয়ে। গরুর পাইকার, ক্রেতাদের উদ্দেশে মাইকে হাটের নানা সুযোগ-সুবিধা, সতর্কতার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য পুলিশ, আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। রয়েছে ইজারাদারদের নিজস্ব লোকজনও।

আগ্রহী অনেকেই গরুর দরদাম করছেন। তবে ক্রেতার সংখ্যা ছিল কম। মুগদা থেকে আসা রইস উদ্দিন একটি লাল রঙের মাঝারি আকারের গরুর দাম জানতে চাইলেন। জামালপুর থেকে আসা গরুর ব্যাপারী সবুর হোসেন দাম হাঁকালেন এক লাখ ১০ হাজার টাকা। রইস বললেন এত দাম কেন। গতবার এর চেয়ে দ্বিগুণ আকারের গরু এক লাখ টাকার কমে কিনেছেন। এবার সবাই দাম বেশি চাচ্ছে। তিনি ৬০ হাজার টাকা দাম বললে বিক্রেতা তাতে রাজি না হওয়ায় পাশের আরেক ব্যাপারীর গরু দরদাম করতে চলে গেলেন। তার সঙ্গে আসা চাচাতো ভাই মকবুল বললেন, এবার তুলনামূলক দাম বেশি মনে হচ্ছে। তবে এখনও ঈদের চার দিন বাকি। দাম হয়তো কমতে পারে। একটু দেখেশুনে কিনতে চান তারা। হয়তো কালপরশু গরু কিনবেন। তবে আগেই বাজার যাচাই করে রাখছেন।

কমলাপুর রোডে ১০টি গরু নিয়ে বসেছেন পাবনা থেকে আসা রবিউল। তিনি জানালেন, বুধবার এসেছেন। হাটের ভেতরে জায়গা মেলেনি। রাস্তায় স্থান পেয়েছেন। এখন তেমন ক্রেতা মিলছে না। আজ থেকে হাট জমবে বলে আশা করছেন তিনি।

পশুর দরদাম : কয়েকটি পশুহাট ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে ছোট আকারের গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। মাঝারি আকারের গরু ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা এবং বড় গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। এর চেয়ে বড় কিছু গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে আরও অনেক বেশি টাকা। ছোট আকারের মহিষের দাম চাওয়া হচ্ছে ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। মাঝারি আকারের মহিষের দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা। বড় মহিষ আড়াই লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা। ছোট খাসির দাম চাওয়া হচ্ছে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা। মাঝারি আকারের খাসি ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং বড় খাসির দাম চাওয়া হচ্ছে আরও অনেক বেশি।

গাবতলী হাটে কিছু দুম্বা ও উটও দেখা গেছে। উটের দাম চাওয়া হচ্ছে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা। দুম্বাগুলোর দাম চাওয়া হচ্ছে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা। গত কয়েকদিন রাজধানীর একাধিক পশুহাট ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে ছোট আকারের গরু বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়। মাঝারি আকারের গরু বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা এবং বড় গরু বিক্রি হচ্ছে ৯৫ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। তবে ২ লাখ, ৩ লাখ এবং সাড়ে ৩ লাখ টাকায়ও কিছু গরু বিক্রি হচ্ছে।

এখানে ছোট আকারের মহিষ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। মাঝারি আকারের মহিষ বিক্রি হচ্ছে ৮৫ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় এবং বড় মহিষ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ থেকে ৩ লাখ টাকায়। বর্তমান বাজারে ছোট খাসি বিক্রি হচ্ছে ৬ থেকে ১০ হাজার টাকায়। মাঝারি আকারের খাসি বিক্রি হচ্ছে ১১ থেকে ২০ হাজার টাকায় এবং বড় খাসি বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায়।

Facebook Comments