সমালোচিত ভিআইপি, প্রশ্নবিদ্ধ ৯৯৯

আলোকিত সকাল ডেস্ক

এক যুগ্ম সচিবের অপেক্ষায় ৩ ঘণ্টা ফেরি বিলম্বের কারণে মুমূর্ষু স্কুল ছাত্র তিতাসের মৃত্যু হয়। মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ১ নং ফেরিঘাটের এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচিত হন ওই ‘ভিআইপি’। জরুরী মুহূর্তে ৯৯৯-এ কল করেও কোন সাহায্য না মেলায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এ সরকারি জরুরি সেবাটি।

বৃহস্পতিবারের ওই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট যুগ্ম সচিব, ফেরির ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফেসবুক, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রীতিমত বইয়ে যায় সমালোচনার ঝড়। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের তীব্র সমালোচনার বানে বিদ্ধ হতে থাকেন ওই ‘ভিআইপি’সহ সংশ্লিষ্টরা।

এইচ এম শহিদুল ইসলাম নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লেখেন, ৩ ঘণ্টায়ও ছাড়েনি ফেরি সচিবের অপেক্ষায়, যার বদৌলতে অ্যাম্বুলেন্সেই স্কুলছাত্রের মৃত্যু হয়। এই অনিয়ম কবে যে ঠিক হবে? কেই বা নেবে এই মৃত্যুর দায়ভার?

তিনি আরও লেখেন, কেউ কি বলতে পারেন ভিআইপি কাকে বলে ???

পীর হাবিবুর রহমান লিখেছেন, তিতাসের খুনিদের বিচার চাই, কিসের ভিআইপি? প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী যুগ্মসচিব? ডিসি কোন জমিদার?

তিতাসকে কে খুন করেছে? মাদারিপুরের ডিসি ওয়াহিদুল? নাকি যুগ্মসচিব সবুর? তদন্ত কমিটি আমলাদের দিয়ে কেনো? সংসদীয় কমিটি করে দোষীদের বের করে, শাস্তি চাই। দেশটা কি একদল আমলা ও ডিসির বাপ দাদার? বঙ্গবন্ধুর ডাকে এজন্য কি এতো রক্তে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো?

এক ধরনের ডিসি আছে যারা জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হলেও জেলাপ্রশাসক হয়ে নিজেদের জেলার জমিদার মনে করে!কিছু সরকারি কর্মচারী কে বাড়ির চাকর বানায়। তাদের বউরা নিজেদের মহারানী মনে করে। এদের দিয়ে হাটবাজার করায়।

এদের কোন ছেলেবেলা নেই। এর ওর বাড়ি, খেয়ে থেকে টিউশনি করে বড় হয়েছে। বিশ্বিদ্যালয় জীবনে ডাইনিংয়ে ডালের পাতলা পানিভাত নয়, রুমে হিটারে ভাত রেধে আলুভর্তায় খেয়েছে। ছাত্রজীবনের আনন্দভোগ কপালে জুটেনি। মনের দারিদ্রতা মুছেনি, গণমুখী মানবিক হয়নি। হীনমন্যতায় আমলা হয়ে ক্ষমতা দেখায়। জনগন ক্ষমতার মালিক ও সে তাদের সেবক ভুলে যায়। ভুলে যায় জনগনের টাকায় পড়াশোনা করেছে!

Prof. Dr. Mohammad Asaduzzaman Chowdhury লিখেছেন, আজ আমি একজন সম্ভবনাময় তিতাসের কথা বলতে এসেছি। যে মৃত্যুর সাথে প্রতিমুহূর্তে লড়েছে। বেঁচে থাকার প্রবল আকুতি তার চোখে আর মুখে। কিন্তু ফুল ফোটার আগেই যে তা ঝরে গেলো। সবাইকে হয়তো তা ভাবিয়েছে কিন্তু বিবেককে জাগাতে পারেনি। আমাদের ঘুনে ধরা নিয়ম এই বেঁচে থাকার লড়াইকে দেখতে পায়নি কিংবা দেখেও হয়তো না দেখার ভান করেছে। কি যেন হয়েছে আমাদের। মনে আগাছা, চিন্তায় আগাছা। সব মানবিক জায়গায় যেন সমাজের পচন দেখছি। এমন এক পচন- এখন সেটাকে রুখে দেবার মতো মেরুদন্ডটা পর্যন্ত আমাদের ভেঙে গেছে। বিবেক -হায়রে বিবেক। এক বিষন্ন জগতের নির্বাসিত কয়েদির প্রতিবিম্ব। এখন চলছে লোক দেখানো নাটক। কৃত্রিম সমাজের কাল্পনিক রূপ সাজিয়ে আমরা নিজেদের স্বার্থের জন্য মানবতাকে লাথি মেরেছি। চোখ রাঙিয়ে সমাজকে বলছি “আমি বড়, অনেক অনেক বড় আর সবাই ছোট-আমার বিত্ত বৈভবে, আমার দায়িত্বহীনতায় আমার ক্ষমতায়। আমার স্বার্থের জন্য যদি কাউকে থেমে যেতে হয়। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হয়। চরম মূল্য দিতে হয়। তা সে দেবে। কিন্তু আমার অহমিকা, আমার আভিজাত্যের ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেবোনা।”

এখন আর নিজেদের মানব ভাবিনা, এখন নিজেদের দানব ভাবি। তিতাস আমাদের ক্ষমা করে দিও।

তানবীর সিদ্দিকী তার নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, ফেরীতে কিশোর তিতাস এর মর্মান্তিক মৃত্যু আর ভিআইপি সংস্কৃতি আমাকে একটি বিষয় নতুন করে ভাবতে সাহায্য করেছে। দেশের মালিক জনগণ সংবিধানের স্পষ্ট লেখা থাকা সত্ত্বেও আমাকে হয়রানির শিকার হতে হয়। যেদিন এদেশের জনগণ বুঝবে প্রজাতন্ত্রের মালিক তারা সেদিন এদেশে সুশাসন আসবে। সরকারের জন্য সহজ হবে দেশ পরিচালনা করা। সমৃদ্ধ হবে দেশ।

তপু মোজুমদার তপু লিখেছেন, তিতাসের মা বোন আবার দৌঁড়ালেন। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে পুলিশের দুপায়ে মাথা ঠেকিয়ে মা-মেয়ে কাঁদতে থাকেন। পুলিশ বললেন- আপনারা ফেরিতে যান ভিআইপি ভাঙ্গা পর্যন্ত চলে আসছে। এই ভাবে ঐ খানের সমস্ত কর্মকর্তাদের পা ধরে ধরে মা-মেয়ে সন্তান ও ভাইয়ের জন্য অবিরাম কাঁদতে থাকেন। অথচ এই রাষ্ট্র যন্ত্র তখনও নিশ্চুপ ভিআইপির মন রক্ষায়। এই করতে করতে রাত ১২টা বাজলে ভিআইপি ঘাটে আসেন এবং ফেরি ছাড়েন। ততক্ষণে যা হবার তাই হয়ে গেলো।

তিতাসের বোন বৃষ্টি অনবরত কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, আমার একটা মাত্র ভাই, প্লিজ আপনারা একটু ওকে বাঁচাতে সাহায্য করুন।

এভাবেই যখন তিতাসের মৃত্যু মাঝনদীতে হয়, তখন চারিদিকে অন্ধকার আর থৈ থৈ স্রোতের শব্দ! স্রোতের শব্দের সাথে তিতাসের মা বোনের কান্নার আওয়াজ প্রমত্ত পদ্মার হৃদয়কেও নাড়িয়ে দিল! কিন্তু পাষাণ হৃদয় একবারও কাঁপলো না! ৩০ লক্ষ শহীদের জীবন বলিদান কি এমন রাষ্ট্র সেবার জন্য-? ক্ষমা করে দিয়েন আমাদের তিতাসের দুখিনী মা! তিতাসের বোন! এই রাষ্ট্র শুধু ভিআইপিদের জন্য!

তাসলিম পেরু আক্ষেপ প্রকাশ করে লিখেছেন, ভিআইপি! তিতাস কিন্তু মারা গেলো–! জনগণের ট্যাক্সে এই রাষ্ট্রে যারা ভিআইপি’গিরি করে। সকল রকমের সুযোগ সুবিধা শুধু তাদের জন্য। ৩০ লক্ষ শহীদের জীবন বলিদান কি এমন রাষ্ট্র সেবার জন্য -? মাফ করে দিয়েন তিতাসের মা! তিতাসের বোন! সবচেয়ে দূর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, সেই ভিআইপি’র নির্দেশেই গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি। আমার কাছে যদি কোন সুপার পাওয়ার থাকতো তাহলে আইন নিজের হাতেই তুলে নিতাম।

মিথুন মাহমুদ তার ফেসবুকে লিখেছেন, গুলি করে মানুষ হত্যা করা, আর ফেরী আটকে রেখে রোগী মারা একই।

নির্ধারিত সময়ে ফেরি না ছাড়ায় অ্যাম্বুলেন্সে রোগী মৃত্যুর ঘটনায় নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

সেদিন মুমূর্ষু তিতাস ঘোষের সঙ্গে থাকা মামা রাজীব ঘোষ বলেন, তারা বহুবার অনুরোধ করলেও সেসময় ঘাটে উপস্থিত নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের দায়িত্বরত কমকর্তা বা পুলিশ সদস্যরা ভিআইপি ফেরি চলাচল শুরু করতে রাজি হননি।

তিনি বলেন, ‘আমরা সাড়ে আটটার কিছু আগে কাঁঠালবাড়ি ১ নম্বর ফেরিঘাটে পৌছানোর প্রায় আধাঘন্টা পর যখন দেখি যে ফেরি চলাচল হচ্ছে না, তখন সেখানে উপস্থিত লোকজনের সাথে কথা বলে জানতে পারি যে ভিআইপি আসবে বলে ফেরি ছাড়া হচ্ছে না।’

রাজীব ঘোষ জানান, শুরুতে তারা সেখানে উপস্থিত কর্মচারীদের অনুরোধ করেন, তারা ফেরি ছাড়তে অপারগতা প্রকাশ করলে ঘাটের দায়িত্বে থাকা পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে এ বিষয়ে কথা বলেন।

এর মধ্যে জরুরি প্রয়োজনে পুলিশের হটলাইন নম্বর ৯৯৯-এ মুঠোফোনে কল দিয়ে এ বিষয়ে জানালেও কোনও ধরনের সাহায্য পায়নি বলে জানান তারা। শুরুতে সেখানে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাদের কথা ‘গ্রাহ্যই করেনি’ বলে অভিযোগ করেন রাজীব ঘোষ।

‘মুমূর্ষু রোগী আছে বলে ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যদের কাছে আমরা অনুরোধ করি ফেরি ছাড়তে, কিন্তু তারা আমাদের কথা গ্রাহ্যই করেনি।’ একপর্যায়ে তিতাসের মা এবং বোন পুলিশ সদস্যদের পায়ে ধরে অনুনয়-বিনয় করলেও কোনও কাজ হয়নি।

আস/এসআইসু

Facebook Comments