হতশ্রী ফিল্ডিংয়ের হতাশা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ডেভ হোয়াটমোর বদরাগী ছিলেন, চাঁছাছোলা কথা বলতেন জেমি সিডন্স। আর চন্দিকা হাতুরাসিংহে রাগলে তো সিঁটিয়ে যেত পুরো ড্রেসিংরুম। এ শ্রীলঙ্কান নাকি সম্ভাব্য সংঘাতে এতটাই আটঘাট বেঁধে নামতেন যে, বাঘা বাঘা ক্রিকেটারও গুটিয়ে নিতেন নিজেকে!

এখন নাকি তাঁরাই ফ্রন্টফুটে খেলছেন! কার্যত আক্রমণে যাওয়ারও প্রয়োজন পড়ছে না। যুদ্ধ করারই যে কেউ নেই! বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুমে বরাবরই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বিদেশি হেড কোচ। কিন্তু এ পদে এখন আসীন স্টিভ রোডসের মডেলটাই ভিন্ন। প্রচণ্ড পরশ্রমী, পেছনে কথা চালাচালি করেন না। তবে সামনেও নাকি কথাটথা বিশেষ বলেন না রোডস। রাগ হন না, নিপাট ইংরেজ ভদ্রলোক তিনি। প্রধান কোচ যখন ভদ্রতার ‘মাইলফলক’, তখন কোচিং স্টাফে তাঁর সহকারীদের অবস্থা অনুমেয়। মোট কথা স্টিভ রোডসের নেতৃত্বে এক ঝাঁক বিদেশি ভদ্রলোকের সমাবেশ ঘটেছে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে!

সুখী পরিবারে যেমন হয় আরকি, কারো কোনো অভিযোগ নেই। বরং কোচিং স্টাফদের প্রসঙ্গ এলে প্রশংসায় ভাসিয়ে দেন ক্রিকেটাররা। খেলোয়াড়রা প্রশংসা করলেই চুক্তি নবায়ন নিশ্চিত হয়ে যায় বিদেশি কোচিং স্টাফদের। কোচিং স্টাফের সদস্যরাও ভীষণ সতর্ক খেলোয়াড়দের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে। একজনের গদগদ ভাব দেখে তো মনে হয় তিনি শিক্ষক নন, ক্রিকেটারদের একনিষ্ঠ অনুসারী!

টিভি সম্প্রচার এখন অত্যাধুনিক হওয়ায় কিছু দৃশ্য এখন ফ্রেমে নিয়মিত। বোলিং কিংবা ব্যাটিং ভালো হলে টিভি পর্দায় ভেসে ওঠে বোলিং কিংবা ব্যাটিং কোচের ছবি। বাংলাদেশ দলের কোচিং স্টাফের এক সদস্য যেমন তাঁর সরাসরি শিষ্য যারা, তারা ভালো করতে থাকলেই ভিউয়িং এরিয়া ছেড়ে ডাগ আউট এসে বসেন! তবে প্রতিটি দিন তো আর ভালো যায় না। আর যেদিনটা খারাপ যায়, সেদিন ম্যাচ টিভি ক্যামেরা থেকে আড়াল নিতে ড্রেসিংরুমেই বন্দি রাখেন নিজেকে!

রায়ান কুকের আচরণে অবশ্য ‘শো-অফ’ করার কোনো প্রবণতা নেই। কার্ডিফে কাল স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে চোখ রেখেও দক্ষিণ আফ্রিকার এ তরুণকে নজরে পড়েনি। অবশ্য রায়ান প্রচারমুখী নন মোটেও। বরং মিডিয়ার সামনে আসতে চান না বলেই জেনেছি। তবু একঝলক দেখার ইচ্ছা ছিল এটা বোঝার জন্য যে আউটফিল্ডে শিষ্যদের শিশুতোষ ভুলগুলো তাঁর ওপর কতটা প্রভাব ফেলেছে, সেটি অনুমানের জন্য।

রায়ান কুকও ভদ্রলোক। তবে ক্রিকেটারদের ভজিয়ে চাকরি টিকিয়ে রাখার লোক নন তিনি। গত বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরকালে তাঁর অধীন মাশরাফি বিন মর্তুজাদের ফিল্ডিং প্রস্তুতির ছবিগুলো এখনো চোখে ভাসে। নেটে যাওয়া-আসার পথে সবাইকে ক্যাচিং অনুশীলন করাচ্ছেন কুক, ক্লান্তিহীন। আজকাল বাউন্ডারি লাইনের ওপর যে রিলে ক্যাচ দেখা যায়, সেসবেরও প্র্যাকটিস করিয়েছেন। গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ের নতুন ড্রিল—সবই সেই থেকে করিয়ে আসছেন রায়ান কুক।

তবু গতকাল বাংলাদেশি ফিল্ডারদের হাত-পা গলে বল বেরিয়ে গেছে। অঙ্কে ফেল করা ছাত্রের কারণে শিক্ষকের তো কিছু লজ্জা লাগেই। একের পর এক মিস ফিল্ডিংয়ের পর রেডিওতে বিবিসির ধারাভাষ্যকার যে রসিকতা করছিলেন, সেগুলো কুকের হৃদয় বিদীর্ণ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট! আইসিসির ফ্র্যাঞ্চাইজি স্টোরগুলো এবার ইয়ার প্লাগ আকৃতির রেডিও পাওয়া যাচ্ছে, যেটা কানে দিলেই বিবিসির ধারাভাষ্য শোনা যায়। অবশ্য ড্রেসিংরুমে টিভি থাকে, মোহাম্মদ মিঠুন- মোসাদ্দেক হোসেনদের নিয়ে ভাষ্যকারদের শ্লেষ মেশানো মন্তব্য কুকের কানেও গিয়ে থাকতে পারে।

তবে এই যে ফিল্ডিংয়ে একমাত্র আফগানিস্তান-পাকিস্তান ছাড়া বাকিদের চেয়ে পিছিয়ে আছে, তার সব দায় কি রায়ান কুকের? মোটেও নয়। তিনি যে ফাঁকিবাজ নন তার প্রমাণ হলো, প্রয়োজনে থ্রো ডাউনও করেন। ফিল্ডিং অনুশীলন করানো তো তাঁর নিয়মিত কাজই।

এরপরও ক্যাচ পড়ে। ক্যাচ পড়াটা অবশ্য ক্রিকেটীয় অনিশ্চয়তারই প্রতিচ্ছবি যেন। কিন্তু গ্রাউন্ড ফিল্ডিং কেন ভালো হবে না? ব্যাটিং-বোলিংয়ের তুলনায় ফিল্ডিংটা দ্রুততম সময়ে রপ্ত হওয়ার কথা। উন্নতি যে হয়নি তা নয়, তবে উঁচুমানের ফিল্ডিং দল এখনো হয়ে ওঠা হয়নি বাংলাদেশের। গতকাল তো হাসাহাসিই হয়েছে বাংলাদেশের ফিল্ডিং নিয়ে! অনায়াসে ডাবলস নিয়েছেন জেসন রয়-জনি বেয়ারস্টোরা। অকারণ ওভার থ্রো হয়েছে, শরীরের নিচে দিয়েও বল গেছে। রান আউটের সম্ভাবনা ছিল এমন পরিস্থিতিতে ভুল প্রান্তে বল ছুড়েছেন ফিল্ডার।

চাপে ফিল্ডিংয়ে গোলমাল হয় কখনো কখনো। প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যান দাবড়ে বেড়ালে কাঁধ ঝুলে পড়ে যে! কাল সেই হতাশা ছিল বটে, তবু গ্রাউন্ড ফিল্ডিং নিয়ে বাংলাদেশের পুরনো দুর্বলতা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। দলে একাধিক ফিল্ডার আছেন, যাঁদের মাঠে ‘আড়াল’ নিতে হয়। এমন জায়গা খুঁজতে হয়, যেখানে বল কম আসবে! কারো চোট, কারোর আবার ‘অ্যান্টিসিপেশন’ ক্ষমতাই নেই। রায়ান কুক কেন, বিশ্বসেরা ফিল্ডিং কোচও এসব সমস্যার কতটা দূর করতে পারবেন, তা নিয়ে সংশয় আছে।

তাই বাংলাদেশের ফিল্ডিং কোচের পজিশন সর্বদাই স্লিপে, যেখানে কেউ নাকি দাঁড়াতে চান না! বাংলাদেশ দলের স্পেশালিস্ট স্লিপ ফিল্ডার কে, কেউ জানে না। অতীতের এবং বর্তমানের কোনো ফিল্ডিং কোচই একজন স্পিপ ফিল্ডার তৈরি করতে পারেননি নাকি কেউ রাজিই হননি—এ প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে মাশরাফিদের ফিল্ডিং সমস্যা। ইংল্যান্ডের ৩৮৬ রানের পাহাড় টপকানোর উপায়ও হয়তো একদিন খুঁজে বের করে ফেলবেন সাকিব আল হাসানরা। কিন্তু ফিল্ডিংয়ের হতাশা থেকে সহসা মুক্তির উপায় নেই।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box