সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাবনা

আলোকিত সকাল ডেস্ক

প্রতিবছর উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা শুরুর পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিপরীক্ষার বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সমন্বিতভাবে বা গুচ্ছভিত্তিক ভর্তিপরীক্ষা। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণির প্রথম বর্ষে ভর্তির সময় এলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিতভাবে বা গুচ্ছভিত্তিক ভর্তিপরীক্ষা চালু নিয়ে তোড়জোড় হয়।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ আলোচনা চলে আসছে। এতোদিন এর সুফল মেলেনি। তবে সম্প্রতি কৃষি ও কৃষিতে প্রাধান্য থাকা আটটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় একই দিনে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে সমন্বিতভাবে ভর্তিপরীক্ষা নিতে সম্মত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা উপমন্ত্রীও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সমন্বিত ভর্তির গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে খুব শিগগিরই অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষার আয়োজন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমন্বিত ভর্তির বিষয়টিতে ইতিবাচক হলে একই সাথে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ভোগান্তি কমতো। পাশাপাশি অনেক অর্থ বেঁচে যেতো। যেহেতু ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বিতভাবে ভর্তিপরীক্ষা নিতে রাজি হয়েছে এটা বেশ ইতিবাচক। এখন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিষয়টি নিয়ে ভাববে বলে মনে হয়। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, মেডিকেল কলেজগুলোতে একসঙ্গে ভর্তিপরীক্ষা হয়।

একাদশ শ্রেণিতে কলেজে ভর্তি হয় মেধার ভিত্তিতে। তাই সব বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা না হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আসন্ন শিক্ষাবর্ষ (২০১৯-২০২০) থেকে সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা নিতে সম্মত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো— বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমধারার পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

এদিকে আগামী বছর থেকে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমন্বিত ভর্তি কার্যক্রম চালুর বিষয়ে ইতিবাচক মত দিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ইতোমধ্যে এ কার্যক্রমে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রমের মতোই বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি কার্যক্রম চালু করা হবে। এতে করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নির্মম কষ্ট ও ভোগান্তি লাঘব হবে। পাশাপাশি সমন্বিত ভর্তি কার্যক্রম বাস্তবায়ন হলে এই প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা আসবে।

শুধু তাই নয়, এই প্রক্রিয়ায় যারা বাধা সৃষ্টি করবে তাদের বিষয়েও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনলাইনে সমন্বিত ভর্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে এখনও যারা বাধা সৃষ্টি করছেন বা নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছেন, তাদের সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে। কোনো প্রতিবন্ধকতাকে গুরুত্ব দেয়া হবে না বরং তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে।

এর আগে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনিও সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষার বিষয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন।এদিকে কৃষি ও কৃষি সমমনা ৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছর থেকে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা ও শিক্ষা উপমন্ত্রীর এ সংক্রান্ত বক্তব্যে আশান্বিত হয়েছেন ভর্তিচ্ছু ও অভিভাবকরা। শিগগিরই সাধারণ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষার বিষয়ে ইতিবাচক হবে বলে মনে করছেন তারা।

এ বছর স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছু আল নাহিয়ান নামের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, প্রায় এক যুগ ধরে সমন্বিত ভর্তিপরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সে আলোচনায় খুব বেশি অগ্রগতি হয়েছে তা বলা যাবে না। তবে ৮টি বিশ্ববিদ্যালয় একসাথে ভর্তিপরীক্ষা নিতে চাওয়ায় আমরা কিছুটা আশা দেখতে পাচ্ছি। হয়তো শিগগিরই অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ বিষয়ে একমত হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, এককভাবে ভর্তিপরীক্ষা নিলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে পরিমাণ অর্থ পায়, সমন্বিতভাবে পরীক্ষা নিলে তা আর পাবে না। এই জন্য এতোদিন বিষয়টিতে গুরুত্বই দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যরা। তবে যেহেতু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে, এখন অন্যরাও এগিয়ে আসবেন বলে আমার বিশ্বাস।

খোঁজ নিয়ে যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের বড় অংশের আর্থিক সংশ্লেষ থাকে। আর ভর্তির টাকা সম্মানী বা দায়িত্বভাতা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে নিম্ন শ্রেণির কর্মচারী পেয়ে থাকেন। সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট-বড় ভেদে প্রতিবছর ভর্তি বাবদ আয় ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত। এই টাকার বড় অংশই মূলত বিশ্ববিদ্যালয়পর্যায়ে ভাগাভাগি হয় নানা খাতে। সমন্বিত ভর্তির ক্ষেত্রে যা বড় বাধা হিসেবে দেখা হয়।

বর্তমানে দেশে ৪৯টি স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে ৪৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি পরীক্ষা হয় আলাদাভাবে। একজন শিক্ষার্থী ১০ থেকে ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেন। ভর্তির সময় এলেই দেখা যায় একেকজন অভিভাবক তাদের সন্তানদের নিয়ে ছুটছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, এই বিষয়টি চিরস্থায়ী হতে পারে না। দ্রুত শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি সমন্বিত ভর্তির বিষয়টি বাস্তবায়ন করবেন।
ফাতেমা-তুজ-জোহরা নামের একজন ভর্তিচ্ছু বলেন, দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভর্তিপরীক্ষা দিতে গেলে একই সাথে সময় এবং অর্থ অপচয় হয়। আর ভোগান্তি তো সীমাহীন। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার।

উল্লেখ্য, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে সমন্বিত পরীক্ষার বিষয়ে ২০০৮ সাল থেকে চেষ্টা চালিয়ে আসছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু দৃশ্যমান সফলতা এখনো চোখে পড়েনি।

‌আস/এসআইসু

Facebook Comments