সুদিন ফিরেছে মাছের

আলোকিত সকাল ডেস্ক

মাছে ভাতে বাঙালি—নদীমাতৃক বাংলাদেশের চিরাচরিত প্রবাদ। অসংখ্য নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড়, ডোবা, নালার বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবেই পাওয়া যায় নানা রং ও স্বাদের মাছ। তবে কয়েক দশক আগে যেসব মাছ হারিয়ে গিয়েছিল, এখন আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে সেই সব দেশি মাছ। বাড়ছে উত্পাদন। মাছের সুদিন ফিরে এসেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ এখন মাছ উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

দেশের বিজ্ঞানীদের গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন জাতের মাছ চাষে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর এই প্রথম বাংলাদেশ মাছ উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। শুধু তাই নয়, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মত্স্য আহরণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। আর চাষকৃত মাছ উত্পাদনে বিশ্বে পঞ্চম। তেলাপিয়া উত্পাদনে চতুর্থ আর ইলিশ উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন শীর্ষে।

মত্স্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু সাইদ মো. রাশেদুল হক জানান, ‘মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় আমাদের দৈনন্দিন মাথাপিছু ৬০ গ্রাম চাহিদার বিপরীতে মাছ গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৬২ দশমিক ৮৫ গ্রামে দাঁড়িয়েছে। আর সে কারণেই মত্স্য খাতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬ লাখ লোকের নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। সে হিসেবে এই খাতে গত ১০ বছরে ৬০ লাখের বেশি লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।

২০১৭-১৮ সালে দেশে ৪২ লাখ ৭৭ হাজার টন মাছ উত্পাদন হয়েছে, যা গত বছর ২০১৬-১৭ বছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৩ হাজার টন বেশি। আর ২০০৮-০৯ সালের মোট উত্পাদনের চেয়ে ৫৮ শতাংশ বা ২৭ লাখ টন বেশি। ১৯৮৩-৮৪ সালে দেশে মাছের মোট উত্পাদন ছিল ৭ লাখ ৫৪ হাজার টন। দেখা যাচ্ছে, ৩৫ বছরের ব্যবধানে মাছের উত্পাদন বেড়েছে সাড়ে পাঁচ গুণের বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের মোট উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৫ লাখ ৫২ হাজার টন।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় যেমন নদী, সুন্দরবন, কাপ্তাই লেক, বিল ও প্লাবনভূমির পরিমাণ প্রায় ৩৯ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর। বদ্ধ জলাশয়, পুকুর, মৌসুমি চাষকৃত জলাশয়, বাঁওড় ও চিংড়ি ঘের, পেন কালচার ও খাঁচায় মাছ চাষের আওতাধীন জলাশয়ের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৯৮ হাজার হেক্টর। সামুদ্রিক জলাশয়ের পরিমাণ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটার এবং সমুদ্র উপকূল ৭১০ কিলোমিটার। দেখা যাচ্ছে, উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছের উত্পাদন গত ৩৫ বছরে বহুলাংশে কমেছে। ১৯৮৩-৮৪ সালে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের আহরণ প্রায় সাড়ে ৬২ শতাংশ হলেও ২০১৭-১৮ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ২৮ শতাংশে। এর বিপরীতে বদ্ধ জলাশয়ের মাছ আহরণের পরিমাণ সাড়ে তিন গুণ বেড়ে হয়েছে প্রায় সোয়া ৫৬ শতাংশ।

এই যে মাছ উত্পাদন বেড়েছে, এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রম। নব্বইয়ের দশকে আমাদের দেখা একের পর এক দেশি মাছ এখন হারিয়ে গেছে। খলিসা, সরপুঁটি, শিং, মাগুর, কইসহ অসংখ্য দেশি প্রজাতির মাছের গায়ে ঘা দেখা দেয়। দেশে স্বাদু পানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ৬৪ প্রজাতির মাছ বর্তমানে বিপণ্নপ্রায়। এখন আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে সেই সব দেশি মাছ। পুকুরসহ বদ্ধ জলাশয়গুলোকে বিজ্ঞানভিত্তিক মাছ চাষের আওতায় আনার ফলে বেড়ে গেছে মাছের উত্পাদন।

মত্স্য অধিদপ্তর জানায়, ময়মনসিংহ, বগুড়া, নওগাঁ, কুমিল্লাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় পুকুরে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ঘেরে মাছের চাষে রীতিমতো বিপ্লব ঘটে গেছে। বিপন্নপ্রায় মাছের প্রজাতির সংরক্ষণ, অবাধ প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি হয়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে ৫৩৪টি মত্স্য অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে। অভয়াশ্রম সংশ্লিষ্ট জলাশয়ে মাছের উত্পাদন ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়েছে। অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার ফলে বিলুপ্তপ্রায় এবং বিপন্ন ও দুর্লভ প্রজাতির মাছ, যথা একঠোঁট, টেরিপুঁটি, মেনি, রানি, গোড়া গুতুম, চিতল, ফলি, কালিবাউশ, আইড়, টেংরা, সরপুঁটি, মধু পাবদা, রিঠা, কাজলি, চাকা, গজার, বাইম ইত্যাদির তাত্পর্যপূর্ণ পুনরাবির্ভাব ও প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অভয়াশ্রমে দেশি কই, শিং, মাগুর, পাবদা ইত্যাদি মাছের পোনা ছাড়ার ফলে এসব মাছের উত্পাদন বেড়েছে। সেইসঙ্গে দাম কমে নাগালের মধ্যে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, আমাদের ৪৭ লাখ হেক্টর মিঠাপানির অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মধ্যে ৩৯ লাখ হেক্টর রয়েছে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় আর ৮ লাখ হেক্টর হচ্ছে অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়। গবেষণার মাধ্যমে মাছের উত্পাদন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এই ৮ লাখ হেক্টর জলাশয় থেকে দেশের মোট মাছ উত্পাদনের ৫৭ শতাংশ আসে। আর উন্মুক্ত জলাশয় থেকে আসে ২৭ শতাংশ। তিনি বলেন, আমাদের মাছ উত্পাদন বাড়াতে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় ও বিস্তৃত সমুদ্রকে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় আনতে পারলে মাছের উত্পাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হবে।

এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাঁচটি কেন্দ্র ও পাঁচটি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তারা এর মধ্যে মত্স্য চাষ ও মত্স্য ব্যবস্থাপনাবিষয়ক ৬১টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় ১৯ প্রজাতির মাছের পোনা উত্পাদন ও চাষ; কই মাছের রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন; অ্যাকোয়াপনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসম্মত মাছ ও সবজি উত্পাদন; নোনা ট্যাংরা, পারশে, পাঙাশ মাছের পোনা উত্পাদন ও চাষ; রুই, তেলাপিয়া ও সরপুঁটি মাছের জাত উন্নয়ন, হালদা নদীতে রুইজাতীয় মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণের কৌশল উদ্ভাবন প্রভৃতি। এদিকে মত্স্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশে মাছের উত্পাদন বেড়ে যাওয়ায় মাছ আমদানি কমে আসছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রায় ৮৮ হাজার টন মাছ আমদানি করা হয়। এর পরের বছর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়ায় ৭৮ হাজার টনে। দেশে প্রতিবছর যত মাছ আমদানি হচ্ছে, তার একটি বড় অংশই হলো সামুদ্রিক মাছ। মত্স্য অধিদপ্তর বলছে, এই মাছের মধ্যে আছে মাগুর, শিংজাতীয় মাছ, রূপচাঁদা, সেড বা গিজার্ড সেড, সার্ডিন প্রভৃতি। এসব সামুদ্রিক মাছ আমদানি হচ্ছে মিয়ানমার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে।

ইলিশ উত্পাদনের ৭৫ ভাগই বাংলাদেশে

ইলিশ উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন প্রথম। বিশ্বে ইলিশ উত্পাদনের ৭৫ শতাংশই বাংলাদেশে হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন ইলিশ উত্পাদন হয়েছে, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে ২১ হাজার টন বেশি। বিগত ২০১৬-১৭ সালে ইলিশের উত্পাদন ছিল ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ বিজ্ঞানী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যে হারে ইলিশের উত্পাদন বাড়ছে, তাতে আগামী কয়েক বছরে উত্পাদন আরও বাড়বে। বিশ্বের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ইলিশ উত্পাদনের দেশ হবে বাংলাদেশ। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ইলিশ আহরণে রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। গত ১০ বছরে দেশে ইলিশ উত্পাদন বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উত্পাদন ছিল মাত্র ২ লাখ ৯০ হাজার টন, যা এবার ৫ লাখ টন ছাড়িয়েছে। সমুদ্রে ৬৫ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ এবং মাছ উত্পাদনে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নের কারণে উত্পাদন এই হারে বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। সেই সঙ্গে বর্তমান সরকার মা ইলিশ ও জাটকা ধরা নিষিদ্ধকালীন জেলেদের খাদ্য-সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করায় ইলিশ উত্পাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৫ লাখ ১৭ হাজার টন ইলিশ উত্পাদন হয়েছে। দেশে মোট মত্স্য উত্পাদনের ১২ শতাংশ ইলিশ। এছাড়া, বর্তমানে দেশের জিডিপিতে প্রায় ১ শতাংশ অবদান রাখছে ইলিশ। ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সুরক্ষিত হওয়ায় এবং জাটকা ধরা থেকে জেলেদের বিরত রাখার কারণে গত ১০ বছরে ইলিশের উত্পাদন ক্রমান্বয়ে বেড়ে আজকের অবস্থায় এসেছে। তবে এখন সময় এসেছে জাটকা এবং কম ওজনের ইলিশ মাছ ধরার প্রবণতা বন্ধ করার। এটা বন্ধ করা গেলে ইলিশের উত্পাদন দ্রুত হারে বাড়তে থাকবে।

আস/এসআইসু

Facebook Comments