স্থায়ী কার্যালয় চান শেখ হাসিনা সাড়া নেই তৃণমূলে

আলোকিত সকাল ডেস্ক

টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতাসীন হলেও তৃণমূলে স্বস্তিতে নেই আওয়ামী লীগ। দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা মধ্যে বিভেদ বিরাজমান। অধিকাংশ উপজেলা, গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ও ইউনিয়নপর্যায়ে নেই দলের নিজস্ব কার্যলয়।

দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় ভাড়া অফিসে। অনেক স্থানে স্থানীয় সাংসদ বা নেতাদের বাসাতেও চলে দলীয় কার্যক্রম। এ কারণে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক সংগঠনটি তৃণমূল শক্ত ভিত পাচ্ছে না।

তথ্য মতে, তৃণমূলে দলের স্থায়ী কার্যালয় না থাকাকে নেতৃত্বে বিভাজন সৃষ্টির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আওয়ামী লীগের নীতনির্ধারণী ফোরাম। তৃণমূলে শক্ত দলীয় ফোরাম না থাকায় দীর্ঘদিনের বিভেদ নিরসন হচ্ছে না। এছাড়া সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হয় অগোছালোভাবে। যেকোনো বিভাজন দূর করতে কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

সূত্র মতে, দলের তৃণমূলকে শক্তশালী ভিত দিতে স্থায়ী কার্যালয়ের প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী- বিগত কয়েক মাস পূর্বে দলের স্থায়ী কার্যালয় তৈরির উদ্যোগ নিতে তৃণমূলকে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্র।

একইসঙ্গে স্থায়ী কার্যালয় তৈরিতে কেন্দ্রীয়ভাবে অর্থ সহায়তা দেবারও কথা বলা হয়। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও চিঠির সাড়া পায়নি কেন্দ্রীয় কমিটি। দলের স্থায়ী কার্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বা অর্থ সহায়তা চেয়ে একটি চিঠি বা অনুরোধ আসেনি। যা নিয়ে অনেকটা হতাশ হয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেন, অধিকাংশ জায়গায় দলীয় স্থায়ী কার্যালয় নেই। অফিস না থাকায় দলীয় কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়, বিভেদ সৃষ্টি হয়। আমরা তাগাদা দিয়েও তথ্য-উপাত্ত পাচ্ছি না।

নেত্রী বলেছেন- অর্থের প্রয়োজন হলে, তা দেওয়া হবে। অফিস থাকলে অনেক বিভেদ বসে সমাধা করা যায় এবং দল শক্তিশালী হয়। শেরপুর জেলায় ৫টি উপজেলা। ওই জেলায় তিনটি সংসদীয় আসন। ১৯৯৬ সরকার এবং ২০০৯ ক্ষমতায় আসার পর অদ্যবধি ৫টি উপজেলার কোথাও নিজস্ব কার্যালয় নেই। এ জেলা থেকে বারবার নির্বাচিত হয়ে সরকারের উচ্চপদস্থ দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী।

তিনি মন্ত্রী থাকলেও তার নির্বাচনি (নকলা ও নালিতাবাড়ী) উপজেলায় আওয়ামী লীগের নিজস্ব কোনো কার্যালয় করতে পারেননি। অভিযোগ আছে— সাবেক এই মন্ত্রী নকলা জোড়াপাম্প এলাকায় তার ভাগিনার বাসায় বসে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ওই উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারাও নিজ বাসভবন বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেই দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

একই অবস্থা ঝিনাইগাতী উপজেলাতে। ঝিনাইগাতী বাজারে প্রায় ১৫ বছর ধরে একটি ভাড়া অফিসে দলীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এছাড়া শ্রীবর্দী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহারুল ইসলাম লিটনের বাসায় চলছে ঐ উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। একই অবস্থা জেলা সদরে। জেলায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে বর্তমানে দু-গ্রুপে ২টি আলাদা অফিস ভাড়া নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম চালানো হয়।

লক্ষ্মীপুর জেলার পাঁচ উপজেলায় নিজস্ব কোনো কার্যালয় নেই। বছর দুয়েক আগে রামগঞ্জ পৌরসভার কাঁচাবাজার সংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের দখলি জায়গায় একটি কার্যালয় ছিল। পরে সেটি প্রশাসন ভেঙে দেয়। বর্তমানে পৌর শহরের কলাবাগান রোডে স্থানীয় এমপি আনোয়ার হোসেন খানের নিজস্ব মালিকানাধীন ভবনের নীচতলায় অস্থায়ীভাবে আ.লীগের কার্যক্রম চলছে।

রায়পুরে নেই নিজস্ব কার্যালয়। পৌর আ.লীগের আহ্বায়ক জামসেদ কবির বাক্কী বিল্লাহ, উপজেলা আ.লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যক্ষ মামুনুর রশিদ ব্যক্তিগত চেম্বারে বা বাসায় দলীয় বৈঠকসহ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার একই অবস্থা।

জেলা শহরের মাদাম ব্রিজ সংলগ্ন একটি ভবনের দ্বিতীয়তলা ভাড়া নিয়ে দলীয় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। রামগতিতেও নেই কোনো কার্যালয়। সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ.লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ উপজেলা পরিষদের কার্যালয়ে দলীয় সভাসহ কার্যক্রম চালাতেন। কমলনগরেও নেই আ.লীগের নিজস্ব কার্যালয়। উপজেলা সদর হাজিরহাট বাজারের একটি ভাড়া ভবনে দলীয় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট, ত্রিশাল, ফুলপুর, ধোবাউড়া, গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল, গফরগাঁওয়েও নিজস্ব কার্যালয় নেই। ওই উপজেলাগুলোতে ভবন ভাড়া নিয়ে অস্থায়ীভাবে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। জেলার মুক্তাগাছা উপজেলা আ.লীগের কার্যক্রম চলছে সভাপতির বাসায়। গাইবান্ধা জেলার ৭টি উপজেলা রয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয়।

তবে ফুলছড়ি, সাদুল্লাপুর, সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় নিজস্ব কার্যালয় নেই। সাদুল্লাপুর উপজেলা পরিষদের নব-নির্বাচিত চেয়ারম্যান শাহরিয়ার খান বিপ্লব, সাদুল্লাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি প্রভাষক আব্দুল জলিল বলেন, এ উপজেলায় নিজস্ব জায়গা না থাকায় সাদুল্লাপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে উপজেলা শাখা কার্যালয় স্থাপন করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে ছয়টি উপজেলায় দলীয় কার্যক্রম ভাড়া রুমে চলছে।

উপজেলাগুলো— আশুগঞ্জ, সরাইল, আখাউড়া, কসবা, বিজয়নগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর। জেলায় দলীয় কার্যালয় বর্তমানে ভাড়া ভবনে চালাচ্ছে জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ফেনী জেলার- দাগনভূঁইয়া উপজেলা, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যক্রম ভাড়া রুমে পরিচালনা হয়। চাঁদপুরের ৮ উপজেলার যে ছয়টিতে ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব কার্যালয় নেই— হাজীগঞ্জ, শাহরাস্তি, মতলব উত্তর ও দক্ষিণ, হাইমচর ও ফরিদগঞ্জ।

কুমিল্লা জেলার ১৭ উপজেলার যে ৭ উপজেলায় নিজস্ব কার্যলয় নেই— মনোহরগঞ্জ, মেঘনা, লালমাই, চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ, মুরাদনগর ও বরুড়া। স্থানীয় নেতা ও ভাড়াবাসায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। টাঙ্গাইল জেলার যে চার উপজেলায় নিজস্ব কার্যালয় নেই— মির্জাপুর, ভূঞাপুর, নাগরপুর ও বাসাইল।

মুন্সিগঞ্জ জেলার একটি উপজেলায় আ.লীগের নিজস্ব কার্যালয় নেই। এছাড়াও ৪৫টি জেলায় খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, টানা তৃতীয় মেয়েদে আ.লীগ ক্ষমতায় থাকলেও অনেক স্থানে নিজস্ব কার্যালয় করতে পারেনি।

স্থানীয় সূত্রেগুলো বলছে, মন্ত্রী-এমপির পাশাপাশি স্থানীয় নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এসব উপজেলায় ক্ষমতাসীন দলটির নিজস্ব কার্যালয় নেই। নিজস্ব কার্যালয় না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূল নেতারা।

লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম ফারুক পিংকু বলেন, দলীয় অফিস নির্মাণ করার জন্য আমরা কেন্দ্র থেকে একটা চিঠি পেয়েছি। আশা করছি আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের প্রতিটি উপজেলায় পার্টি অফিস নির্মাণ করতে পারবো।

যা নিয়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের দাবি— আগামী জাতীয় সম্মেলনের আগেই ওইসব উপজেলায় নিজস্ব কার্যালয় করার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটছে
বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সাফল্য ধারা অব্যাহত রাখতে টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিগত সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুত্তি, সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়নের কারণে ইতোমধ্যে দেশের ভেতর-বাইরে প্রশংসা কুড়িয়েছে দলটি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments Box