সারাবিশ্বের কমেডিয়ানরা যখন সুপার বিজি, আমরা তখন শুন্যের মনিকোঠায়

আলোকিত সকাল ডেস্ক

‘সারাবিশ্বের কমেডিয়ানরা যখন সুপার বিজি, আমরা তখন শুন্যের মনিকোঠায়। এখন নাকি ছবিতে কমেডি রাখতে হয় না, এমনি ই ছবি চলে। এমন চলা চলে যে প্রযোজক এর হাতে হারিকেন উঠে। একজন দর্শক আড়াই ঘন্টা সিনেমা হলে বসে থাকবে কি কারণে? ঘুরে ফিরেই নায়ক-নায়িকা, আর একটু ঘুরলেও নাচ-গান, আরে ভাই দর্শক দের রিলাক্স কই? ছবি যায় ঝুলে দর্শক যায় ঝিমিয়ে, প্রযোজক যায় হারিয়ে আর সিনেমা যায় ফুড়িয়ে।’ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কমেডি অভিনেতা চিকন আলী।

১৩ বছরের ক্যারিয়ারে কাজ করেছেন অনেক নাটক ও সিনেমায়। তবে সিনেমার পর্দায়ই বেশি দেখা গিয়েছে এ অভিনেতাকে। নাটক কিংবা সিনেমাতে তাকে কমেডিয়ান চরিত্রেই বেশি দেখা যায়। সম্প্রতি নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে কথা বলেন কমেডিয়ান এই অভিনেতা।

দর্শকদের হাসি আনন্দ দিতে সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কমেডিয়ানরা। একটা সময় কমেডিয়ানদের দেখার জন্যই হলে যেতেন দর্শকরা। দিলদার, আফজাল শরীফ, কাবিলা তাদের পেটে খিল ধরিয়ে দেওয়া হাসির দৃশ্যে দর্শক সাড়া দিত শিস বাজিয়ে। এরপর অনেকে এলেও নিজেদের শক্ত অবস্থা তৈরি করতে পারেনি। ২০০৬ সালে ‘রঙিন চশমা’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় চিকন আলীর। সেই থেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষে কাজ করে চলেছেন অবিরত।

এই কমেডি অভিনেতা জানান, এখন আর ছবিতে কমেডি দৃশ্য রাখতে চান না পরিচালকরা। নায়ক নায়িকাকে দিয়েই সবকিছু করিয়ে নিতে চান তারা। দর্শকদেরকে আড়াই ঘন্টা হলে বসিয়ে রাখতে হলে সেরকম কিছুই বানাতে হবে। শুধু জিরা দিয়ে নয়, সব রকম মসলা দিয়ে ছবি বানালে দর্শক হল থেকে বের হবে তালি আর শিস ফুটিয়ে।

দিলদার স্যার এর প্রতি ছবিতেই নায়ক, নায়িকা ভিলেনের চাইতে বেশি মনে রাখতে তাকে। তার মানে এই নয় যে, উনি নায়ক, নায়িকা কিংবা কোন ভিলেনের ক্ষতি করেছেন। উনি দর্শকদের হাসাতে পারতেন। তার সেই ক্ষমতা ছিল। সেই ক্ষমতা দেখানোর সুযোগ পরিচালকরাই তৈরি করে দিয়েছেন। উনি তালি পাইলেন আপনি পাইলেন না, এই ট্রেডিশন থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যার কাজ তাকে দিয়ে করানো উচিত। তাহলেই চলচ্চিত্রের সুদিন ফিরবে এবং ফিরবেই।

তিনি আরও বলেন, চলচ্চিত্রের একজন পেশাদার শিল্পী আমি। অনেককে বলতে শুনেছি, তারা শখে অভিনয় করতে এসে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। মানে হচ্ছে তাদের ইচ্ছাটা এমন ছিলো রথ দেখা হলো এবং কলা বেচাও হলো। আমি তার ধারে কাছে নেই। আমি চলচ্চিত্রে এসেছি, অভিনয় টা কে নেশা ও পেশা হিসেবে নিতে। আর নিয়েছি বলেই আলহামদুলিল্লাহ, আজ সারা বাংলার মানুষ শুধু নয় ওপার বাংলায় ও আমি আমার জাত চিনিয়েছি। যাই হোক, আমরা শিল্পীরা পানির মত। পানি যেমন যে পাত্রে রাখবেন, সেই পাত্রেই সেই আকার ধারণ করবে। আমরা ও তাই। আমাদের যে চরিত্র দিবেন, তা করাটাই হচ্ছে আমাদের কাজ। সুনাম বদনাম নিয়েই একজন অভিনেতা কিংবা একজন শিল্পীর ক্যারিয়ার।

চলচ্চিত্রের ক্লান্তি লগ্নে এসে অনেকেই চলচ্চিত্র থেকে বিদায় নিয়েছে কেউ কেউ আমার মত আধা বেলা খেয়ে চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় আছে যে হয়তো বদলে যাবে চলচ্চিত্র। ঠিকই চলচ্চিত্র বদলে যাচ্ছে, কিন্তু সাফল্য আসছে না কারো। কারণ ইতিবাচক এর চাইতে নেতিবাচক ভর করছে বেশি। একটি ছবি হিট হলে সেই ছবির পরিচালক, নায়ক-নায়িকা তিন জনই হিট হলেন, রেমুনারেশনও হয়ে গেলো হাই। একজন কমেডিয়ান হিসেবে ওই নায়ক নায়িকার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অভিনয় করলাম অথচ তারা পেলো দশ ছবি আর আমাদের ঝুলি শুন্য। তারাও আর খোঁজ রাখেন না আমাদের। ভুল করেও মনে করেন না যে যার ঘাড়ে পা দিয়ে আজ আমি এখানে তাকে যদি এই কাজে রাখতে পারতাম! এই প্রেম চলচ্চিত্রে আগে ছিলো, এখন আর নেই। সেই কারণে আত্নার অভিশাপে এরাও নাই হয়ে যায় একসময়।

আমাদের চলচ্চিত্রের নায়ক নায়িকা প্রযোজক পরিচালকদের একটা নীতি হয়ে গেছে যে যার মাথায় তেল আছে তার মাথায় আরো তেল ঢালা। আমি চলচ্চিত্রের জন্য টিভি মিডিয়াতে পা রাখিনি, ফ্রি সেলিব্রিটি হলে কেউ টিকেট কেটে দেখবেন না বলে। আর আমাদের নায়ক নায়িকা পরিচালক মহোদয়েরা ওই ফ্রি শিল্পীকে টেনে নিয়ে এসে আমার চরিত্রটার বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছেন। পরিশেষে ফলাফল গোল্লা।

দশ বছর থেকে বাড়েনি আমার পারিশ্রমিক, বাড়েনি আমার জীবন সংসার বাঁচানোর চেস্টা। কোন ছবিতে অভিনয়ের জন্য ডাকলে পরিচালক বা প্রযোজক নয়, ম্যানেজার বা সহকারী পরিচালক দিয়ে নক করানো হয়। ছোট একটু ক্যারেক্টার আছে, এতো টাকা দিবো করে দাও। যদি বলি আমি একটু পরিচালক বা প্রযোজক এর সাথে কথা বলতে চাই। দূর মিয়া তোমার কথা আমি বলছি। সেই টাকায় কাজ করতে গিয়ে দেখি, বিশাল চরিত্র মাস চলে যায়, টাকা ওই দশ দিনের। বদনাম নয় বাস্তব তুলে ধরছি, আমাদের সবার চিন্তা করে শিডিউল করা হয়না। শিডিউল করা হয় একজনের উপর। যদি সে জন বলে এই সপ্তাহে আমি কাজ করবো না, এই সপ্তাহের কয়দিন উনি করবেন না, তাও আমাদের জানানো হয় না। অথচ সারাবিশ্বের চলচ্চিত্রে টিম ওয়ার্ক নীতি তে কাজ হয়। একজন নায়ক নায়িকা পান লক্ষ লক্ষ টাকা, আমার পাই হাজার হাজার, তারপর ও তাদের চিন্তা থাকেনা সহশিল্পীটা কিভাবে বাঁচবে। আজও আমাদের লিখিত কোন শিডিউল হয়না। শুধুমাত্র মৌখিক। কার কাছে বিচার চাইবো এর?

পরিচালকরা শুধু মূল চরিত্রগুলো নেন সিনেমা থেকে আর বাকি কাস্টিং গুলো করেন মিডিয়া থেকে। অথচ তাদের ছবি মুখ থুবড়ে পড়ছে। মিডিয়ার মানুষ অনেক ক্রিয়েটিভ আর ক্রিয়েটিভ মানুষ গুলির সাথে অভিনয় নিয়ে অনেক খেলা যায়। আশায় থাকি তাদের দিকে। অথচ তারা খেলা শুরু হওয়ার আগেই গোল দিয়ে বসে থাকেন।

এছাড়া সবাই বলে কোন ছবিই নাকি চলেনা। আমাদের দেশে ছবি খুব কপি করা হয়, সেটা অন্যান্য দেশেও হয়। বাইরের ছবিগুলিকে কপি করে আমাদের দেশে বানানোর প্রবণতাটা বেশি। সেই কপিটাও ঠিকমত হয়না। যে ছবিটা কপি করছে সেখানে ত্রিশ ভাগ রয়েছে কমেডি। অথচ কপি করে ছবি বানানোর পরেও সেই ত্রিশ ভাগ বাদ দিয়ে সত্তর ভাগ থেকেই ছবি বানাচ্ছেন। এভাবেই দর্শকদের ধোঁকা দেয় তারা। কিন্তু দর্শক তো আর এখন এতটা বোকা না।

আস/এসআইসু

Facebook Comments