সামনে আরও দুঃসময়

আলোকিত সকাল ডেস্ক

ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশা এখন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। শুরুতে রাজধানীকেন্দ্রিক হলেও চলতি মাসের শুরু থেকে তা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। প্রথমে রাজধানীর আশপাশের জেলা ও সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গু ছড়ায়। এরপর চলতি মাসের মাঝামাঝি খুলনা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়। গত দুই দিন ধরে বরিশালের বিভিন্ন জেলা থেকেও ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের খবর আসছে। সর্বশেষ বগুড়া, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, পাবনা, পিরোজপুর ও চট্টগ্রামে আরও ৫১ জন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তবে এসব রোগীর নাম গতকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় যুক্ত হয়নি। আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ভরা মৌসুমে এ রোগের ভয়াবহতা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্নিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। আসন্ন দুঃসময় মোকাবেলায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

সরকারি হিসাবে দেখা যায়, গত বছর ১০ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়। এবার এরই মধ্যে সেই সংখ্যা ছুঁইছুঁই করছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ৯ হাজার ছাড়িয়েছে। সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ৮ জন বলা হলেও বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্নিষ্ট চিকিৎসকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী চলতি বছর মৃত্যু হয়েছে ৩৬ জনের। বিভিন্ন জেলায় নতুন করে ডেঙ্গু রোগী পাওয়ার ঘটনায় দেশব্যাপী আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (সংক্রামক ব্যাধি) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা জানান, বিগত বছরগুলোতে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি পাওয়া গেছে। কারণ, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে বৃষ্টি বেশি হয়। বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার প্রজনন ক্ষমতা চক্রাকার হারে বৃদ্ধি পায়। থেমে থেমে বৃষ্টি হলে নালা-নর্দমা, ড্রেনে পানি জমার সুযোগ পায়। ওই পানি এডিস মশার প্রজননে অত্যন্ত সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাই এই দুই মাস এডিসের প্রকোপ বেশি থাকে। কিন্তু এবার জুলাই মাসেই ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিয়েছে। আগামীতে কী হয় জানি না।

তিনি বলেন, গত বছর চিকুনগুনিয়ার পর তারা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ে পৃথকভাবে পর্যালোচনা করেন। সেখানে এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার বিষয়টি উঠে আসে। এরপর তারা সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মশালা ও কার্যক্রম গ্রহণ করেন। এবার জনসচেতনতার মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সক্ষম হতে পারবেন বলে আশাবাদী ছিলেন। এখন দেখা যাচ্ছে আগেভাগেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, বর্ষ মৌসুমে ডেঙ্গুর বিস্তার সবচেয়ে বেশি ঘটে। কারণ, ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশা নর্দমা, ড্রেন ও বাসাবাড়িতে থাকা চৌবাচ্চাসহ যেসব স্থানে পানি জমে থাকে সেসব স্থানে প্রজননক্ষম হয়। চক্রাকারে প্রজাতির বিস্তার ঘটিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তোলে। আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস এজন্য সবচেয়ে উপযোগী। কারণ, এ সময় থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হয়। আর জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তারের বেশি সুযোগ পায়। তাই আগামী দুই মাস নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভয়। তাই সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্নিষ্টদের প্রতি আহ্বান থাকবে, মশকনিধন ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি জনসাধারণকে সচেতন করে তুলতে হবে। তাহলে হয়ত ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বেশি আক্রান্ত :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে এই দুই চিকিৎসকের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়। অধিদপ্তরে থাকা গত পাঁচ বছরের ডেঙ্গু আক্রান্তের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল, মে ও জুন মাসে যথাক্রমে ০, ৮ ও ৯ জন, ৬, ১০ ও ২৮ জন, ২৮, ৭০ ও ২৫৪ জন, ৭৩, ২৩৪ ও ২৬৭ জন, ২৯, ৫২ ও ২৯৫ জন, ৫৮, ১৮৪ ও ১৮২৯ জন আক্রান্ত হয়েছে।

একইভাবে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে যথাক্রমে ৮২, ৮০ ও ৭৬ জন, ১৭১, ৭৬৫ ও ৯৬৫ জন, ৯২৬, ১,৪৫১ ও ১,৫৪৪ জন, ২৮৬, ৪৩০ ও ৫১২ জন, ৯৪৬, ১,৭৯৬ ও ৩,০৮৭ জন আক্রান্ত হয়েছে।

এই তথ্য বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, এপ্রিল, মে ও জুন মাস থেকে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হয়। জুলাই মাসে রোগী কিছুটা বাড়ে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তবে অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে রোগী কমতে থাকে।

১৯ বছরে আক্রান্ত ও মৃতের পরিসংখ্যান :দেশে ১৯৯৮ সালে সর্বপ্রথম ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু রোগীর হিসাব শুরু করে ২০০০ সালে। ওই বছর থেকে চলতি বছরের এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৫৯ হাজার ৮৩৩ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৩০৪ জনের। তবে ২০০০ সালে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ওই বছর ৯৩ জনের মৃত্যু হয়। তবে চলতি বছরের মতো এত মানুষ আক্রান্ত হয়নি। পরের দুই বছর ৪৪ ও ৫৮ জনের মৃত্যু হয়। এরপর মৃতের সংখ্যায় হ্রাস-বৃদ্ধি হয়েছে। গত বছর ১০ হাজারের কিছু বেশি মানুষ আক্রান্ত এবং ২৬ জনের মৃত্যু হয়। তবে চলতি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অন্যান্য বছরের সব রেকর্ড ভেঙেছে। এরই মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে।

বর্তমান অবস্থা :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৬৫৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে চলতি মাসে গতকাল শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ৭ হাজার ৫১৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৩৯০ জন আক্রান্ত হয়েছে। তবে ঢাকার বাইরে আরও ৫১ জন আক্রান্ত হলেও তাদের নাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে থাকা সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার সমকালকে জানান, রাজধানীসহ সারাদেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে কিংবা চিকিৎসা নিতে গেলে তাদের নাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠাতে বলা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান তালিকা পাঠিয়েছে, তাদের সবার নাম অধিদপ্তরে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী চিন্তিত হলেও স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মেয়রদের চোখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক :স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, ঢাকা সিটি করপোরেশনের দুই মেয়র সাঈদ খোকন ও আতিকুল ইসলাম প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আছে। এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই।

গত বৃহস্পতিবার সাঈদ খোকন বলেন, ছেলেধরার মতো ডেঙ্গু নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। একই দিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। তাদের এই বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। এদিকে গতকাল শুক্রবার ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মেয়রকে সতর্ক হয়ে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, এই সময়টা অত্যন্ত সংবেদনশীল। সবার সংযত ও দায়িত্বশীল কথাবার্তা বলা উচিত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন দেশে নেই। কিন্তু তিনিও ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে চিন্তিত বলে জানান সেতুমন্ত্রী।

আস/এসআইসু

Facebook Comments