হাওরবাসীর কান্না কেউ শোনে না

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সুনামগঞ্জের কৃষকেরা ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করতে না পারায় হাওরের কৃষক পরিবারগুলোতে ঈদ-আনন্দ মøান হয়ে গেছে। বিগত বছরগুলোতে ঈদ আসার অন্তত দশ দিন আগেই ঘরে ঘরে জানান দিতো খুশির বারতা। এবার সারা বছরে একটি মাত্র বোরো ফসল কোনো রকম কাটার পর উঠান থেকেই অনেক কৃষক ঋণ পরিশোধে কম মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছেন ধান। ঘরে যে ধান আছে তাও তারা ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারছেন না। তাদের অভিযোগÑ সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কান্না শোনার কেউ নেই। সীমাহীন বৈষম্য আর উন্নয়ন বঞ্চিত এ অঞ্চলের মানুষগুলো ডুবে আছে অন্ধকারে।

জেলার জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, তাহিরপুর, দিরাই, শাল্লা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জসহ ১১ উপজেলায় সাড়ে তিন লাখ কৃষকের ভাগ্য বদলায়নি আজো। প্রতি বছরই এমন অবস্থায় কৃষকের কান্না কেউ শোনে না। এর কোনো প্রতিকারের যেন ব্যবস্থা নেই। সরকার চাল না কিনে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার দাবিতে জেলাজুড়ে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন করেছে। কৃষক সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে না পেরে অনেক কম দামে ফড়িয়াদের কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

সারা বছরের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে দাদন ও মহাজনী ঋণ করে জমি চাষ করলেও বৈশাখে ধান কাটার শুরুতেই বহু কৃষক উঠান থেকেই প্রতি মণ ধান ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি করে দিয়েছেন। সুনামগঞ্জে এবার বোরো ধানের চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ১৭ হাজার ৪৩৫ হেক্টর। আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৪০ হেক্টর। ধান উৎপাদন হয়েছে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টন। সরকার এ জেলার কৃষকদের কাছ থেকে ৬,৫০৮ টন ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জেলার ৩০০ অটো রাইস মিলারের কাছ থেকে ১৭ হাজার ৭৯৮ টন আতপ ও ১৪ হাজার ১৭৮ টন সেদ্ধ চাল কিনবে।
২০১৩-১৪ সালের হিসাব মতে, সুনামগঞ্জের সাড়ে তিন লাখ কৃষকের কাছ থেকে সরকার ধান কিনলে প্রতি কৃষক ১৮.৫৯ কেজি ধান বিক্রি করতে পারবেন। এ অবস্থায় জেলা ধান ক্রয় কমিটি কেবল প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে ১২ হাজার প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে তারা ধান কিনবে। এসব কৃষক বাছাইয়ের জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি ও উপজেলা খাদ্যকর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করে কমিটি হলেও কোনো উপজেলায়ই মঙ্গলবার পর্যন্ত কৃষকদের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত হয়নি। এজন্য ধান কেনাও চলছে ঢিমেতালে।
জেলার জামালগঞ্জে ধান-চাল ক্রয় অভিযানের উদ্বোধন হয়েছে গত ২১ মে। কিন্তু সোমবার পর্যন্ত কেবল উপজেলার সদর ইউনিয়নের কৃষকের তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে। উপজেলা গুদাম কর্মকর্তা সালেহ আহমদ দাবি করেছেন, অন্য ইউনিয়গুলোর চূড়ান্ত কৃষক তালিকা তৈরির কাজও শেষ পর্যায়ে, দুই-এক দিনের মধ্যেই হয়তো তালিকা চূড়ান্ত হবে। এ উপজেলায় প্রান্তিক, ভূমিহীন ও মহিলা কৃষকসহ ১২ শ’ কৃষকের কাছ থেকে ৭১৫ টন ধান কেনা হবে। সোমবার পর্যন্ত কেবল সদর ইউনিয়নের কৃষকদের কাছ থেকে ৫ টন ধান কেনা হয়েছে।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় সোমবার ধান কেনা উদ্বোধন হয়েছে। এ উপজেলায় ৬৬৬ জন কৃষকের কাছ থেকে ৩৩৩ টন ধান কেনা হবে। কৃষকদের চূড়ান্ত তালিকা এখনো হয়নি জানিয়ে উপজেলা খাদ্যকর্মকর্তা রূপক রঞ্জন তালুকদার বলেন, পাঁচ ইউনিয়নের মধ্যে কেবল সলুকাবাদ ইউনিয়নের তালিকা চূড়ান্ত করে সোমবার দুইজন কৃষকের কাছ থেকে দুই টন ধান কেনা হয়েছে।

শাল্লা উপজেলায় সোমবার বিকেলে ১৬০০ প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে ৬৩৮ জন কৃষক বাছাই করার জন্য লটারি হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা। এ উপজেলায় ৬৩৮ টন ধান কেনা হবে। সদর উপজেলায় এক সপ্তাহ আগে ধান কেনার উদ্বোধন হলেও সোমবার পর্যন্ত ধান কেনা হয়েছে ৫ টন। এ উপজেলায় কৃষকতালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দিরাই উপজেলায় ৯টি ইউনিয়ন ও এক পৌরসভার মধ্যে কেবল করিমপুর ইউনিয়নের কৃষকতালিকা চূড়ান্ত হয়েছে। বাকিগুলোর তালিকাও চূড়ান্ত হয়েছে দাবি করে উপজেলা গুদাম কর্মকর্তা আব্দুস সামাদ বলেন, তালিকা প্রিন্ট করা শেষ হলেই দেয়ালে টাঙানো হবে। সবাই তালিকা দেখতে পারবেন। এ উপজেলায় ৮৩৯ কৃষকের কাছ থেকে এক টন করে ৮৩৯ টন ধান নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও ধান কেনার জন্য কৃষক তালিকা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জামালগঞ্জের কৃষক তোফায়েল আলম জানান, ধান কাটার শ্রমিকদের মজুরি দিতে তার অর্ধেক ধান চলে গেছে। যে ধান গোলায় আছে তা দিয়ে সারা বছরের খরচ চলবে না। ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় ছেলেমেয়ের জামা-কাপড় কেনায় হিমশিম খাবেন।

কৃষক অজিজুর রহমান বলেন, ধান যতটুকুই কাটছি, কিন্তু তা তো সরকারি গুদামে ধান দিতে পারছি না। ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতাছি। এখন সরকারের গুদামে ধান দিতে পারলে ঈদের আনন্দের ভাগ পেতাম। কৃষক আমিরুল বলেন, ১০৪০ টাকা মণ ধানের সরকারি দাম, আমরা দুই মণ ধান বিক্রি করেও ১০৪০ টাকা পাইনি।

জেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মোস্তাফা বলেন, ঈদের আগেই যেসব এলাকার তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে সেখানকার কৃষকের ধান কেনা হবে। শুক্র, শনি, ররি ও সোমবার ধান কেনা হবে। ঈদের পরে পুরোদমে ধান কেনা শুরু হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments