সিন্ডিকেটের কবলে পশুর হাট

আলোকিত সকাল ডেস্ক

আসন্ন কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানীর অস্থায়ী কুরবানির পশুর হাটের ইজারায় সিন্ডিকেটের কারসাজিতে এবারো কাঙ্ক্ষিত দাম পায়নি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা প্রভাব বিস্তার করে হাটের ইজারা বাগিয়ে নেয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন যুবলীগ-ছাত্রলীগের সিন্ডিকেট চক্র এতটাই প্রভাবশালী যে এবার পশুর হাটের জন্য তাদের বাইরে অন্য কেউ প্রায় সিডিউলই কিনতে পারেনি।

সম্পত্তি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাসকদলীয় সিন্ডিকেটের কারণে অনেকে ভয়েই ইজারা ফরম জমা দিতে আসেননি।

আবার অনেক নেতা একাধিক নামে ফরম ক্রয় করে কাঙ্ক্ষিত পশুর হাট নিজের অধীনে রেখেছেন। এর মধ্যে খিলগাঁও মেরাদিয়া হাটের শাহ আলম ও ৩২নং ওয়ার্ড সামসাবাদ মাঠ মুরাদ হাসানের নামে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা হাটের ইজারা নিয়েছেন। দুটি হাটের দাম প্রায় কাছাকাছি।

ঢাকা দুই সিটি কর্পোরেশনের অস্থায়ী ২৩টি হাটের প্রাপ্ত সর্বোচ্চ দরদাতাদের হাটের ইজারামূল্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ১৪টি পশুর হাটের সর্বোচ্চ দর ৮ কোটি ৮৭ লাখ ৫২ হাজার টাকা।

আর উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৯টি পশুর হাটের সর্বোচ্চ দর ১৩ কোটি ৪১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮৬ টাকা। এ বছর দুই সিটি কর্পোরেশনের ২৩টি পশুর হাট থেকে ইজারা পেয়েছে ২২ কোটি ২৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৭ টাকা।

দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেটের পশুর হাটের ইজারাদার আব্দুল লতিফ। গতবারও তিনি এই হাটের ইজারা পেয়েছিলেন। আব্দুল লতিফ আমার সংবাদকে বলেন, স্থানীয় লোকজন আমার নামে পশুর হাটের ইজারা নেয়। আমরা সবাই মিলেই হাটের ইজারা সংগ্রহ করে থাকি।

একই কথা বলেন পোস্তগোলা শ্মশ্মানঘাট সংলগ্ন পশুর হাটের ইজারাদার ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মঈদ উদ্দিন চিশতী। তিনি বলেন, গত বছরের আগের বছর পশুর হাটের ইজারা পেয়েছিলেন। এবারো ইজারা পেয়েছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়েই হাটের সকল কার্যক্রম পরিচালনা করেন তিনি।

দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন
ইজারা হওয়া হাটগুলোর মধ্যে শাহজাহানপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল লতিফ উত্তর শাহজাহানপুর খিলগাঁও রেলগেট বাজার সংলগ্ন মৈত্রী সংঘের মাঠ গত বছর ইজারা নিয়েছিলেন ৮ লাখ ২০ হাজার টাকায়। এবারো তিনি ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকায় কুরবানির হাটটি ইজারা নিয়েছেন।

এবার এ হাটে ২০ হাজার টাকা ইজারা বেড়েছে। হাজারীবাগ ঝিগাতলা পশুর হাট গত বছর ডিএসসিসির ২২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের নেতা তারিকুল ইসলাম সজীবের ভাই জাহিদুল কবির ১ কোটি ১৫ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন।

এবার এ হাটের মূল্য ১৭ লাখ টাকা কমিয়ে ৯৮ লাখ টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে। এটি পেয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের দিল জাহান ভূইয়া। রহমতগঞ্জ মুসলিম সোসাইটির পক্ষে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতা হাজি শফি মাহমুদ গত বছর ১১ লাখ ৭ হাজার ১৫০ টাকায় ইজারা নেন।

এবারো তিনি ১২ লাখ ৭ হাজার ১৫০ টাকায় হাটের ইজারা পেয়েছেন। ৫ লাখ ৮০ হাজার টাকায় কামরাঙ্গীরচর চেয়ারম্যান বাড়ির হাটের ইজারা পেয়েছেন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হোসেন সরকার।

গত বছরও তিনি ৫ লাখ ২০ হাজার টাকায় ইজারা নেন। ২৮ লাখ ৫ হাজার টাকায় পোস্তগোলা শ্মশানঘাটের পাশের হাটের ইজারা পেয়েছেন মঈন উদ্দিন চিশতী। তিনি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। গত বছর এ হাটটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছিলেন আসাদুজ্জামান।

এছাড়া শ্যামপুর বালুর মাঠ কদমতলীর হাট ৫০ লাখ ১১ হাজার টাকায় ইজারা নিয়েছেন সিদ্দিকুর রহমান কামাল। এই গরুর হাঠের সরকারি মূল্য এখনো মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। মেরাদিয়া বাজার সংলগ্ন হাট ১ কোটি ৪০ লাখ ৫ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন শাহ আলম।

তারও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। একই অবস্থা ৩২নং ওয়ার্ডের সামসাবাদ মাঠ সংলগ্ন গরুর হাট। ১ কোটি ৬২ লাখ ৭৭ হাজার ইজারা পান মুরাদ হাসান। কমলাপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন হাট ১ কোটি ৮১ লাখ ৮১ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন জাকির হোসেন। শনির আখড়া ও দনিয়া গরুর হাট ১ কোটি ১২ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন মোশারফ হোসেন।

ধুপখোলা মাঠ সংলগ্ন ও আশপাশের খালি জায়গা গরুর হাট ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন শামসুজ্জোহা। ৪১নং ওয়ার্ডের কাউয়ার টেক গরুর হাটের ইজারা ৩৬ লাখ ৭ হাজার টাকায় নিয়েছেন ফরহাদ ভূইয়া। আফতাব নগর ইস্টার্ন হাউজিং হাট ৭০ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন নবী হোসেন।

আর আমুলিয়া মডেল টাউনের আশপাশের খালি জায়গায় গরুর হাটের ৬ লাখ টাকায় ইজারা পান আহসান উল্লাহ। যদিও এ হাটের সরকারি মূল্য মন্ত্রণালয় এখনো নির্ধারণ করে দেয়নি।

দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অস্থায়ী ১৪টি হাটের মোট ইজারা মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ৮৭ লাখ ৫২ হাজার টাকা। ১৪টি হাটের ইজারা ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। গত বছরের মতো এবারো একই কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।

উত্তর সিটি কর্পোরেশন
উত্তরা ১৫নং সেক্টরের পশর হাটটি ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন নুর হোসেন। ভাটারা পশুর হাট ১ কোটি ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন ইকবাল হোসেন খন্দকার। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের খেলার মাঠে গরুর হাটের ইজারা ৪৭ লাখ টাকায় ইজারা পান জালাল উদ্দিন।

মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী সড়ক সংলগ্ন পশুর হাট ৩ কোটি ৭০ লাখ ১ হাজার টাকায় ইজারা পান শাহ আলম। গতবারও তিনি এ হাট ৯০ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন। মিরপুর সেকশন-৬ এর খালি জায়গায় গরুর হাট ১ কোটি ২৯ লাখ ৭১ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন আসরাফ উদ্দিন।

মিরপুর ডিওএইচএস পশু হাট ২৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন আব্দুল হালিম। অথচ গত বছর এ হাটটি ২৫ লাখ ২০ হাজার ৭৮৬ টাকায় ইজরা দেয়া হয়েছিল। বাড্ডা ইস্টার্ন হাউজিং গরুর হাট ৯৬ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন নবী হোসেন রনি।

কাওলা শিয়াল ডাঙ্গা সংলগ্ন খালি জায়গায় গরুর হাট ১৬ লাখ ৬৫ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন হীরা আহমেদ রতন এবং ভাষানটেক রাস্তার নির্মাণাধীন অব্যবহূত ও পরিত্যক্ত অংশে গরুর হাট ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন হামিদা সুলতানা।

তবে খিলক্ষেত ৩শ ফুট সড়ক সংলগ্ন হাটটি সিটি কর্পোরেশন ২ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় দরপত্র আহ্বান করলেও সেটি বাতিল হয়েছে। উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের কুরবানির পশুর হাটের ইজারা পেয়েছেন তুরাগ থানা আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক নূর হোসেন।

ভাটারা থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন খন্দকার পেয়েছেন সাঈদনগর পশুর হাটের ইজারা। মোহাম্মদপুর হাট ইজারা পেয়েছেন যুবলীগ নেতা শাহ আলম হোসেন।

ইস্টার্ন হাউজিং হাটের ইজারা পেয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা আশরাফ উদ্দিন। আফতাবনগর হাট ইজারা পেয়েছেন ৪২নং ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক নবী হোসেন।

মিরপুর ডিওএইচএসের সেতু প্রোপার্টি হাট ইজারা পেয়েছেন তুরাগ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হালিম, ঢাকা মহানগর উত্তর শ্রমিক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদ হাসান ও তুরাগ থানা মোটর শ্রমিক লীগের সহ-সভাপতি মনির হোসেন। তেজগাঁওয়ের ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট খেলার মাঠের ইজারা পেয়েছেন ২৪নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক জালাল উদ্দিন।

ইজারাদার রফিকুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, সিটি কর্পোরেশন মৌখিকভাবে ইজারা বাতিল করেছে। এতে আমার ১৫-২০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এই টাকা তো সিটি কর্পোরেশন দেবে না। ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেয়া ছাড়া উপায় নেই।

উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অস্থায়ী ৯টি হাটের মোট ইজারামূল্য দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৪১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। ৯টি হাটের ইজারাদারদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

এ বিষয়ে জানতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলামের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। আর দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা দেশের বাইরে থাকায় তার সঙ্গেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। এ বছর পশুর হাটের ইজারা মূল্য খুব বেশি বাড়েনি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments