সেতু-ফ্লাইওভারে স্বস্তি

আলোকিত সকাল ডেস্ক

পবিত্র ঈদুল ফিতর আসন্ন। প্রিয়জনের সঙ্গে উৎসব উদযাপনে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে ঈদযাত্রা; সড়ক মহাসড়কে যাত্রীর ঢল। পথচলতি মানুষের ভোগান্তি কমাতে রাজধানী থেকে বের হওয়ার পথগুলো যানজটমুক্ত রাখতে সচেষ্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি যেসব সড়ক-মহাসড়কের বেহাল দশা, সেগুলোরও কমবেশি সংস্কার হয়েছে, হচ্ছে।

ঈদযাত্রা নির্বিঘœ করতে মাঠ ছাড়েনি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোও তৎপর। কিন্তু তাবৎ প্রচেষ্টার পরও এবার অস্বস্তির কারণ হতে পারে ত্রুটিপূর্ণ যান চলাচল। অতীতেও ঈদের মৌসুমে এসব যানের চলাচল বন্ধ করা যায়নি। এদিকে সড়কপথে খানাখন্দের চেয়েও এবার বেশি দুশ্চিন্তা টঙ্গী-গাজীপুর পর্যন্ত সড়ক পাড়ি দেওয়া নিয়ে।

এ পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দেখা দিয়েছে সংস্কারকাজ ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। যদিও ঈদ পর্যন্ত বিআরটির কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। দেখা যায়, ঈদে গ্রামমুখী মানুষের চাপ সামলাতে প্রতি বছরই সরকারের তরফে অনুরোধ করা হয় ধাপে ধাপে গার্মেন্টসের ছুটি দিতে।

বিশেষ করে সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা এ অনুরোধ শেষ পর্যন্ত মানেন না বা মানা সম্ভব হয় না গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের। ফলে একটা নির্দিষ্ট সময়ে সব মানুষের বাড়ি ফেরার ঢল নামে। যাত্রীচাপের মওকা পেয়ে পুরনো ও ফিটনেসবিহীন গাড়িও নেমে আসে সড়কে। এসব বাহনের অধিকাংশই চলতি পথে বিকল হয়ে পড়ে। ফলে যানজটের কবলে পড়তে হয় ঘরমুখো মানুষকে।

এসব যানের চলাচল রোধে বিআরটিএ ও হাইওয়ে পুলিশ তৎপর থাকে বলা হলেও গাড়িগুলো ঠিকই মহাসড়কে নেমে পড়ে ঝুঁকি নিয়ে। এর খেসারত দিতে হয় পথচলতি সবাইকেই। আরেকটি বড় সমস্যা ভাঙা সড়ক ও খানাখন্দ। এবার অবশ্য অন্যান্য বছরের তুলনায় খানাখন্দ কম। বৃষ্টি না হলে এ নিয়ে খুব একটা ভোগান্তি হওয়ার কথা না। গাজীপুরের কোনাবাড়ী ও এলেঙ্গা ফ্লাইওভার গত শনিবার থেকে চালু হয়েছে।

এদিন টাঙ্গাইল সড়কের ২টি ফ্লাইওভার ও ৪টি আন্ডারপাস চালু হয়। একই দিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এর পর, সপ্তাহখানেক পেরিয়ে গেলেও মহাসড়কে যানজট দেখা যায়নি। কাঁচপুর, মেঘনা, গোমতী সেতু খুলে দেওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট থাকছে না।

আর উত্তরবঙ্গগামী টাঙ্গাইল সড়কের ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাসগুলো খুলে দেওয়ায় এ রুটেও কোনো যানজট চোখে পড়েনি। তবে টঙ্গী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। রাজধানী থেকে আব্দুল্লাহপুর হয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক, মানিকগঞ্জ পাটুরিয়া দৌলতদিয়া নৌরুটের বেশিরভাগ যানবাহন এ রুটেই চলে। এ সমস্যা নিরসনে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীকে সভাপতি করে কমিটি করা হয়েছে।

এ ছাড়া ঢাকা সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে টঙ্গী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কে ৩শ স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত থাকবেন। টঙ্গী-গাজীপুর সড়কের যানজট নিরসন কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন- গাজীপুরের মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম, স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল, গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার, বিআরটিএ ও বিআরটি প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আশা করি সড়কপথে এবারের ঈদযাত্রা কষ্টকর হবে না। স্বস্তিদায়ক হবে। ফ্লাইওভার-ব্রিজ চালু হওয়ায় আগের চেয়ে দ্রুততর সময়ে গন্তব্যে যেতে পারবেন মানুষ। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, রাস্তার ত্রুটির কারণে এবার যানজট হবে না। ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে বিকল হলে অনেক সময় জট হয়।

এগুলোর চলাচল ঠেকাতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কন্ট্রোলরুম থাকবে। সেখান থেকে মনিটরিং করে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। গাজীপুর প্রতিনিধি আবুল হাসানের পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিআরটি প্রকল্পের চলমান কাজ, বৃষ্টিতে মহাসড়কে পানি জমে সৃষ্টি হওয়া গর্ত, যত্রতত্র গাড়ি ফেঁসে যাওয়া এবং নানা অব্যবস্থাপনায় দীর্ঘ যানজটে পড়ে প্রায় প্রতিদিনই এ রুটের যাত্রীদের নাকাল হতে হচ্ছে।

বিশ মিনিটের পথ অতিক্রম করতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়কে চলছে বিআরটি প্রকল্পের কাজ। মহাসড়কের এ অংশে একই প্রকল্পের আওতায় চলছে ড্রেনেজ নির্মাণের কাজও। সড়ক ও সড়ক সংলগ্ন ড্রেনের নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতা, ফিটনেসহীন যানবাহনের চলাচল এবং সড়কের পাশে অবৈধ পার্কিংসহ নানা কারণে যাত্রীরা এ মহাসড়কে নাকাল হচ্ছেন।

এ ছাড়া বিআরটি প্রকল্পের ভারী যন্ত্রপাতি, পাইপ ইত্যাদি মহাসড়কের পাশে রাখায় সড়ক সরু হয়ে কোথাও কোথাও এক লেনে পরিণত হয়েছে। মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, বোর্ডবাজার, গাজীপুর অংশে সড়কের মাঝখানে বেড়া দিয়ে কাজ চলছে বিআরটি প্রকল্পের। এসব স্থানে সড়কের কার্পেটিং উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে ছোট বড় গর্তের।

এ কারণে এই অংশ দিয়ে যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। এ অবস্থায় আসন্ন ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে যানবাহনের সংখ্যা। সঙ্গত কারণেই ভোগান্তিও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, গাজীপুরে টঙ্গী থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার মহাসড়কে বিআরটি প্রকল্পের কাজ বন্ধ রেখে ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘœ করা এবং রাস্তার কারণে যেন কোনো যানজট না হয় সেজন্য সম্প্রতি একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বৈঠকে গাজীপুর সিটির মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঈদের ৭ দিন আগে থেকে বিআরটি প্রকল্পের কাজ বন্ধ রেখে রাস্তা সচল রাখতে হবে। সভায় জানানো হয়, ঈদের তিন দিন আগে থেকে মহাসড়কে সব ধরনের ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চলাচল বন্ধ থাকবে। ঈদের আগে বিআরটি প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকলেও রাস্তা সচল রাখার জন্য এ প্রকল্পের পর্যাপ্ত লোকবল সড়কে থাকতে হবে।

টাঙ্গাইল থেকে জেলা প্রতিনিধি কাজল আর্য এবং সদরের প্রতিনিধি আবু জুবায়ের উজ্জলের পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, মহাসড়কের চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত টাঙ্গাইল অংশের ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৪০ কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে। নির্মাণাধীন ১১টি আন্ডারপাসের মধ্যে মাত্র তিনটি খুলে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে ঘারিন্দা, দেওহাটা ও কালিয়াকৈর অংশের কালিয়াকৈর আন্ডারপাস।

বাকি ৮টির নির্মাণকাজ চলায় সড়কের এই অংশে ইদযাত্রায় যানজট সৃষ্টির আশঙ্কা বেশি। কেননা ভাঙাচোরা সড়কে যানবাহনের গতি অনেক কমে যায়, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থাকে বেশি। একই মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচলের জন্য তৈরি হচ্ছে আলাদা দুটি লেন। এ জন্য জমি অধিগ্রহণে আছে জটিলতা। এ ছাড়া অধিগ্রহণকৃত জমিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বৈদ্যুতিক খুঁটি সরানোর কাজ চলছে ধীরগতিতে।

এতে সড়ক উন্নয়নকাজের গতি কমেছে। ফলে এ বছর ডিসেম্বরের মধ্যে এ মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণের কাজ শেষ হওয়ার চুক্তি থাকলেও তা সম্ভব হবে না বলেই ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আমিমুল এহসান বলেন, ধীরগতির যান চলাচল, সড়ক নির্মাণের ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা ও অধিগ্রহণকৃত জমিতে পিডিবির ইলেকট্রিক পিলার সরানোর কাজে দেরি হওয়ায় আমরা কাজের গতি বাড়াতে পারছি না।

তবে এরই মধ্যে মহাসড়কে নির্মাণাধীন ১১টি আন্ডারপাসের মধ্যে ৩টি খুলে দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোও খুব দ্রুত খুলে দেওয়া হবে। আশা করি, আসন্ন ঈদে যানজট হবে না। রাজশাহী প্রতিনিধি আমজাদ হোসেন শিমুল জানান, ঈদকে সামনে রেখে যাত্রী ভোগান্তি হ্রাসে রাজশাহীতে চলছে বেহাল মহাসড়কের সংস্কারকাজ। বর্তমানে ঢাকা-রাজশাহী, নওগাঁ-রাজশাহী ও রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের সংস্কারকাজ চলছে।

আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সড়কগুলো পুরোপুরি সংস্কার করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর। চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান হামিদ উল্লাহর পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আসন্ন ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াতে ভোগান্তি হবে না বলে মনে করছেন সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের প্রকৌশলীরা। তাদের দাবি, সড়ক যথেষ্ট মসৃণ আছে।

চট্টগ্রাম সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী জুলফিকার আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, আমরা আমাদের আওতাভুক্ত সব সড়কের খোঁজ নিয়েছি। জানা গেছে, কোথাও কোনো সমস্যা নেই। ভারী বর্ষণ না হলে যান চলাচলের কারণে সড়ক নষ্ট হয় না। এবার তো ঈদের আগে বৃষ্টিই হচ্ছে না। তবুও আমরা সড়কে একটি টিম প্রস্তুত রাখব। এটা সবসময়ই রাখা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হয়েছে দুবছর আগে। এর মধ্যে গত শনিবার খুলে দেওয়া হয়েছে মেঘনা ও গোমতী নদীর ওপর নির্মিত চার লেনের সেতুও।

আস/এসআইসু

Facebook Comments