হতাশা কাটছে না বিএনপিতে

আলোকিত সকাল ডেস্ক

দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ফের ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের হতাশা যেন কাটছে না। তাছাড়া দলের সাম্প্রতিক বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকা- নিয়েও সমালোচনামুখর সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে শীর্ষ নেতাদের মাঝে সন্দেহ-অবিশ্বাস অব্যাহত রয়েছে। তবে এ পরিস্থিতি উত্তরণে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে জোর চেষ্টা চালা”েচ্ছন বলে জানা গেছে। সূত্রমতে, দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধৈর্য সহকারে সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আহবান জানিয়েছেন তিনি।

নেতাকর্মীদের হতাশার কথা প্রকাশ করে গেল বুধবার দলীয় এক ইফতার অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের অনেকে আজ হতাশায় ভুগছেন। আমি মনে করি, হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। হতাশা কখনও আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাবে না। সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে বাধাবিপত্তিকে অতিক্রম করে আমাদের শিরদাঁড়া সোজা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতা আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, বিএনপির ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরাও অনেকটা অনিশ্চিত। শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অনেকটা সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি

নিয়েও নেতাকর্মীরা হতাশায় আছেন। আগামীতে বিএনপি কী ধরনের কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাবে তা সবার অজানা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সূত্রমতে, দুর্নীতির দুই মামলায় দ-প্রাপ্ত হয়ে প্রায় দেড় বছর ধরে কারাবন্দি আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আইনগত মোকাবিলা বা বিচ্ছিন্ন আন্দোলন-কোনোভাবেই তাকে মুক্ত করতে পারেনি দলটি। এতে সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের মাঝে বেশ হতাশা সৃষ্টি হয়। এদিকে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েও তাতে ভরাডুবিতে এ হতাশা আরও বেড়ে যায়। পরবর্তীকালে ভোট ডাকাতির অভিযোগে ওই নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান এবং বিজয়ী এমপিদের শপথ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েও শেষ মুহূর্তে তা পরিবর্তন করে সংসদে যোগ দেওয়া নিয়ে দলটিতে সন্দেহ-অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদেরও অন্ধকারে রেখে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাদে অন্যদের শপথগ্রহণ এবং সম্প্রতি ফখরুলের শূন্য আসনে উপনির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েও দলটিতে তীব্র সমালোচনা চলছে। এই ইস্যুতে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যরা অঘোষিতভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে। এজন্য দীর্ঘদিন ধরে এ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এ অবস্থায় কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে তাঁতী দল আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বিএনপির এমপিদের শপথ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারি চাপের চেয়ে লোভ বেশি ছিল। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সংসদে যাব না। কিন্তু সংসদে গেলাম। এখানেই তো বুঝতে হবে আমাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রবণতা আছে। আমরা অবাধ্যকে বাধ্য করতে পারি না। কারণ তাদের দলের প্রতি ও রাজনীতির প্রতি অঙ্গীকার নেই। এই পাঁচজন অবাধ্য এমপিকে যদি আমরা বাধ্য করতে পারতাম তাহলে আজকে আমাদের দুঃখ থাকত না। এরা কি একটা দিনের জন্য বলেছে যে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্ত না হলে সংসদে যাব না? তার মানে তাদের সংসদে যাওয়াটা জরুরি, বেগম জিয়ার মুক্তিটা কিন্তু জরুরি না।

গয়েশ্বর আরও বলেন, আমরা কমিটি করি। কিন্তু কেউ সংগঠন করি না। কমিটিতে যখন যুগ্ম-আহ্বায়কের সংখ্যা বেশি এবং সদস্য সচিব থাকে তখনই বুঝতে হবে কেউ কাউকে মানে না। তার মানে অঙ্গীকারের অভাব। সংগঠনের চেয়ে নিজেকে সবাই বড় মাপের দেখতে চায়।

এর আগে গেল বুধবার জিয়াউর রহমানের ৩৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, নির্বাচনের পর দলীয়ভাবে আমরা ফল প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। সংসদকে অনির্বাচিত, অবৈধ সংসদ হিসেবে অভিহিত করেছিলাম। সে কারণে আমরা এ সরকারের অধীনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিনি। যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন (প্রায় ২১০ জন), তাদের বহিষ্কার করেছিলাম। কিন্তু হুট করে শপথ নিয়ে সংসদে যাওয়ায় আমাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এই বিভ্রান্তি দূর করতে হবে। বিভ্রান্তি দূর করার জন্য সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধিসহ জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা ডেকে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে আমাদের ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে হবে।

এদিকে দলের বর্তমান পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বন্দুকের নলের মুখে ক্ষমতায় চেপে থাকা আওয়ামী লীগ অত্যন্ত সচেতন ও সুচতুরভাবে নীলনকশা অনুযায়ী বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করছে। এমন দুঃসহ প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বিএনপি তার সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। নেতাকর্মীরা সব নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করার পরেও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে। বিএনপি ধাবিত হচ্ছে তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে।

তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সুপরিকল্পিত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তে দল পরিচালনা করছেন। তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর করা হচ্ছে। তারেক রহমান বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনগুলোর সর্বস্তরের নেতাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা বলছেন। জেলা নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। তাদের যৌক্তিক পরামর্শ গ্রহণ করে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় কমিটিগুলো গঠনতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পুনর্গঠন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করছেন। সারাদেশে কাউন্সিল হচ্ছে। তারেক রহমানের সুনিপুণ নির্দেশনায় সারা দেশে সাংগঠনিক কর্মকা-ে এসেছে নতুন গতি। প্রাণাবেগে উজ্জীবিত হয়ে উঠছেন নেতাকর্মীরা। দলে সৃষ্টি হচ্ছে ইস্পাতকঠিন সুদৃঢ় ঐক্য। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে প্রস্তুত হচ্ছেন সর্বস্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থক।

রিজভী জানান, এই মুহূর্তে দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধৈর্য সহকারে সব পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যারা জিয়াউর রহমানকে ভালোবাসেন, খালেদা জিয়াকে ভালোবাসেন, তারেক রহমানের জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো যাবে না। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ইস্পাতকঠিন ঐক্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments