সারা দেশে ৭১ হাজার ৫৮৪ আনফিট মোটরযান

আলোকিত সকাল ডেস্ক

সড়কে চলছে সাড়ে ছয় হাজার আনফিট বাস। এর মধ্যে বড় বাসের সংখ্যা ৩ হাজার ৭০২। মিনিবাস ২ হাজার ৭৯৮। তথ্যটি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)। আসছে ঈদুল ফিতরে এসব বাসেই যাতায়াত করবে কয়েক লাখ মানুষ। সাড়ে ছয় হাজার বাসের পাশাপাশি সড়কে আছে আরো ৬৫ হাজার ফিটনেসবিহীন মোটরযান।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফিটনেসবিহীন মোটরযানের সংখ্যা আরো বেশি। তাদের মতে, একদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, অন্যদিকে মাঝপথে নষ্ট হয়ে যানজট তৈরির শঙ্কা—দুটোই বাড়িয়ে দেবে এসব আনফিট যানবাহন।

নিয়ম অনুযায়ী, মোটরযানের এক্সেল লোড, টায়ারের বিড, গতি, ব্রেক ও ধোঁয়ার রঙ, হেডলাইট, অ্যালাইনমেন্ট, রঙ, আসন সংখ্যাসহ ৬৫ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ফিটনেস সনদ দেয় বিআরটিএ। কোনো মোটরযানের ফিটনেস সনদ না থাকলে ধরে নিতে হবে, সেটিতে ত্রুটি আছে।

বিআরটিএর হিসাব বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ফিটনেস সনদ না থাকা মোটরযানের সংখ্যা ৭১ হাজার ৫৮৪। এর মধ্যে বাস ও মিনিবাস ৬ হাজার ৫০০। এর বাইরে ৩৪৩টি অ্যাম্বুলেন্স, ২২ হাজার ৮২৯টি অটোরিকশা, ১২৮টি কার্গো ভ্যান, ৫৮টি কাভার্ড ভ্যান, ২ হাজার ৫৯৬টি ডেলিভারি ভ্যান, ২ হাজার ৪৩৪টি হিউম্যান হলার, ৩ হাজার ৩৪টি জিপ, ৩ হাজার ৩৬৪টি মাইক্রোবাস, ৩ হাজার ২৪৫টি পিকআপ ভ্যান, ৫ হাজার ৭৯৫টি প্রাইভেট কার, ৯৬৬টি স্পেশাল পারপাজ ভেহিকল, ১৮০টি ট্যাংকার, ৬ হাজার ৬২০টি ট্রাক্টর, ৮ হাজার ৪৮২টি ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন রয়েছে আরো ৪ হাজার ৬৪৪টি।

হাইওয়ে পুলিশ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফিটনেসবিহীন মোটরযান প্রধানত দুইভাবে সড়কে ভোগান্তি বাড়ায়। একটি ব্যস্ততম মহাসড়কের ওপর বিকল হয়ে। যে জায়গায় বিকল হয়, সেখান দিয়ে যান চলাচলের জন্য সড়কের প্রশস্ততা কমে যায়। মাঝরাস্তায় গাড়ি বিকল হলে, সেটি রেকার দিয়ে সরাতেই কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়। এ সময় সড়কে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট, যা স্বাভাবিক হতে সময় লাগে আরো কয়েক ঘণ্টা।

বেশির ভাগ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা যায়, দুর্ঘটনাকবলিত যানবাহনের ফিটনেস ঠিক নেই। ব্রেক, চাকা, স্টিয়ারিং, গিয়ারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পার্টস দুর্বল থাকায় যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন চালক। ঘটে দুর্ঘটনা। গত তিন ঈদুল ফিতরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৮০০ মানুষ। আহতের সংখ্যা তিন সহস্রাধিক। প্রাণহানির পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা ঈদের সময় সড়ক-মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটও তৈরি করে।

ঈদ উপলক্ষে ৩০ মে রাজধানী ছাড়তে শুরু করবে ঘরমুখী মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করবে বাসে। পরিবহন মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়কপথে যাতায়াত করবে ৩০ লাখের বেশি মানুষ। এর বিপরীতে বিআরটিএতে নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা ৭৬ হাজার।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একটি বড় বাসের গড় আয়ু ধরা হয় ১০-১২ বছর। বিআরটিএতে নিবন্ধিত বাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে ১০ বছর বা তারচেয়ে কম বয়সী বড় বাসের সংখ্যা ১৯ হাজার ৭০২। একইভাবে ১০ বছর বা তারচেয়ে কম বয়সী মিনিবাস আছে মাত্র ২ হাজার ৯২৫টি।

আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া পুরনো বাসগুলোর একটা বড় অংশ এখনো রাস্তায় চলছে বলে জানিয়েছেন বিআরটিএর কর্মকর্তারা। এগুলোকে তারা চিহ্নিত করেছেন ‘ফিটনেস ডিফল্টার’ হিসেবে। প্রতি বছরই ফিটনেস সনদ হালনাগাদ করার কথা থাকলেও এখনো দেশে সাড়ে ছয় হাজার বাস ও মিনিবাস চলাচল করছে সেটি না করেই। এগুলোকে ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে অভিহিত করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

বিআরটিএ যে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের তালিকা করেছে, তার সঙ্গে একমত হতে পারেননি পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, যারা বছর বছর নির্দিষ্ট ফি জমা দেয়, তাদেরই ফিটনেস সনদ দেয় বিআরটিএ। যারা দেয় না, তাদের যানবাহন চিহ্নিত হয় আনফিট হিসেবে। বিআরটিএর কাছে ফিটনেস দেয়া শুধু টাকা জমা নেয়ার মধ্যেই সীমিত। অথচ ফিটনেস পরীক্ষার সময় যানবাহনের ৪২ থেকে ৬৫ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার নিয়ম। কিন্তু আমাদের এখানে অলৌকিকভাবে মাত্র এক-দেড় মিনিটে সব প্রক্রিয়া শেষ করছে বিআরটিএ। তাদের ফিটনেস সনদ দেয়ার প্রক্রিয়াটিই ভুল। সংস্থাটি যেসব যানবাহনকে ফিটনেস সনদ দিয়েছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে দেখা যাবে সেগুলোর সিংহভাগই রাস্তায় চলাচলের অযোগ্য।

ঈদের সময় রাস্তায় আনফিট বাসের পাশাপাশি দূরপাল্লায় চলাচলের অনুপযোগী বাসও যাত্রী পরিবহন করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঈদের সময় পুলিশ শুধু যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়েই জোর দেয়। এ কারণে যানবাহনের কাগজপত্র ঠিক আছে কিনা, তা দেখা হয় না। এ সুযোগেই রাস্তায় আনফিট বাসের পাশাপাশি সিটি বাসও রাস্তায় নেমে পড়ে। শহরের বাস দূরপাল্লায় ও মহাসড়কে চললে সেগুলোর কারণে দুর্ঘটনা, যানজটের ঝুঁকি অনেকখানি বেড়ে যায় বলে মনে করেন তিনি।

ঈদে দূরপাল্লার যানবাহন স্বল্পতার সুযোগ নিয়ে যেন ‘লক্কড়-ঝক্কড়’ গাড়ি চলতে না পারে, সেজন্য বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নির্দেশনা দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। ঈদের সময় আনফিট যানবাহন চলাচল প্রতিরোধ কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে গতকাল যোগাযোগ করা হয় বিআরটিএর পরিচালক (রোড সেফটি) শেখ মোহাম্মদ মাহবুব-ই-রব্বানীর সঙ্গে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ঈদের সময় বিভিন্ন টার্মিনালে বিআরটিএর পর্যবেক্ষক দল থাকবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকবে। এর বাইরে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হচ্ছে। সেখান থেকে সার্বিক বিষয়গুলো দেখভাল করা হবে। প্রতি বছরই আমরা ঈদের সময় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ করছি। এবারো তার ব্যতিক্রম হবে না।

ফিটনেসবিহীন যানবাহন সম্পর্কে তিনি বলেন, কোনো বাসের যদি কাগজপত্র না থাকে, তাহলে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত সেসব বাসের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেবেন।

গত বছর ঈদুল ফিতরেও একই উদ্যোগ নিয়েছিল বিআরটিএ। যানবাহনের রুট পারমিট বাতিল করলে মালিকরা পরিবহন ধর্মঘটের হুমকি দেন। পরে অভিযান সীমিত করে এনেছিল সংস্থাটি। এবারো যদি বাস মালিকরা ধর্মঘটের হুমকি দেন, তাহলে কী করবেন, জানতে চাইলে বিআরটিএর এ পরিচালক বলেন, আমরা এরই মধ্যে বাস মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক সভা করেছি। সভায় বাস মালিকরা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি থাকবে না। তার পরও যদি থাকে, তাহলে বিআরটিএ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে—এতে মালিকদের কোনো আপত্তি নেই।

আস/এসআইসু

Facebook Comments